সংস্কারের পর নবরূপে মানিকগঞ্জের প্রাচীন মাচাইন মসজিদ

কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মানিকগঞ্জের সুপ্রাচীন মাচাইন জামে মসজিদ। ত্রি-গম্বুজবিশিষ্ট ও আকর্ষণীয় কারুকার্যখচিত এ মসজিদটি দেশের অন্যতম পুরাকীর্তি। শিলালিপি অনুযায়ী, মসজিদটি ১৫০১ সালে প্রখ্যাত হোসেন শাহ্ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। মানিকগঞ্জের মুসলিম পুরাকীর্তিগুলোর বেশিরভাগই বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমল ও পরবর্তী মুসলিম শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ সময়ে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি জামে মসজিদের মধ্যে মাচাইন গ্রামের মসজিদটি অন্যতম। কয়েক বছর আগে মসজিদটি সংস্কার করা হয়। সংস্কারের পর কয়েক শতাব্দীর মলিনত্ব ঘুচে গিয়ে নিজের দৃষ্টিনন্দন রূপ ফিরে পায় মসজিদটি।

জানা যায়, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহর রাজত্বকালে হজরত শাহ্ রুস্তম (রহ) মানিকগঞ্জ অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচার করার জন্য আসেন এবং মাচাইন গ্রামে খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। কথিত আছে, তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তার অলৌকিক গুণে মুগ্ধ হয়ে এলাকার লোকজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি একটি মাচানের ওপর অবস্থান করতেন। ধীরে ধীরে হজরত শাহ রুস্তমের ভাবশিষ্য ও ভক্তগণ ঐ মাচান ও খানকার আশেপাশে বাড়িঘর প্রতিষ্ঠা করে বসবাস করতে থাকেন। অনেকে মনে করেন, হজরত শাহ্ রুস্তম জনশূন্য বিজন বালুচরে খানকা প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। জনারণ্যেই তিনি খানকা স্থাপনা করেছিলেন। মাচাইন গ্রামটি বর্তমানে ইছামতি নদীর তীরে অবস্থিত। হজরত শাহ রুস্তম যখন মাচাইন গ্রামে আসেন তখন প্রাচীন ভুবনেশ্বর নদী প্রবহমান ছিল বলে জানা যায়। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী হজরত শাহ রুস্তম রহ. ইছামতি নদীর ওপরে বাঁশের মাচানে বসে এবাদত করতেন। এ মাচানের নামানুসারে পরবর্তীতে মাচাইন গ্রামের নামকরণ হয়।

জানা যায়, তত্কালীন স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ নদীর ওপর মাচায় বসা ধ্যানরত মহান সাধক হজরত রুস্তম শাহ (র) এর সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে তার নৌকার মাঝিদের যাত্রাবিরতির নির্দেশ দেন এবং পরে হজরত রুস্তম শাহ্র সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। তিনি হজরত রুস্তম শাহের ইসলাম প্রচারে অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি এ মহান বুজুর্গ সাধকের প্রতি তার শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ এবং এলাকায় ইসলাম প্রচারের সুবিধার্থে ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে মাচাইন গ্রামে এই সুরম্য মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিন গম্বুজবিশিষ্ট নান্দনিক শিল্পমণ্ডিত মসজিদটি,  হজরত রুস্তম শাহ্ (র) পুণ্য স্মৃতি আজো বহন করে চলছে। বর্তমানে মাচাইন গ্রামে এ মসজিদ দেখতে এবং শাহ্ রুস্তমের মাজার জিয়ারত করতে আসেন মানিকগঞ্জ জেলাসহ আশেপাশের অঞ্চলের মানুষ।

জেলা সদর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ মসজিদের মূল অংশের ওপর রয়েছে তিনটি গম্বুজ। উত্তর ও দক্ষিণ পাশের গম্বুজের চেয়ে মাঝের গম্বুজটি একটু বড়ো। মসজিদটির মূল অংশের ওপর রয়েছে নিখুঁত কারুকাজ। প্রতিটি দেয়ালে প্রচুর কারুকাজ রয়েছে, যা সবার দৃষ্টি কাড়ে। জানা যায়, মসজিদটি নির্মাণে ব্যবহার করা হয় চুন, সুরকি ও সাদা সিমেন্ট।