বন্ধু বিভীষণ

ফারজানা ববি

সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

বন্ধুবান্ধবদের বাসায় যাওয়া আম্মু একেবারেই অপছন্দ করে। ঘুরতে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। চারপাশের অবস্থা দেখে তিনি আমাকে নিয়ে ভীষণ আতঙ্কে থাকেন। একমাত্র রিমাকেই আম্মু বিশ্বাস, ভরসা করেন। হুটহাট ওর বাসাতেই আমি যেতে পারি। আম্মু মানা করেন না। হঠাত্ করেই আম্মুর ট্রেনিং পড়ে এক সপ্তাহের জন্য। আমি তখন আকাশে উড়ছি। বন্ধুরা মিলে প্ল্যান করে ফেললাম ধারে কাছেই একটা ট্যুর দিতে হবে। এ সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না।

প্রথমেই বাঁধ সাধে রিমা। ওর মায়ের অসুস্থতার কারণে ও আগেভাগেই জানায় যেতে পারবে না। আমরাও খুব একটা জোরাজুরি করি না। কিন্তু বিপদে পড়ি আমি। কোনোভাবে যদি আম্মু রিমার কাছে ফোন দিয়ে বসে, বেশ ঝামেলায় পড়ে যাবো। ট্যুরের আরো তিন দিন বাকি ছিল। রিমাকে সবকিছু সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিলাম। মনের আনন্দে বন্ধুদের সঙ্গে প্রথম ঘুরতে যাওয়ার সুখানুভূতি নিচ্ছিলাম।

বেশি সুখ শরীর সইতে পারল না। আম্মুর ট্রেনিংয়ে যাওয়ার আগের দিনই কাঁপিয়ে জ্বর এলো। ট্যুরে আর যাওয়া হলো না। জ্বরের ঘোরে আমি আবোল-তাবোল বকছি। আম্মু গোছানো ব্যাক-প্যাক রেখে আমাকে সেবা করতে বসলেন। জ্বরের তৃতীয় দিন একটু সুস্থ হলাম। আম্মু বললেন, ‘রিমাকে ফোন দিয়ে আসতে বলি। তোর কী বাজে অবস্থা! ও একবার দেখে যাক।’

আমি আঁতকে উঠলাম। ক্ষীণ কণ্ঠে বললাম, ‘তোমাকে ফোন দিতে হবে না। আমি দিচ্ছি।’

ততক্ষণে আম্মুর কণ্ঠ শুনতে পেলাম, ‘হ্যাঁ, রিমা তুমি...’

তারপর সুনসান নীরবতা।

কয়েক সেকেন্ড পরে আম্মুর কণ্ঠ আবারও শুনতে পেলাম, ‘ঠিক আছে। তোমরা সাবধানে থেকো।’

আমি একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ আগেও বিছানার সঙ্গে লেপ্টে ছিলাম। কিন্তু তখন মনে হচ্ছিল আম্মুর সামনে থেকে এক দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার শক্তি পেয়ে গেছি।

আম্মু আমার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি নাকি এখন রিমার সাথে আছ। এ কথা ওকে কী উদ্দেশ্যে বলতে বলেছ?’

আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। গলা থেকে কথা বের হলো না। জ্বর ছিল বলে রক্ষা পেলাম। তখন শুধুই আফসোস করেছি, ‘আম্মুর পুরো কথাটা শোনার ধৈর্যটুকু তোর কেন হলো না রিমা!’