নিজের অস্তিত্বকে জানতে

 

কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের মুজিবনগরে অবস্থিত আমবাগানেই রচিত হয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ক্ষণকালের জন্য হলেও এটি ছিল বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী। বাঙালি জাতিসত্তার রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সূচনাভূমি এই মুজিবনগর। একদিন ভাবলাম, নিজের আত্মপরিচয়ের এ স্মৃতিকেন্দ্রটি ঘুরে আসি।

সেই ভাবনা মোতাবেক, আমি আর মা এক স্নিগ্ধ সকালে বেরিয়ে পড়লাম। সঙ্গে যোগ হলো ফরহাদ। রাস্তায় তেমন কোনো যানজট ছিল না, বেশ অল্প সময়ের মাঝেই আমরা গাবতলি পৌঁছে গেলাম।

মহাসড়ক পেরিয়ে এগিয়ে চলছে আমাদের বাস। এবারও রাস্তায় তেমন একটা জ্যাম না থাকার ফলে ছয় ঘণ্টার মাঝেই পৌঁছে গেলাম মেহেরপুরে। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ১টা। এরপর লোকাল বাসে করে ছুটলাম মুজিব নগরের দিকে। যেতে যেতে অস্তিত্বজুড়ে এক শিহরণ জেগে উঠছিল আত্মপরিচয়ের এক গৌরবজনক ইতিহাসকে প্রত্যক্ষ করার তাগিদে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জনপদ এটি। মুজিবনগর গিয়ে মানসপটে ভেসে উঠল একাত্তরের বাংলাদেশ। উত্তাল বাংলাদেশের রক্তাক্ত জনপদের কথাই মনে ভেসে উঠল। একাত্তরে মুজিবনগর মানেই ছিল বাংলাদেশ। সেই একাত্তরের বাংলাদেশকে নিয়ে মুজিবনগরে তৈরি করা হচ্ছে মানচিত্র। এগারোটি সেক্টরে ভাগ করে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনাচিত্র তুলে ধরা হচ্ছে এই মানচিত্রে। বৈদ্যনাথতলা নামে পরিচিত বিশাল আমবাগান এলাকাকে ‘মুজিবনগর’ নাম দিয়ে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়েছিল। সেখানে গঠিত মুজিবনগর সরকারের দক্ষ নেতৃত্ব ও পরিচালনায় নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সফল পরিণতিতে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়।

মূল গেট দিয়ে ঢুকে প্রথমে দেখতে পেলাম মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাজধানীর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৯৮ সালের ১৭ এপ্রিল কমপ্লেক্সটির উদ্বোধন করা হয়। ৬৬ একরের এই বিশাল আয়তনের নান্দনিক কমপ্লেক্সটিতে একটি জাদুঘর, মিলনায়তন, সংলগ্ন প্লাজা, স্বাধীনতা ক্লাব, পাঠাগার, রেস্ট হাউস, হেলিপ্যাড, পিকনিক স্পটসহ নানা সুবিধা সংযোজন করা হয়েছে। মূল কমপ্লেক্সটি চারতলা উঁচু একটি বৃত্তাকার ভবনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, যার প্রতিটি তলায় দর্শনার্থীদের জন্য প্রশস্ত করিডর রাখা হয়েছে। করিডরে দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে বাংলাদেশের একটি বিশাল মানচিত্র দেখতে পাওয়া যায়। কমপ্লেক্স ভবনের বাইরে কমপ্লেক্স-সংলগ্ন খোলা চত্বরে বৃত্তাকারভাবে ঐতিহাসিক ছয় দফার রূপক হিসেবে ছয়টি গোলাপ বাগান, ৭ই মার্চের ভাষণ, মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ, মন্ত্রিসভা, পতাকা উত্তোলন, পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণসহ ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্য দেখা যায়। সেক্টরভিত্তিক যুদ্ধকালীন নানা ঘটনার ছোট্ট ভাস্কর্যগুলো যেন চোখের সামনে মেলে ধরেছে ১৯৭১-এর বাংলাদেশকে। আমাদের মতো অনেকেই এসেছেন এখানে তাদের সন্তানদের নিয়ে আমাদের মুক্তির ইতিহাস জানাতে। মানচিত্র স্থাপনার ঠিক বাইরে রয়েছে ১৯৭১-এর নানা ঘটনাপঞ্জির স্মারক ম্যুরাল, আছে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণরত অবস্থার ম্যুরাল, মুজিবনগর সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভাস্কর্য, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার প্রদানের দৃশ্য, ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়ায় গঠিত মুক্তিবাহিনীর ম্যুরাল, নিয়াজির আত্মসমর্পণের চিত্র, পাকিস্তানিদের নির্যাতনের নানা দৃশ্য। বিরাটাকার দুটি পাকা দেয়ালে লিখে রাখা হয়েছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ পত্র। স্মৃতি কমপ্লেক্স পরিদর্শন শেষে এগোলাম স্মৃতিসৌধের দিকে। মুজিবনগর ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ হলো মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ। প্রথম অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণসহ মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে ১৯৮৭ সালের ১৭ এপ্রিল এটি উদ্বোধন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার যেখানে গঠিত হয়, সেখানে এই স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলা হয়েছে। এর স্থপতি তানভীর করিম। ১৬০ ফুট ব্যাসের গোলাকার স্তম্ভের ওপর মূল বেদিকে কেন্দ্র করে ২০ ইঞ্চি পুরু ২৩টি ত্রিভুজাকৃতি দেয়ালের সমন্বয়ে স্মৃতিসৌধটি গঠিত। স্মৃতিসৌধের মূল বেদিতে গোলাকার বৃত্তের মাধ্যমে শহীদ বুদ্ধিজীবীর খুলি বোঝানো হয়েছে। স্মৃতিসৌধের মূল বেদিতে ওঠার জন্য মোট ১১টি সিঁড়ি ব্যবহার করতে হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সারা দেশে মুক্তিযোদ্ধারা যে ১১টি সেক্টরে ভাগ হয়ে যুদ্ধ করেছেন ১১টি সিঁড়ি সেই ১১টি সেক্টরের প্রতীক। এর পর আমরা মা ও ছেলে এগিয়ে গেলাম মিউজিয়ামের দিকে। স্বাধীনতাযুদ্ধের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্রের মাধ্যমে প্রদর্শনের জন্য মূল কমপ্লেক্স ভবনের ভিতরে মিউজিয়ামটি নির্মাণ করা হয়েছে। মিউজিয়ামের ভিতরে ১০ জন জাতীয় নেতার তৈলচিত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ২৪টি বড় আকারের তৈলচিত্র আছে।

যেভাবে যাবেন :ঢাকা থেকে সড়কপথে সরাসরি মুজিবনগর যাওয়া যায়। এ ছাড়া বাসে মেহেরপুর জেলা সদর গিয়ে সেখান থেকে সহজেই যাওয়া যায় মুজিবনগর। মেহেরপুর সদর থেকে মুজিবনগরের দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। ঢাকার কল্যাণপুর ও গাবতলী থেকে জেআর পরিবহন, মেহেরপুর ডিলাক্স, চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স ও শ্যামলী পরিবহনের বাস সরাসরি যায় মেহেরপুর ও মুজিবনগর। ভাড়া ৩৫০-৫০০ টাকা।

নিজস্ব বাহন নিয়ে গেলে পাটুরিয়ার ফেরি পারাপারের ঝক্কি এড়িয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে সিরাজগঞ্জ, নাটোর, পাবনা অতিক্রম করে লালনশাহ সেতু (পাকশী সেতু) পেরিয়ে মেহেরপুর যাওয়া যায়।

যেখানে থাকবেন : মুজিবনগরে থাকার জন্য বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেল ‘মুজিবনগর’ নির্মাণ করা হলেও সেখানে নেই পানি ও বিদ্যুত্। তবে মুজিবনগরে আছে মেহেরপুর জেলা পরিষদের ডাকবাংলো ‘সূর্যোদয়’। মেহেরপুর জেলা সদরেও সাধারণ মানের কিছু হোটেল আছে।