‘শ্বাসরুদ্ধকর’ ইমরান

কখনো পানি খেয়েছি, কখনো সাঁতরিয়েছি, দুর্বল হয়েছি, আবার লুঙ্গি ফুলিয়ে বাতাস ঢুকিয়েছি। সেসময় আমি কিভাবে এতকিছু করেছি তা বলতে পারছি না। এখন রাইতে গুমাইতে (ঘুম) পারি না, গুমের মধ্যে ভয়ঙ্কর সব স্বপ্ন দেহি। বড় বড় তুফান (সাগরের ঢেউ) গায়ের ওপরে পড়ে ও পানির তলে নিয়া যায়।

শফিকুল ইসলাম খোকন

 

অথৈ সাগর। চারদিকে পানি আর পানি। একমাত্র সৃষ্টিকর্তার ওপর নির্ভর করা ছাড়া আর কেউ নেই। সেখানে যতবার যাবে পরিবারের কাছ থেকে ততবারই বিদায় নিয়ে যেতে হবে। বঙ্গোপসাগরে যেখানে নেই কোনো কিনারা, সেই অথৈ সাগরে জীবিকার জন্য মাছ শিকার করতে যান উপকূলের জেলেরা। তারা জীবনের অনিশ্চতা জেনেও পড়ি দেন সাগরে।

সকল দুর্যোগ থেকে বাঁচার জন্য নিরাপত্তা সামগ্রী পর্যাপ্ত না থাকায় অনেকেই বিপদের সম্মুখীন হন, প্রাণহানিও ঘটে। জীবনের মায়া কার না থাকে। তাই জীবনটা বাঁচিয়ে রাখতে অনেক চেষ্টা করে মানুষ। ঠিক তেমনি যারা সাগরে মাছ শিকার করতে যান তারাও যখন দুর্যোগের সম্মুখীন হন তখন বাঁচার আকুতি এবং চেষ্টাও কম করেন না। তবে সেই জেলে যদি হয় অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোর তখন সে কি-ই বা করতে পারে?

ইমরান হোসেন।  বয়স মাত্র ১৪ বছর। যে বয়সে লেখাপড়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করার কথা সেই বয়সে অভাবের সংসারে বাবাকে সহযোগিতা করার জন্য যেতে হয় অথৈ সাগরে। যেখানে বড়দের সঙ্গে সমানভাবে কাজ করতে হয়। যেখানে থাকে না কোনো আশ্রয়স্থল। পানিতে ভাসা একমাত্র ট্রলারটির ওপরই ভরসা করে ৮ থেকে ১৫ দিন থাকতে হয় সাগরে। মাছ শিকার করার সময় হঠাত্ শুরু হয় প্রচণ্ড বাতাস। অন্যের মতো সমান অংশে জাল টানছেন ইমরান, ঠিক সেই মুহূর্তেই জালের সঙ্গে পড়ে যায় সাগরে। ঘটনা ২৭ আগস্টের। বাঁচার চেষ্টা করেন তিনি। মুহূর্তের মধ্যেই স্রোতে চোখের আড়াল হয়ে যায় ইমরান। তখনই শুরু হয় নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য চেষ্টা। ছিল না সহযোগিতা করার মতো মানুষ, এমনকি ছিল না কোনো জীবন রক্ষার সামগ্রী। প্রচণ্ড ঢেউয়ের কারণে মাছ ধরা ট্রলার থেকে ছিটকে পড়ে যায় ইমরান হোসেন। নৌকা অথবা লাইফ জ্যাকেট নয়, পরনের লুঙ্গিতে ভর করেই নিজের জীবন রক্ষা করে কিশোর ইমরান। লুঙ্গি খুলে কায়দা করে হাওয়া ভরে ফুলিয়ে ডাম্বুরা বানিয়ে গভীর সমুদ্রে ভেসেছিল টানা ৫ দিন!

তার এমন বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতা রীতিমতো আশ্চর্য করেছে সবাইকে। দীর্ঘ ৫ দিন জীবন-মরণ লড়াই করে বেঁচে আছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ট্রলার থেকে পড়ে যাওয়ার পর তুফান কমে যাওয়ায় যখন কারো সহযোগিতা পাননি তখন নিজের পরনের লুঙ্গি প্রথমে ফুলিয়ে বাতাস ঢুকিয়ে ভাসতে থাকেন। এভাবে ভাসতে ভাসতে ৫ দিনের মাথায় নিজ দেশের জলসীমা অতিক্রম করে ভারতীয় জলসীমায় প্রবেশ করেন। ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ভোলাহাট থানার একটি শিশু যত্ন ও সুরক্ষা কেন্দ্রের হেফাজতে আছেন তিনি।

 

শ্বাসরুদ্ধকর গল্প

ট্রলারে অন্যের সঙ্গে একযোগে সাগরে পাতা জাল টানছে কিশোর ইমরান। হঠাত্ প্রচণ্ড বাতাস আর ঢেউ। জাল টানতেই মুহূর্তের মধ্যেই সাগরে পড়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখের আড়াল হয়ে যায় সবার। শুরু হয় একাকিত্ম সঙ্গী করে প্রকৃতির সঙ্গে বাঁচার লড়াই। এ লড়াইয়ে ইমরানের সহযোগী কেউ ছিল না। ঢেউয়ের তালে নিজে কয়েকঘণ্টা সাঁতরিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েন। আহারের জন্য পানি এবং জীবন রক্ষার জন্য পরনে লুঙ্গিই ছিল একমাত্র ভরসা। ঢেউ আর স্রোতের মধ্যে পরনের লুঙ্গি ফুলিয়ে ভাসতে থাকে ৪ দিনের মাথায়ই সে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। ইমরান বলেন, ‘কখনো পানি খেয়েছি, কখনো সাঁতরিয়েছি, দুর্বল হয়েছি, আবার লুঙ্গি ফুলিয়ে বাতাস ঢুকিয়েছি। সেসময় আমি কিভাবে এতকিছু করেছি তা বলতে পারছি না।’

গত ১৭ সেপ্টেম্বর ইমরান ফোনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘রাইতে গুমাইতে (ঘুম) পারি না, গুমের মধ্যে ভয়ঙ্কর সব স্বপ্ন দেহি। বড় বড় তুফান (সাগরের ঢেউ) গায়ের ওপরে পড়ে ও পানির তলে নিয়া যায়।’ দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভোলাহাট থানার নূর আলী মেমোরিয়াল সোসাইটির একটি শিশু যত্ন ও সুরক্ষা কেন্দ্র থেকে মুঠোফোনে এমনটা বলেছিলেন মা আসমা বেগমের সঙ্গে।