যখন ছবিটির শুটিং হয় তখন সে ছিল ৬ বছরের শিশু। পড়তেন দ্বিতীয় শ্রেণিতে। শুটিং সময়ের সব ঘটনা তার স্মৃতিপটে এখন আর নেই। তবে তার মনে আছে ছবিটির একটি দৃশ্যে অভিনয় করার পর হুমায়ূন আহমেদ গভীর পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত রেশমী খংলাকে কাছে টেনে নেন। তিনি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে রেশমী খংলার জীবনের প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর প্রশংসা করেন। তিনি মিমিকে নিয়ে ভবিষ্যতেও কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু হুমায়ূন আহমদের প্রয়াণে রেশমী খংলার আর কোনো ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ হয়নি
ইসমাইল মাহমুদ
বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ ২০১২ সালের ১৯ জুলাই চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তিনি তার জীবদ্দশায় অগণিত কালজয়ী কাজ করে গেছেন। যা আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ। তার শ্রেষ্ঠ কর্মের একটি হলো বাংলা চলচ্চিত্র ‘আমার আছে জল’। জনপ্রিয় এ ছবির শুটিং হয়েছে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, শ্রীমঙ্গল উপজেলার হাইল হাওর, বাইক্কা বিল, চা বাগানসহ জেলার আরো কয়েকটি স্পটে। এ ছবিতে জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে অভিনয় করেন লাউয়াছড়া বনাঞ্চলের অভ্যন্তরে অবস্থিত খাসিয়া পান পুঞ্জির বাসিন্দা খাসিয়া শিশু রেশমী খংলা ওরফে মিমি এবং একই পুঞ্জির বাসিন্দা সেংগাই মারচিয়াং।
২০০৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ‘আমার আছে জল’ ছবির পুরো ইউনিট নিয়ে জনপ্রিয় লেখক-নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ আসেন মৌলভীবাজার জেলায়। পরদিন ২০ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় ছবিটির শুটিং। মুক্তি পাওয়ার পর ছবিটি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা লাভ করে। দর্শকনন্দিত ছবিটিতে অভিনয় করেন পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়, ফেরদৌস, জাহিদ হাসান, মীম, শাওন, ডা. এজাজুল ইসলাম, সালেহ আহমেদ, মনিরা, মুনমুন আহমেদ, মালিহা, জারমিনি, শিশুশিল্পী রুদ্র, ওয়াকা, আন্তিক, রেশমী খংলা ও সেংগাই মারচিয়াং। আমার আছে জল ছবির শুটিং চলাকালীন সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রেশমী খংলা জানান, যখন ছবিটির শুটিং হয় তখন সে ছিল ৬ বছরের শিশু। পড়তেন দ্বিতীয় শ্রেণিতে। শুটিং সময়ের সব ঘটনা তার স্মৃতিপটে এখন আর নেই। তবে তার মনে আছে ছবিটির একটি দৃশ্যে অভিনয় করার পর হুমায়ূন আহমেদ গভীর পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত রেশমী খংলাকে কাছে টেনে নেন। তিনি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে রেশমী খংলার জীবনের প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর প্রশংসা করেন। তিনি মিমিকে নিয়ে ভবিষ্যতেও কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু হুমায়ূন আহমদের প্রয়াণে রেশমী খংলার আর কোনো ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ হয়নি। রেশমী বর্তমানে শ্রীমঙ্গল শহরের উদয়ন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
এ ছবির অপর একটি দৃশ্যে অভিনয় করা খাসিয়া নারী সেংগাই মারচিয়াং জানান, হুমায়ূন আহমদের আমার আছে জল ছবিতে ছোট একটি দৃশ্যে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক প্রশংসিত হন। শহরে গেলে অনেকেই তাকে দেখলে বলতেন, ‘ওই যে আমাদের গর্ব যাচ্ছে।’ তিনি হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘স্যার যতদিন ছবির কলাকুশলীদের নিয়ে লাউয়াছড়ায় ছিলেন ততদিনই তার সঙ্গে কথা হতো। স্যার অসম্ভব মিশুক ও হাস্যজ্জ্বল ছিলেন। মজার মজার কথা বলতেন।’ বর্তমানে সেংগাই মারচিয়াং বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ অবস্থায় লাউয়াছড়া পান পুঞ্জিতে বাস করছেন।
মৌলভীবাজার জেলার নৈসর্গিক সৌন্দর্য হুমায়ূন আহমদের আমার আছে জল ছবির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, বন-পাহাড়-নদী, হাওরের অপার সৌন্দর্য, পাখিদের ওড়াউড়ি, গায়ের বধূ, গরুর গাড়ি, গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য সবকিছু তিনি তুলে এনেছেন এই ছবির মাধ্যমে।
ছবিটির শুটিংয়ের আগে ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে হুমায়ূন আহমেদ শ্রীমঙ্গল বেড়াতে যান। শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী বাইক্কা বিল, কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হাইল হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে তিনি অভিভূত ও মুগ্ধ হয়েছিলেন। ফলে তিনি তার ছবির জন্য বেছে নিয়েছিলেন মৌলভীবাজার জেলাকে। সেসময়ে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘শ্রীমঙ্গল তথা মৌলভীবাজার জেলার মানুষ অতিথিপরায়ণ ও বন্ধুবত্সল। মৌলভীবাজার জেলাবাসীর ভালোবাসা-ভালোলাগাকে সঙ্গী করে চরম পরিতৃপ্তি নিয়ে কাজ করেছি। আমার কাছে মৌলভীবাজার জেলা একটি প্রাকৃতিক সুরম্য জেলা মনে হয়েছে। এ জেলাটি আমার অসম্ভব প্রিয়। আর প্রিয় মৌলভীবাজার জেলায় আবারো ফিরে আসবো আমি।’