কথা হোক! আরো কথা হোক!

তানভীর তারেক

 

‘দিনব্যাপী কর্মশালা’—এমন শিরোনামের কোনো আমন্ত্রণ এলেই মনের ভেতরে কাঠখোট্টা এক আয়োজনের ছবি ভাসে। কিন্তু সেই কর্মশালার মূল বক্তা যদি হন বরেণ্য শিক্ষাবিদ-কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, তাহলে হিসেবটা অন্যরকম তো হবেই!

আয়োজনটি ছিল মূলত ক্যাডেট কলেজ ক্লাবের পৃষ্ঠপোষকতায় ক্লাব লিটারেরি সোসাইটি সাময়িকী ১-এর ‘কবিতা সংখ্যা ২০১৯’-এর প্রকাশনা উত্সব এবং দিনব্যাপী সাহিত্য কর্মশালা। সকালে নাস্তা খেয়েই সাহিত্যের বিভিন্ন ডালপালা নিয়ে যখন কথা বলছিলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, প্রায় টানা দেড়ঘণ্টা কথা বলার মাঝখানে স্যারকে হঠাত্ বিশ্রাম বা কিছুটা বিরতি নেওয়ার এক চিরকুট পাঠালেন আয়োজক প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শাকুর মজিদ। চিরকুট হাতে নিয়েই তাতে কী লেখা সে বিষয়ে দর্শকদের সামনে না বলে মনজুরুল ইসলাম শুধু বললেন, ‘শোনো শাকুর মজিদ, আমি ছাত্রদের পড়াই। ৩/৪ ঘণ্টা একটানা লেকচার দিই আমি। এসবের ভয় দেখিয়ে আমায় লাভ নেই।’

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তার দীর্ঘ ৩ ঘণ্টার আলোচনায় গ্রিক পুরাণ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, রবীন্দ্রসাহিত্য, উপনিবেশিক আমলে এ অঞ্চলের কথাসাহিত্যের উদ্ভব এবং বিকাশের পাশাপাশি সাহিত্যে জাদুবাস্তবতার বিশ্বময় প্রয়োগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন। ছোট ছোট উদাহরণ টেনে কী দারুণভাবে এ সমাজের চালচিত্র তুলে ধরলেন!

তাতে যেমন উঠে এলো আমাদের কথাসাহিত্যে কোন যুক্তিতে রিকশাওয়ালাকে ‘তুই’ সম্বোধন করি আমরা। একইভাবে কোনো আয়োজনে একজন বিদেশি থাকলেও আমরা ইংরেজি বক্তৃতা দেওয়ার জন্য প্রাণপণ প্রতিযোগিতায় সামিল হই ইত্যাদি প্রসঙ্গ। কথার ভেতরেই আমাদের সামাজিক বোধের বিষয়গুলো একেবারে স্পষ্ট করে তুলে ধরলেন তিনি। এক বিষ্ময়কর ব্যাপার ঘটে যায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের বক্তব্যের সময়! ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে তার সুখ্যাতি দেশ-বিদেশে। অথচ কোনো টকশো বা যেকোনো আলোচনায় তার বক্তব্যে একটি ইংরেজি শব্দের ব্যবহার না করে প্রমিত বাংলায় কী দারুণভাবে কথা বলেন!

কর্মশালার বিষয় ছিল বৈশ্বিক পরিমণ্ডল থেকে শুরু করে বাংলা ভাষার সূচনা পর্ব, আধুনিক ও উত্তর আধুনিককালের কথাসাহিত্যক রূপরেখা ইত্যাদি। এই বিস্তর বিষয় নিয়ে কথা শুনতে গিয়ে মনে হলো যেন গুলশানের এই ক্যাডেট কলেজ ক্লাবের হলরুমে কোনো বিখ্যাত মিউজিশিয়ান তার সুর বাজিয়ে মোহমুগ্ধ করে রেখেছেন সকলকে।

ক্যাডেট কলেজ ক্লাবের কবিতা সংখ্যার সম্পাদক লুত্ফুল হোসেন বললেন, ‘আপনাদের কাছে আজকের এ দিনটি কেমন মনে হচ্ছে জানি না। তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে ১২টি চাঁদের নিচে গোটা একটি দিন। পরে তিনি দেখালেন গোটা হলরুমে গোলাকার আলোর সংযুক্তি আছে মোট ১২টি।’

ক্যাডেট কলেজ ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জসিম আল আমিনের শুভেচ্ছা বক্তব্য এবং লিটারেরি সোসাইটির চেয়ার শাকুর মজিদের স্বাগতিক বক্তব্যের পরপরই সকাল ১০টায় শুরু হয় মূলপর্ব। এমন আলোচনার ফাঁকে কিছুক্ষণের খাবার বিরতি যখন হচ্ছিল তখন অধিকাংশ সাহিত্যপিপাসুর মনের জিজ্ঞাসা আবার কখন আলোচনাটা শুরু হবে। প্রশ্নোত্তর পর্বে সংবাদ বক্তিত্ব সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা তার স্বভাবসুলভ অফিসিয়াল পরিচয় যখন দিচ্ছিলেন তখন তারই প্রতি-উত্তরে আরেক জাঁদরেল সাংবাদিক নজরুল কবীর মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলে উঠলেন, ‘ইশতিয়াক ভাই এমন দারুণ সাহিত্য সভায় এসে নিজের কবি পরিচয়টা কেন গোপন করলেন বুঝলাম না। তিনি তো আমাদের ক্যাম্পাস মাতানো প্রেমিক কবি।’

কর্মশালায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার থেকে তার অভিজ্ঞতার গল্পগুলোর জাদুময়তায় সবাই আটকে ছিলাম। নয়তো বারবার মনোবিদ ও সাহিত্যিক মোহিত কামাল নিজের এই ভালোলাগা বা আত্মগুরুত্ব বোঝানোর জন্যই বলছিলেন, ‘আমি খুবই ব্যস্ত মানুষ। তবুও স্যারের কথা শোনার জন্য চলে এসেছি।’ মূলত সকলেরই অনুভবটা এমনই ছিল ২০ সেপ্টেম্বর।

শাকুর মজিদ নিবিষ্ট মনে তার নানারকম গেজেট নিয়ে অনুষ্ঠান ধারণ থেকে শুরু করে ফেসবুক লাইভে ব্যস্ত ছিলেন। অন্যদিকে এদেশের সবচেয়ে নান্দনিক সাহিত্যপত্র ‘কালের খেয়া’র সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক মাহবুব আজীজকে পেয়ে তরুণ-তরুণী, লেখকরা তাদের কবিতা প্রকাশের আবদারটিও বাদ রাখলেন না।

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে কম কথা খরচ করেছেন সৈয়দ শামসুল হক পূত্র লেখক দ্বিতীয় সৈয়দ হক। একেবারে চুপচাপ সবকিছু যেন অবলোকন করে গেলেন। প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে দুটি ছোট ছোট বক্তব্য পাঠের সময়কালে কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন তার লেখালেখি গল্প জানাতে গিয়ে তিনি যে বিস্তর বিদেশি সাহিত্য পড়ে মনের রসদ সমৃদ্ধ করেছেন তেমনই জানিয়ে মুগ্ধ করলেন আমাদের।

কথাসাহিত্যিক মাসুদুল হক কথাসাহিত্যে ভাবনা রশদ নিয়ে দারুণ এক বক্তব্য দিলেন। এমন সাহিত্য নিয়ে কথকতায় একজন ক্যাডেট বক্তা মাইক্রোফোন নিয়ে বললেন, ‘ভাবুন তো, এই সাহিত্য আসরে জীবনানন্দ এসে কী বলতেন?’

অধ্যাপক মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে পারস্পরিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন লেখক ইকরাম কবীর, জ্যাকি কবীর, মাসরুর আরেফিন, মাসুদুল হক, অভিক রহমান, ক্যাডেট কলেজের সাবেক শিক্ষক জায়েদুল আলম, আবু রইস, হাসনাত হারুনসহ অনেকে। জ্যাকি কবীর তার প্রবন্ধে বাংলা সাহিত্যে দশক অনুযায়ী নারী লেখকদের অবস্থান ও অবদান নিয়ে আলোচনা করেন।

ড. ফাতেমা দোজার উপস্থাপনায় মনোরম এই সাহিত্য আড্ডায় লিট সোসাইটির সদস্য ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, নজরুল কবীর, কামরুল হাসান শায়ক, মাজহারুল ইসলাম, মাহবুব আজিজ, শিমুল সালাহ উদ্দিনসহ অনেক লেখক, সাংবাদিক ও প্রকাশক।

অতিথির চেয়ারগুলোর এক কোণে গালে হাত দিয়ে প্রধান বক্তা শিক্ষাবিদ সাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সবার কথাগুলো কী মনোযোগ দিয়েই না শুনছিলেন। এছাড়া সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কথা বলার এক ধরনের জাদুকৌশল আছে! তা হলো—পুরো ঘরের শ্রোতা-দর্শকদের তিনি বিভিন্ন কথার ভাঁজে নাম ধরে ধরে সংযোগ তৈরি করেন। যেমন কথায় কথায় অন্য প্রকাশের কর্ণধার মাজহারুল ইসলাম হলরুমে ঢুকতেই তিনি বললেন, ‘আমি তো আমার বই প্রকাশ ও লেখালেখি পেশা নিয়ে খুব ভয়ে আছি ইদানিং। কারণ প্রকাশক মাজহারও এখন দারুণ লেখক হয়ে উঠেছেন।’

সারাদিনের এমন হিউমার সমৃদ্ধ কথামালায় তাই দর্শকরা কেউ আসন ছেড়ে উঠে যাওয়ার কথা ভাবেননি। নিবিষ্ট হয়ে মনে মনে বলছিলেন, কথা হোক, আরো কথা হোক!