আসন্ন শারদীয়া :লৌকিক ও অলৌকিক গল্পগুলো

অজয় দাশগুপ্ত

পূজা মানে কি কেবল দেবদেবী নিয়ে লেখা? আমাদের বদ্ধমূল ধারণা, এজাতীয় লেখাগুলো হবে এমন কিছু। আমার কেন জানি মনে হয়, এ ধারণা সঠিক নয়। আনন্দ আর ভালোবাসায় শিল্প-সংস্কৃতি ছিল বলে আমাদের সাহিত্যে পূজার লেখা মানে সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশ বা আবুল বাশারের উপন্যাস। পূজার গান মানে হেমন্ত, মান্না দে, কিশোর কিংবা লতা-রফির গান।

লৌকিক ও অলৌকিক নিয়ে মানুষের ধারণা ও বিশ্বাস চিরকাল সংঘাতময়। ধরুন, যদি বিবেকানন্দকে দিয়ে শুরু করি, আজকাল কি কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে যে রামকৃষ্ণ তাকে মা কালীর সঙ্গে দেখা করিয়েছিলেন? কিংবা ঋষি অরবিন্দ বলেছেন, কারাগারে থাকার সময় বিবেকানন্দ তাকে গীতা শুনিয়ে প্রাণিত করার পরই তিনি আধ্যাত্মিক ধারায় ফেরেন। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর কথাই ধরুন। এক বয়সে সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়মের বাইরে প্রেম করে বিয়ে করলেন ফিরোজ গান্ধীকে। রাজনীতি করলেন রাশিয়ার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে। অথচ শেষ বয়সে কিছু হলেই চলে যেতেন কাশ্মীরে এক সাধুর আখড়ায়। শান্তিনিকেতনে লেখাপড়া করে বড়ো হয়ে ওঠা মুক্ত মনের নারী বলে খ্যাত ইন্দিরার জীবনেও অলৌকিকতা কাজ করেছে এভাবে।

বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম লেখক হুমায়ূন আহমেদ। তাকে আপনি গালমন্দ করতে পারলেও এড়াতে পারেন না। চমত্কার গদ্য লিখতেন। একবার লিখেছিলেন তার এক আমেরিকা প্রবাসী বন্ধুর সঙ্গে রাতে ঘুরছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। ঘুরতে ঘুরতে রাত দুপুরে তাদের চায়ের তেষ্টা পেলে তারা এগোতে থাকলেন চা-দোকানের দিকে। দেখলেন, ওদিক থেকে হনহন করে হেঁটে আসছেন একজন পাগল কিসিমের মানুষ। দূর থেকে দেখেই বুঝলেন রাতবিরাতে ঘুরে বেড়ানো মানুষ। উদোম গা। লুঙ্গি আর হাতে কিছু একটা। হুমায়ূন আহমেদ লিখছেন, তার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল এই পাগলা লোকটিকে বলেন, সালাম আলাইকুম। কিন্তু পারছেন না। পাশে আমেরিকা প্রবাসী বিজ্ঞানী বন্ধু। ভাববে ও মুখে মুখে প্রগতিশীলতা আর রাতদুপুরে ফকির দেখে ভক্তিতে গদগদ। তো তারা হাঁটছেন পাগলাও এগিয়ে আসছেন। কাছাকাছি হতেই লোকটি হুমায়ূন আহমেদের দিকে তাকিয়ে বেশ জোর গলায় হাঁক দিয়ে বলেছিলেন : ওয়ালাইকুম আসসালাম। স্তম্ভিত বিচলিত হুমায়ূন আহমেদ থতমত খেয়ে গেলেন বটে কিন্তু এর জট খুলতে পারেননি কোনোদিন।

আমি তখন চট্টগ্রামে। একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে চাকরি করি। আমি কাজ করতাম জেনারেল ম্যানেজারের অফিসে। সেখানে দারোয়ান, পিওন, ম্যাসেঞ্জারের ছড়াছড়ি। এর ভেতর একজন ছিলেন, যিনি দেখতে ছোটোখাটো। যতদূর জেনেছি, দুই বিবি নিয়ে থাকেন। আমার প্রতি তার কেমন জানি একটা টান ছিল। মাঝে মাঝে এমন সব কথা বলতেন আর কাজ করতেন, আমি বেশ হিমশিম খেয়ে যেতাম তার কারণ খুঁজে বের করতে। একবার হইহই কাণ্ড আমাদের অফিসে এলেন ব্যাংকের এমডি। বাংলাদেশে যা হয়, পারলে তার জুতা সাফ করে দিতে প্রস্তুত ১০০ জন। আমরা তখন নবীন অফিসার। কে আমাদের খবর রাখে? যেদিন এমডি এলেন, সাজসাজ রব। আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই লোক। বিড়বিড় করে সুরা বা কিছু পাঠ করা তার স্বভাব। হঠাত্ একটা বড়ো ফুঁ দিয়ে আমাকে ফিসফিস করে বলল, এমডি সাহেব কিন্তু এখন আপনার কাছে আসবে। এমডি কম্পিউটার রুম থেকে বেরিয়ে গটগট করে জি এম চেম্বারের দিকে যাবার পথে হঠাত্ই ঘুরে দাঁড়িয়ে সোজা মাঝখানের সারিতে আমার সামনে। আমার তো রীতিমতো ঘাম বেরোচ্ছে। বলে কী! আমি কী কাজ করি কী কী দেখি—এসব দু-একটা মামুলি প্রশ্ন করেই পাশে দাঁড়ানো বড়ো এক কর্তাকে বললেন, একে আমাদের হেড অফিসে বদলি করুন। পাবলিক রিলেশনস অফিসার হিসেবে। পাশের কর্তা তো পারলে আমাকে তখনই ট্রেনে তুলে দেয়। বাকি কাহিনি এখানে অবান্তর। কিন্তু এ ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা আমি পাইনি আজও। যেমন পাইনি অন্ধ হাফেজের বাণীর। যিনি আমার হাত ধরে বলেছিলেন, বিদেশেই যাবে। ওখানেই হবে যা হবার।

তারুণ্যে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতে পছন্দ করতাম। সন্ধ্যায় আমি প্রায়ই চট্টগ্রাম রামকৃষ্ণ মিশনে যেতাম। একবার গিয়ে দেখি স্বামীজী এসেছেন ঢাকা থেকে। স্বামী অক্ষরানন্দজি। আমিও গেলাম একান্তে দেখা করতে। কী চমত্কার গৈরিক বসন। মাথায় টুপি। দেখেশুনে মুগ্ধ আমি তাকে বললাম, সাধু হতে চাই। কী করতে হবে? সব শুনে স্মিতহাস্যে বললেন, তোমার দরকার নাই সাধু হবার, তুমি যা ভালোবাসো তা-ই করো। আমি আমার ছোট লাল নোটবইটা মেলে দিয়ে কিছু লিখে দিতে অনুরোধ জানালে তিনি আমাকে বিস্মিত করে লিখেছিলেন, আজীবন সত্য কথা বলিবে। আমি তখন ঘামছি। আমি যে মিথ্যা বলি উনি জানলেন কেমনে? সেই বোধহয় আমার বানিয়ে বানিয়ে বলা শেষ।

পূজার লেখায় এই অলৌকিক বা আধো বিশ্বাসের কাহিনিগুলো কি যায়? না গেলেও এবার তা-ই হোক।

n লেখক : সিডনি প্রবাসী লেখক