কমল কান্ত রায়
নাম সুখি রানী। পাকিস্তান আমলে বিয়ে হয়েছে। বয়স যখন পাঁচ বছর তখন থেকে আজও হাতে রয়েছে বাঁশ। জীবিকার তাগিদে স্বামীর সঙ্গে সংসারের হাল ধরেছে সুখি রানী। স্বামী ষষ্ঠী দাস। সনাতন ধর্মাবলম্বী দাস সম্প্রদায়ের। বাপ-দাদার আদি পেশা বাঁশের তৈরি সরঞ্জাম তৈরি করে তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা। তাদের কোনো জমাজমি নেই। একরকম দিন এনে দিন খাওয়ার মতো। মজার ব্যাপার হলো সাধারণ লোকজন নিজেদের প্রয়োজনে সন্তানদের লেখাপড়ার ওপর গুরুত্ব দিলেও এই সম্প্রদায়ের লোকজন লেখাপড়ার দিক থেকে এখনো অনগ্রসর। যে বয়সে একটি শিশুকে হাতেখড়ি দেওয়া হয় শিক্ষার, সেই বয়সে ঐ শিশুকে শেখানো হয় বাঁশের তৈরি সামগ্রীর কাজ। জন্মের পাঁচ/ছয় বছর থেকেই তাদের হাতে দেওয়া হয় বাঁশ। শেখানো হয় বাঁশের কাজ। হোক সে ছেলে কিংবা মেয়ে। মেয়েরা বাপের বাড়ি থেকে শেখার পর স্বামীর বাড়িতে এসেই সেই কাজ করে। স্বামীর সংসারে হাল ধরে। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী ইউনিয়নের বেতগাড়ী হাটসংলগ্ন একটি গ্রাম। এখানে ২৫ পরিবারের বাস। অনেকে এটিকে বাঁশপল্লিও বলে। পুরুষ, মহিলা, ছেলেমেয়ে সবাই এ কাজে ব্যস্ত। এদেরই একজন সুখি রানী।
সুখি রানীর বাপের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ছড়ান বালুয়া গ্রামে। তিন ছেলে এক মেয়ে কেউ লেখাপড়া করেনি। বিয়ে দিয়েছেন সবারই। ছেলের বউরাও বাঁশের কাজ করে। লেখাপড়া করেননি কেন? বাপের বাড়ি থেকে ইগলা (এসব) কাজ শিখে এসেছি। কথা হয় সবিতা রানীর (৩০) সঙ্গে। স্বামী খট্টু দাস। বাপের বাড়ি সৈয়দপুর উপজেলার বড়ুয়া গ্রামে। তারাও এসব কাজের সঙ্গে জড়িত। বাপের বাড়িতে এসব বাঁশের কাজ শেখানো হয়। যাতে মেয়েরা স্বামীর বাড়িতে গিয়ে এ কাজ করে সংসারের হাল ধরে। এরপর কথা হয় ববিতা রানীর (২৫) সঙ্গে। স্বামী নান্দু দাস। কোনো লেখাপড়া নেই। ববিতার বাপের বাড়ি নীলফামারী জেলার বড়ুয়া গ্রামে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। এরপর বিয়ে হওয়ার পর থেকে স্বামীর সংসারে হাল ধরেছেন। এক ছেলে, এক মেয়ে। ঐ গ্রামের সুধা রানী দাস (৫২) জানান, আমরা জন্মের পর থেকে বাপের বাড়িতে এসব কাজ শিখে এসেছি। ৪৫ বছর ধরে এসব কাজ করছি।
আমাদের সন্তানরাও বাঁশের কাজ শিখছে। তিনি আরো জানান, বর্তমানে দু-একজন করে লেখাপড়া শিখছে। তাদেরও রয়েছে দুঃখ-হতাশা। সকাল থেকে চলে তাদের কাজ। স্বামীরা বাঁশের তৈরিকৃত ডালি, কুলা, চালনি, ফুলদানিসহ নানা রকমের সরঞ্জামাদি বাজারে কিংবা ফেরি করে বিক্রি করে। বাজার থেকে বাঁশ কিনে আনে। কিন্তু যুগ যুগ ধরে আদি পেশাকে আগলে রাখলেও তাদের অবস্থার কোনো উন্নতি নেই। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। তাদের আক্ষেপ— পুঁজির অভাব কিংবা আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্লাস্টিকের জিনিসপত্রের বাজারে বাঁশের তৈরি মালামালের আজকাল কদর নেই। সুখি রানী, সবিতা ও ববিতার মতো ফুলতি, মিনতিসহ সবার পরিবারে নেই উন্নয়নের ছোঁয়া। দিন যায়, সময় বয়ে চলে, কোনো উন্নয়ন নেই এসব পরিবারে। পুঁজি সংকট এ অভাবকে আরো প্রকট করেছে। উন্নত ধরনের প্রশিক্ষণ পেলে এ পরিবারগুলো বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী তৈরি করে শিক্ষাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অগ্রগতি হতো বলে এলাকাবাসী মনে করেন।