চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা সদরের নেয়াজর পাড়ায় ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জনতা শাহপীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এলাকার ছয় শিক্ষানুরাগী জান বকসু, রশিদ আহমদ, খায়ের আহমেদ, হাফেজ আহমদ, বদিউর রহমান এবং আবদুল বারী নিজেদের খতিয়ানভূক্ত জমি দান করে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় বিদ্যালয় ভবনের সামনের দুই শতক জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
সময়ের পরিক্রমায় সেই বিরোধ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এলাকার মুরব্বি, উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত গড়ালেও মীমাংসা হয়নি। বিরোধের মারপ্যাচে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে শিক্ষকদের আর ব্যাহত হয়েছে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পাঠদান। অন্যদিকে এলাকাবাসী হয়ে পড়ে দ্বিধাবিভক্ত। বিরোধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ ২৮ বছর পর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর মধ্যস্থতায় বিদ্যালয়টি ফিরে পেল জমি।
জানা যায়, ২০১৩ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হয়। ফলে বিদ্যালয়টিতে সরকারি বরাদ্দ আসা শুরু হয়। সম্প্রতি বিদ্যালয়ে সরকারিভাবে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ শুরু হলে সেই দুই শতক জমির বিরোধ তুঙ্গে উঠে। বিরোধ মেটাতে এবার দৃশ্যপটে আসেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদ্মাসন সিংহ। তিনি স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি), বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তাকে নিয়ে বিরোধীয় পক্ষের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে শেষ পর্যন্ত তা মধ্যস্থতা করতে সমর্থ হন। বিরোধীয় পক্ষের আবদুল বারী ও জান বকসুর উত্তারাধিকারীরা দুই শতক জাম বিদ্যালয়কে দান করে দেন। বিরোধ মেটাতে গিয়ে বিদ্যালয়ের প্রতি সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদ্মাসন সিংহের মায়া জমে যায় এবং বিদ্যালয়ের জন্য কিছু একটা করতে আগ্রহী হয়ে উঠেন। বিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ওমর ফারুকের পরামর্শে তিনি ১৭০ জন শিক্ষার্থীর পিছিয়ে থাকা বিদ্যালয়টির দায়িত্ব নিয়ে নেন।
বিরোধীয় পক্ষের আবদুল বারী জানান, আমরা না বুঝেই এতোদিন বিদ্যালয়ের জমি দখলে রাখার চেষ্টা করেছি। এসিল্যান্ড ও শিক্ষা কর্মকর্তা সাহেবরা আমাদের এলাকার না হয়ে বিদ্যালয়টির জন্য যে আন্তরিকতা দেখিয়েছেন তার জন্য বিদ্যালয়কে জমি দান করে দিয়েছি।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কাজল কান্তি শীল জানান, বিদ্যালয়টি প্রতি এসিল্যান্ড মহোদয়ের আন্তরিকতা কোনদিন ভুলতে পারব না। এসিল্যান্ড মহোদয় ইতিমধ্যে বিদ্যালয় এসে পঞ্চম ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সাথে কুশল বিনিময় করেন এবং গণিত বিষয়ের উপর ক্লাসও নিয়েছেন।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন জানান, জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি মীমাংসাসহ বিদ্যালয়টির দায়িত্ব নেয়ার জন্য এলাকাবাসী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই খুশি।
এ ব্যাপারে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ওমর ফারুক জানান, বিরোধ মেটাতে তিনি কোন রাখঢাক ছাড়াই বিদ্যালয়ের প্রতি তার আন্তরিকতার কথা জানান। তখন তাকে অনুরোধ করি বিদ্যালয়টিকে দত্তক হিসেবে নেয়ার জন্য। তিনি তাতে রাজিও হয়ে যান। বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য তিনি ইতিমধ্যে দশ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছেন এবং একটি শহীদ মিনার করার জন্য প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। তিনি কমিটমেন্ট দিয়েছেন মাসে অন্তত একবার হলেও বিদ্যালয়ে যাবেন।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদ্মাসন সিংহ জানান, বিদ্যালয় ও বিদ্যালয়েরর শিক্ষার্থীদের সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশের জন্য জমিটুকু অবশ্যই দরকার ছিল। তাই বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে বিষয়টি আপোষ মীমাংসা করতে হয়েছে। এসব করতে গিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার আন্তরিকতা জমে যায়। যতদিন লোহাগাড়ায় আছি ততদিন তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করবো।