বরেন্দ্র অঞ্চলে সৌদির খেজুর চাষ

মোকসেদ আলীর কখনো সৌদি আবর যাওয়ার সুযোগ হয়নি। বয়স প্রায় ৬৩ বছর। টেলিভিশনের এক প্রতিবেদনে দেশের অন্যত্র সৌদি খেজুর চাষের গল্প শুনে শখ জাগে নিজেই সৌদি খেজুর চাষ করবেন। আর সেই শখকে রূপ দেন কৃষক মোকসেদ আলী। বরেন্দ্র ভূমির নাচোলে ৯০ শতক জমিতে গড়ে তুলেছেন সৌদি খেজুর বাগান। তার বাগানে ''আজোয়া'' ''ক্ষীর” “সুলতান'' খালাস'' মরিয়ম'' সহ ১১ জাতের খেজুর রয়েছে। এর মধ্যে দামি জাত হচ্ছে আজোয়া।

 

ঘটনার শুরু ২০১৭ সালের দিকে। শখকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য মোকসেদ আলী প্রথমে যোগাযোগ করেন আফগানিস্তানে থাকা প্রকৌশলী রইসুদ্দিনের সাথে। প্রকৌশলী রইসুদ্দিন সম্পর্কে তার আপন চাচা শশুর। তার কাছে সৌদি খেজুর চাষের ইচ্ছা পোষণ করেন। সেই আত্মীয় সৌদি আরব থেকে খেজুরের বীজ পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

 

এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের জনক কৃষক মোকসেদ আলী। বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার ভেরেন্ডি গ্রামে। নাচোল-আড্ডা মেইন সড়কে ভেরেন্ডি বাজার থেকে আধা কিলোমিটার পূর্বে গেলেই রাস্তার ডান পাশে চোখে পড়বে একটি ফলক। ফলকে লেখা রয়েছে “বরেন্দ্র ভূমিতে সৌদির খেজুর বাগান ও নার্সারি” বাড়ির পাশেই লাগোয়া জমিতে ছেলে ওবাইদুল ইসলাম রুবেলকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন সৌদি খেজুর বাগান।

 

প্রথম দফায় মোকসেদ আলী সৌদি আরব থেকে ৪৫০ ঝাড় খেজুর চারা  নিয়ে আসেন। একেকটি বীজের জন্য খরচ পড়ে  ২৮৮ টাকা। সেগুলো চারা করে তার মধ্যে ৪২৭টি খেজুর গাছ তিনি ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মার্চ মাসে রোপন করেন। বাকি গুলো চারা হিসাবে বিক্রি করেছেন বলে মোকসেদ আলী জানান। তার একেকটি চারার দাম ৪’শ থেকে ৪’শ ৫০ টাকা। দ্বিতীয় দফায়ও আরো ৮০০ খেজুর বীজ আনেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কুরিয়ারের মাধ্যমে। যেগুলো চারা করে বিক্রি করছেন। এ পর্যন্ত মোকসেদ আলী প্রায় ১০/১২ লাখ টাকার চারা বিক্রয় করেছেন। তবে বীজ ক্রয়, চারা তৈরি, রোপন এবং এ পর্যন্ত পরিচর্যা বাবদ ব্যাপক টাকা খরচ হয়েছে বলে মোকসেদ আলী জানান।

 

মোকসেদ আলী জানান, আশপাশের উপজেলা সহ সিলেট, শরিয়তপুর, নঁওগা, নেত্রকোনা, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ ও রাজশাহীতেও তার চারা বিক্রি হয়েছে। কিভাবে বাইরের মানুষ জানতে পারলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার ছেলে ফেসবুকে স্ট্যটার্চ দিয়ে  প্রচার অভিযান করেছেন।সেখান থেকে তারা জানতে পেরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের  শিবগঞ্জের এক জন চাষি ৬২০ টা চারার অর্ডার দিয়েছেন।

 

মোকসেদ আলী বলেন, আনেকেই শখের বসে তার খেজুর বাগান দেখতে আসেন প্রতিদিন। এছাড়া উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ছাড়াও চাঁপাইনবাবগঞ্জের হটিকালচারের এক কর্মকর্তা তার খেজুর বাগান পরিদর্শন করেছেন। আগামীতে আরো তিন বিঘা জমিতে খেজুর বাগান সম্প্রসারণ করার ইচ্ছা আছে বলে জানান মোকসেদ আলী।

 

সৌদির খেজুর চাষে আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। কীটনাশক বা বালাইনাশক সবই স্তাভাবিক নিয়মে দিতে হয়। তবে খেজুর বাগানে সঠিক পরিচর্যা জরুরি। খেজুুর উত্পাদনের স্বাভাবিক সময়ের আগেও উত্পাদন হতে পারে বলে জানান তিনি। তবে তার ১৬-১৭ মাস বয়সী বাগানে কিছু কিছু গাছে খেজুর ধরেছে। নতুন গাছের খেজুর খেয়ে মোকসেদ আলির ছেলে ওবাইদুর ইসলাম রুবেল বলেন, জীবনে কোনদিন এতো মিষ্টি সুসাদু খেজুর খাইনি। কৃষক মোকসেদ আলীকে খেজুর বাগান গড়ে তুলতে সব সময় সাহযোগিতা করছেন তার একমাত্র ছেলে রুবেলই। তিনি জানান, একটি গাছ ৫০ থেকে ১৫০ বছর পর্যন্ত খেজুর দেয়। আর প্রতি মৌসুমে একটি পরিপূর্ণ খেজুর গাছ ২৫০ থেকে ৩০০ কেজি পর্যন্ত ফল দেয়।

আর তাই ভালো উত্পাদনের আশা নিয়ে সামনে এগোচ্ছেন কৃষক মোকসেদ আলী ও তার ছেলে রুবেল।

বরেন্দ্র ভূমিতে সৌদির খেজুর চাষে সফলতা কিংবা সম্ভাবনা কতটুকু তা জানতে যোগাযোগ করা হয় নাচোল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা(ভারপ্রাপ্ত)কিশোর কল্লোল সরকার এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বরে্ন্দ্র ভুমিতে সৌদির খেজুর চাষ এটি একটি সত্যি লাভজনক, তবে এটি সারাদেশে কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করা হবে।

 

ইত্তেফাক/এএম