শফিকুর রহমান রয়েল
বহু জল্পনা কল্পনা ও নাটকীয়তার পর সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন এবং স্বাধীন কাজাখস্তানের সৃষ্টি। এমনও আশঙ্কা ছিল যে, স্বাধীনতা হয়তো তাদের জন্যে শেষ পর্যন্ত অভিশাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অর্থাত্ দীর্ঘদিনের নির্ভরশীলতার পর হঠাত্ করে একা চলতে গিয়ে বিশেষ করে অর্থনীতির অবস্থাকে লেজেগোবরে করে ফেলতে পারে তারা। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে যেন ঠিক তার উলটোটা। ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে কাজাখস্তান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মৌলিক নিয়ামকগুলোর একটি হিসেবে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে আসছে বিনিয়োগ নীতির ওপর। এর পেছনে যুক্তি হচ্ছে, বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সহজতর করবে এর ফলে উন্নতি ঘটবে জীবনমান ও সমাজকল্যাণে। জেনে বিস্মিত হতে হয়, স্বাধীনতার ২৮ বছরে কাজাখস্তান বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট করেছে ৩২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি।
সাবেক পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত কাজাখস্তান আজ একাই বৈশ্বিক অর্থনীতির এক বড়ো খেলুড়ে এবং আকর্ষণীয় বিনিয়োগস্থল। বিশ্বের সর্ববৃহত্ বাণিজ্যিক করিডোর কাজাখস্তান অতিক্রম করায় সংগত কারণেই সেখানে দেশি ও বিদেশি অর্থায়নে অবকাঠামো উন্নয়ন ঘটছে ক্রমাগতই। বলয় তৈরি ও রাস্তা নির্মাণে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো উপায় নেই। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান তাকে ইউরোপীয়, এশীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত হতে সহায়তা করেছে, যেখানে উদ্ভূত হয় বিশ্বের মোট জিডিপির ৬৫ শতাংশ।
অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে কাজাখস্তান বিভিন্ন খাতে ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষি, পেট্রোকেমিক্যাল, ধাতুবিদ্যা, পর্যটন ও ঔষধ তৈরি। অনুকূল বিনিয়োগ আবহ তৈরি করতে সে দেশের সরকার একের পর এক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। যেসবের লক্ষ্য একটাই, যে কোনো উপায়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করা আর এর পাশাপাশি দেশি বিনিয়োগ তো এমনিতেই বাড়বে। একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে উঠবে—কর প্রণোদনার প্রস্তাব দেওয়া বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১২টি। অধিকন্তু কাজাখ ইনভেস্ট (সে দেশের বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ) প্রকল্পগুলোকে সাহায্য করে ওয়ান স্টপ শপ হিসেবে, যাতে করে বিনিয়োগকারীদের ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে না হয়। এছাড়াও আসটানা ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্সিয়াল সেন্টার (এআইএফসি) কেন্দ্রীয় এশীয় অঞ্চলের জন্যে চালু করেছে ইংলিশ সাধারণ আইন নীতিসমূহ। এতসব ইতিবাচক পদক্ষেপের কারণেই আজ বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্স সূচকে কাজাখস্তানের অবস্থান ২৮ নম্বরে। এতেও সন্তুষ্ট নয় তারা, নিজেদের অবস্থানকে নিয়ে যেতে চায় আরো ওপরে। তার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় এশিয়ায় যে পরিমাণ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ঘটেছে, তার ৭৫ (২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) শতাংশই ঘটেছে কাজাখস্তানে।
গত ৫ বছরে সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে নেদারল্যান্ডস থেকে, যে অঙ্কটা হচ্ছে ৩৮.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর পরের অবস্থানেই যুক্তরাষ্ট্র (১৯.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। ১২.৫, ৬.২ ও ৪.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নিয়ে এর পরের স্থানগুলোতে রয়েছে যথাক্রমে সুইজারল্যান্ড, চীন ও ফ্রান্স। এখানে উল্লেখ্য গত ৫ বছরের এই বিনিয়োগের ৬০ শতাংশই ম্যানুফ্যাকচারিং, পরিবহন, বাণিজ্য, আর্থিক ও বিমা সেবাসহ অনির্যাস খাতগুলোয় ঘটেছে।
বড়ো বড়ো বিদেশি বিনিয়োগ প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেখে অভ্যন্তরীণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও অনুপ্রাণিত হচ্ছে এবং যথারীতি সাফল্যের মুখ দেখছে। কাজাখ ইনভেস্ট বর্তমানে ২১২টি দেশি বিনিয়োগ প্রকল্প ও উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত, যেগুলোর মূল্য দাঁড়ায় ৪২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এতে ৪২ হাজার নতুন চাকুরির সৃষ্টি হবে। সংগঠনটির সহযোগিতায় এ বছর চারটি দেশি প্রকল্পের উদ্বোধন ঘটেছে, যেগুলোর মূল্য দাঁড়ায় ২১৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১২.৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যেও আরো ৮৫টি দেশি প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে। গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিকভাবে এফডিআই প্রবাহে হ্রাস ঘটলেও কাজাখস্তান এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। সে জন্যে তারা নতুন এক কাঠামোগত কৌশল ব্যবহার করছে এবং তাতে সফলও হচ্ছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়েই বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার দায়িত্বটা স্থানান্তর করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে গঠন করা হয়েছে বিনিয়োগ আকর্ষণের সমন্বয় পরিষদ। খোদ প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি দেখভাল করায় স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগ আকর্ষণ কর্মকাণ্ডের গতি গিয়েছে বেড়ে।
—ফরেন পলিসি অনুসরণে