ক্রিকেটে ব্যর্থতা পরিত্রাণে করণীয়!

  শফিক হাসান

 

বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম অতীতে বাঘা বাঘা দলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভালো পারফরম্যান্স দেখালেও সম্প্রতি ছোটখাটো দলের সঙ্গেও অপ্রত্যাশিতভাবে গোহারা হারছে! স্বদেশের মাটিতেই এ পরাজয়ে দেশের আপামর ক্রিকেট বিশ্লেষকেরা দাবি জানিয়েছেন, ক্রিকেটারদের উচ্চ প্রশিক্ষণার্থে উগান্ডা পাঠানো হোক!

সেটা না হয় পাঠানো গেল, কিন্তু কেন এ হার, গলদটা কোথায়? ক্রিকেটারদের ব্যর্থতার কার্যকারণ

উদঘাটনের পাশাপাশি পরবর্তী সাফল্যের জন্য করণীয় বাতলাচ্ছি আমরা!

 

জাম্বুরার বলে প্র্যাকটিসে বিপত্তি

 

বাংলাদেশের দামাল ছেলেদের ক্রীড়াচর্চা শুরু হয় জাম্বুরা দিয়ে! জাম্বুরার অভাবে কাগজের দলা ও প্লাস্টিকের পুটুলি দিয়ে! জাম্বুরা, কাগজের বল দিয়ে খেলে হয়তো ফুটবলার হওয়া যায়—ক্রিকেটার হতে শতেক বাধা! ক্রিকেট একই সঙ্গে ধৈর্য ও শক্তিমত্তার খেলা। শারীরিক-মানসিক শক্তি বেশি দরকারি। সুতরাং জাম্বুরা দিয়ে ক্রীড়াভ্যাস গড়ে তোলা ছেলের পক্ষে দম ধরে রাখা কঠিনই! তাকে ন্যূব্জ করে রাখার পেছনে ভূমিকা রাখছে শৈশবের জাম্বুরাই! জাম্বুরায় লাথি দিতে গিয়ে কখনোসখনো তার মনে হয়েছে, জাম্বুরাটা ভেঙে একটু চেখে দেখলে কেমন হয়! এসব কল্পনায় মুখ থেকে লালা ঝরেছে, মন থেকে আক্ষেপ ঝরেছে কিন্তু জাম্বুরাকে রাখতে হয়েছে অক্ষতই!

মন্তব্য :নরম জিনিস দিয়ে প্র্যাকটিস করার কারণেই খেলোয়াড়রা বড় বেশি নরম-সরম! শৈশবের জাম্বুরা নয়, কাঠের কিংবা লোহার বল দিয়ে ক্রিকেটারদের প্র্যাকটিস করতে দেওয়া হোক! এতে তারা গরম থাকবে।

 

এ-ধারকা মাল ও-ধারে ব্যর্থতা

 

শৈশবে অন্যের গাছের বরই-আম-জাম গাছে ঢিল মেরে গাছ মালিকের দাবড়ানি খায়নি, এমন বাংলাদেশি কমই আছে! ধুরন্ধরেরা গাছমালিকের উপস্থিতি টের পেতেই পগারপার। কম তাগদওয়ালাই ধরা পড়ে কটুবাক্য হজম করে। রসালো ফলের আস্বাদ গ্রহণ করতে পারুক বা না পারুক! ক্বরিত্কর্মারা দিনে ব্যর্থ হয়ে রাতে উপস্থিত হতো গাছতলায়। তখন পারলে গাছসহই উপড়ে নিয়ে আসে! শেষপর্যন্ত অধিকাংশ ফলই লোপাট করে দিতে সমর্থ হয়। এভাবেই বেড়ে ওঠা বাংলার ডানপিটে সন্তানদের কেউ চোর অপবাদ দেয় না। বয়সের ধর্ম আখ্যা দিয়ে উল্টো প্রশ্রয় দেয়!

মন্তব্য :আজকে যারা ক্রিকেটে আশানুরূপ পারফরম্যান্স করতে পারছেন না, তারা যে শৈশবে এ-ধারকা মাল ও-ধার করতে গিয়ে প্রায়ই ধরা পড়তেন এটা স্পষ্ট। ভবিষ্যত্ ক্রিকেটারদের জন্য অবশ্য এদিকটা ভালোভাবে খেয়াল রাখতে হবে। তবে, এসব করতে গিয়ে যেন তারা রাজনীতিক হয়ে গেলে সমূহ বিপদের আশঙ্কা!

 

শ্রুতিমধুর প্রতিশ্রুতির রকমফের

 

প্রেমিকার জন্য বাংলাদেশি প্রেমিক সব করতে পারে, স-ব। এমনকি জানও দিতে পারে। (ভাগ্যিস, সত্যি সত্যি জান দিতে হয় না! তাহলে শত শতবার জান দিতে খবর হয়ে যেত)! আকাশ থেকে তারা এনে তোমার খোঁপায় পরিয়ে দেব, তোমার মতো সুন্দরী পৃথিবীতে আর একজনও দেখিনি, তুমি ছুঁয়ে দিলেই আমি বীর হয়ে যাব—ধরনের কথার ফুলঝুরিই ছড়ায় বীরপুঙ্গবেরা। প্রেমিকারা সব না হোক, কিছু তো অন্তত বিশ্বাস করে! তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি দেয় রাজনীতিকেরা। তারা নির্বাচনের আগে প্রায়ই প্রতিশ্রুতি দেয়— ক্ষমতায় গেলে ব্রিজ বানিয়ে দেব, ঘরে ঘরে চাকরি দেব, চালের মূল্য শায়েস্তা খাঁর আমল থেকেও কমিয়ে দেব...! এর ১ ভাগও রক্ষিত হয় না। তাতে কী, প্রতিশ্রুতি দেনেওয়ালারা দিয়েই যাবে!

মন্তব্য :কিভাবে প্রতিশ্রুতির মুলা মানুষের সামনে ঝোলাতে হয়, ক্রিকেটারদের শিখতে হবে। রাজনীতিকরা হাজারো অকাণ্ড করেও পার পেয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে বেচারা ক্রিকেটারদেরই কিনা ‘ঝাল’ সামলাতে হয় ক্ষণে ক্ষণে! ক্রিকেটাররা ইচ্ছা করলে রাজনীতিকদের কাছে প্রতিশ্রুতির কলাকৌশল শিখতে পারে। শিখতে গিয়ে নিজেরাই রাজনীতিতে জড়িয়ে গেলে ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হবে! রাজনীতিবিদদের কাছে না গেলে তুখোড় প্রেমিক হতে পারে। করতে পারে একাধিক প্রেম এবং পরকীয়ার চর্চা!

আমের সঙ্গে ছালাও

ফেরত নেওয়া হোক

 

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে জয়ের পাল্লা পাখির পালকের মতো হালকা হলেও পরাজয়ের গ্লানি হিমালয়ের চেয়ে ভারী! এই বিশাল জয়-পরাজয় নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট এগিয়ে চলেছে বছরের পর বছর। নিন্দা-ধিক্কারের ঝড় সামাল দিতেই হোক, কিংবা নিজেদের মডেল হওয়ার খায়েশ পূর্ণ করতে—কোনো কোনো সময় ক্রিকেটাররা বেশ ভালো সাফল্যই দেখায়। যাকে বলে মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া সাফল্য। একটু সাফল্য দেখানোর ফলেই সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও ক্রিকেট টিমকে এটা-ওটা উপহার দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে। পারলে তাদের উপহারের চাপে ডুবিয়ে মারে। সারাদেশ আনন্দে ভাসতে থাকলে ক্রিকেটারদের মুখে থাকে বিগলিত হাসি!

মন্তব্য :হাজার ব্যর্থতার পর সামান্য আলোর ঝলকানিতে যদি এই হয় অবস্থা, তবে উল্টোভাবে চিন্তা করলে কেমন হয়? মানে খেলায় খারাপ করলে ক্রিকেটারদের কড়া মাশুল দিতে হলে...? এভাবে জরিমানা দিতে দিতে তারা যখন দেখবে—আম যাচ্ছে, ছালাও অক্ষত থাকছে না, তখন ঠিকই ঘুরে দাঁড়াবে!

 

শপিংয়ের বদলে রান প্রত্যাশা

 

শপিং পছন্দ করে না, এমন মানুষ বিরল। বাংলাদেশি ক্রিকেটার এবং তাদের আত্মীয়স্বজনেরা এ সংস্কৃতিচর্চায় অনেকদূর এগিয়ে। বিদেশে খেলতে গিয়ে প্রায়ই ক্রিকেটাররা শপিং করতে মত্ত হয়ে যায়। শপিংয়ের চিন্তা থাকে খেলার মাঠেও। ভাবতে চেষ্টা করে, কে কী কিনতে বলেছিল। কিনে না নিলে আবার মাইন্ড করবে; কোত্থেকে পছন্দসই জিনিসটি কেনা যায়, দামই বা কেমন, হাতের নাগালে কি না—এসব মূল্যবান ভাবনায় সময় কেটে যায়, মাঠে সেরা পারফরম্যান্স দেখানো যায় না সঙ্গত কারণেই। তবে খেলায় যে ফলাফলই হোক, শপিংয়ে তারা শতভাগ সফল!

মন্তব্য :ক্রিকেটে বাংলাদেশ দল ভালো করার অব্যর্থ পদ্ধতিটি বিসিবি নয়, ক্রিকেটারদের পরিজনেরাই দিতে পারে। দেশে হোক কিংবা বিদেশে হোক, ক্রিকেটারদের পরিবার ও স্বজনেরা উপহার হিসেবে শুধু রান চাইবে। বাধ্য হয়ে ক্রিকেটাররাও রান আনার চেষ্টা করবে; নইলে যে প্রিয়জন বেজার হবে! আশা করা যায়, এ পদ্ধতিতে ক্রিকেটে নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটানো সম্ভব!