কে চেনো, ক্যাসিনো

  সত্যজিত্ বিশ্বাস

 

কোন এক কালে ‘শখের তোলা’র মূল্য ধার্য ছিল আশি টাকা। উহা বর্তমানে ব্যাক-ডেটেড হিসাব। এখন আর আগেকার মতো নিক্তি পাল্লায় ওজন হিসাব হয় না, ডিজিটাল মেশিনে হিসাব হয়। শখের মূল্য এখন অনেক।       

তবে তাই বলিয়া আমার শখ থামিয়া যায় নাই। ছোটবেলা হইতেই টেলিভিশনে যাহা দেখিতাম তাহাই হইবার শখ জাগিতো। গান দেখিলে গায়ক, নাটক-সিনেমা দেখিলে নায়ক, এমনকি স্পাইডারম্যান দেখিয়া স্পাইডারম্যান হইবার শখও চাপিয়া বসিয়াছিল মনে। খেলার মাঠের পাশের বটবৃক্ষের ঝুরি ধরিয়া টানাটানি করিয়া ঝুলিতে গিয়া আছাড় খাইয়া তবেই সে শখ সাঙ্গ হইয়াছিল।

আয়ুষ্কালের মধ্য গগনে আসিয়া বুঝিয়াছি, যে বৃক্ষ ধরিয়াই টানাটানি করি না কেন, অপর প্রান্তের কোনোকিছুই আমার চর্বি সর্বস্ব দেহের ভার বহন করিতে আগ্রহী নহে।         

বড়ো হইয়া ক্যারিয়ার গড়িয়া রোজ বিরিয়ানি খাইতে চাহিয়াছিলাম, জীবন আমাকে কেরানি বানাইয়া হাতে পানির গ্লাস ধরাইয়া দিয়াছে। তাও যদি ফস করা কোমল মিঠা পানি (কোক, স্প্রাইট) কিংবা শক্ত পানি (হার্ড ড্রিংকস) হইত। তবে বাকি সব ছাড়িয়া দিলেও হাল ছাড়ি নাই। ইদানীং মনে সুপ্ত বাসনা খেলা করিতেছে, জীবনে একবারের জন্য হইলেও ক্যাসিনোতে যাইব। ক্যাসিনোতে নাকি শক্ত পানির গ্লাস হাতে লইয়া খেলাধুলা করা যায়। সে খেলা খেলিবার, আর টাকায় না কুলাইলে কাছে গিয়া দেখিবার খুব সাধ।   

কিন্তু সাধ থাকিলেই তো হইবে না। কাকে জিজ্ঞাসা করব, কে চেনো, ক্যাসিনো? 

সাধ আর সাধ্যের সমন্বয় ঘটাইতে বন্ধুবান্ধবদের ডাকিয়া মুন্না মামার টং দোকানে চা চক্রের আয়োজন করিলাম। সবার হাতে চায়ের কাপ ধরাইয়া দিয়া ক্যাসিনো দেখিবার শখের কথা পাড়িলাম। মনে আশা ছিল, আমার আকুল আবেদনে বুঝি তাহারা ফান্ড গঠন করিয়া দরিদ্র বন্ধুটির শখ পূরণ করিবে। কীসের কী? 

শখ, শোকে পরিণত হইতে বেশি সময় লাগিল না। তবে মানিব্যাগে কেউ হাত না দিলেও পরামর্শ দিতে কেহই পিছ পা হইল না। কেহ পরামর্শ দিল সিঙ্গাপুর যাইতে, কেহবা আমেরিকায় কেহবা ইউরোপে। বুঝিয়া ফেলিলাম, এইভাবে অতিবাহিত হইতে থাকিলে উহারা আমাকে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করাইতে বেশি সময় লইবে না। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া চায়ের বিল মিটাইতে মানিব্যাগে হাত দিতেই কে যেন পিছন হইতে কাঁধে হাত রাখিল। ঘুরিয়া দেখিলাম সুমন।  

সুমন আমার কলেজ জীবনের বন্ধু। ঘাড়ে চড়া অভ্যাসের কারণে সেই সময় কেউ তাকে দেখিতে পারিত না। ঘাড়ে চড়া অভ্যাস মানে, কোনো খাওয়াদাওয়ার কিংবা খেলার চাঁদা দিবার বেলায় সে মুখ কালো করিয়া ফেলিত। অতঃপর কারো না কারো হাত, পা টিপিতে টিপিতে নিজ জীবনের কোনো না কোনো স্যাড স্টোরি বলিয়া তাকে ম্যানেজ করিয়া টাকা ধার করিত। সেই ধার কখনো শোধ করিয়াছে বলিয়া কেউ জানে না। প্রয়োজন পড়িলেই সিন্দাবাদের ভূতের ন্যায় ঘাড়ে চড়িয়া বসা অভ্যাসের কারণে আমিও তাহাকে এড়াইয়া চলিতাম। আজ কী কারণে সে কাঁধে হাত রাখিল কে জানে?    

সুমন ইশারায় আমাকে সামনে আগাইতে বলিল। গলির মোড়ের সামনে দাঁড়াইয়া বলিলাম, ‘কী বলবি, বল।’ সুমন ফিসফিস করিয়া বলিল, ‘এইখানে না, এইখানে অনেক মানুষ। খানিক দূরের ঐ আড়ালে চল।’ অবাক হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘কী এমন কথা যে আড়ালে গিয়া শুনিতে হইবে?’ সুমন কোনো কথা না বলিয়া মৃদু হাসিয়া আমার পশ্চাদ্দেশে একখানা গুঁতা দিল। আচমকা মনে কু ডাক ডাকিল। কী ব্যাপার, ও এমন করিতেছে কেন? আমাকে আড়ালে গিয়া ও কী বলিতে চায়? বলিতে চায় নাকি অন্য কিছু? ওর হাত, পা টিপাটিপির অভ্যাস তো কলেজজীবনেই ছিল। সেই অভ্যাস আরো বাড়িয়াছে নাকি? আড়ালে, আবডালে তো মানুষ ভালো কাজে লইয়া যায় না। কলেজজীবনের ঘাড়ে চড়া সুমন আজ কই চড়িয়া বসিবে? নাহ্, আর ভাবিতে পারিতেছি না। মাথা ঝিমঝিম করিতেছে।   

এমন সময় সুমন আবার ঘাড়ে হাত রাখিল। এক ঝটকায় সেই হাত নামাইয়া রাগ ঝাড়িলাম, ‘কী বলবি, এখানেই বল। আর কোথাও যাইতে পারিব না। কী এমন কথা, যে সেটা বলিতে চিপায় যাইতে হয়!’ এদিক, ওদিক তাকাইয়া সুমন আমার ডান কর্ণের সন্নিকটে ঠোঁট নিয়া ফিসফিস করিয়া কহিল, ‘তুই না ক্যাসিনোতে যাইতে চাহিয়াছিলি? আমি তোকে ক্যাসিনো দেখাইতে লইয়া যাইব।’

অহেতুক শঙ্কা দূর হইতেই নতুন আশঙ্কায় পড়িলাম। অবাক হইয়া শুধাইলাম, ‘ক্যাসিনো মানে?’

‘ক্যাসিনো মানে ক্যাসিনো, যা দেখবার জন্য তুই পাগল হইয়াছিস।’

‘টিভিতে, সিনেমায় ইংরেজি মুভিতে যেমন দেখায়, ঠিক তেমনি ওইখানে কি সত্যি সত্যিই চমকদার খেলাগুলান খেলা যায়? তাস পিটানো যায়?’

‘অবশ্যই যায়।’

‘খেলায় জিতলে রাশি রাশি টাকা পাওয়া যায়?’

‘আলবত যায়।’

‘সব ধরনের পানি পানের ব্যবস্থা আছে? চরকির মতো ঘোরে, ওমন বোর্ড আছে?’

‘আছে, আছে সব আছে।’

‘থাকলেই কী? আমার কাছে তো আমেরিকা, ইউরোপ কিংবা সিঙ্গাপুর যাইবার টাকা নাই। বড়োজোর মিরপুর যাইবার বাস ভাড়াটা আছে।’

‘ওরে গাধা তাতেই চলিবে।’

‘তাতেই চলিবে মানে? মশকরা করিতেছিস?’

‘ক্যাসিনোতে যাইতে হইলে এখন আর বিদেশ যাইতে হয় না। দেশেই এখন সব ব্যবস্থা আছে।’

‘কী বলিস, সত্যি?’

‘তুই আমার কলেজজীবনের বন্ধু। তোর সহিত মিথ্যা বলিব?’

‘সে তো অহরহই বলতি। সত্য বলতি কোন কালে? কলেজজীবনে তোর মতো, বানিয়ে মিথ্যা বলার জুড়ি মেলা ছিল ভার।’

‘সে তো কলেজজীবনের কথা রে। এখন বয়স হইয়াছে না? এখন কী আর তেমনটি আছি?’

‘না হইলেই ভালো। তাহলে বল, কবে লইয়া যাইবি?’

‘তোর বিশ্বাস হইতেছে না তো? চল তবে, আজই যাই।’

‘ইস, আগে যদি জানিতাম। মানিব্যাগের চিপায় তো একশত টাকার একখানা কসটেপ মারা নোট ছাড়া আর কিছুই নাই। আগামীকল্য যাই?’

‘ঠিক আছে। তবে কথা দে, ওইখানে যে লইয়া যাইব, সেই কথা যেন ঘুণাক্ষরেও কেউ জানিতে না পারে।’

সমানে মাথা ঝাঁকাইয়া প্রতিজ্ঞা করিলাম, এই জীবন থাকিতে কেউ জানিবে না। 

 

রাতটা যে কেমন করিয়া কাটিল, সে শুধু বিধাতাই জানে। স্বপনে কতবার যে রঙিন আলোর ঝলকানিতে ক্যাসিনোতে ঘোরাফেরা করিলাম।  

সকালে উঠিয়া মুন্না মামার টং দোকানে বসিলাম নাস্তা করিতে। বনরুটি চায়ে চুবাইয়া খাওয়া আমার অনেক শখের ক্ষুদ্র একখানা শাখা। বনরুটি চায়ে চুবাইয়া মুখে দিতেই মুন্না মামা বয়ান শুরু করিল, ‘আপনাকেই তো খুঁজিতেছি সকাল হইতে। গতকল্য যে ক্যাসিনো, ক্যাসিনো করিয়া আফসোস করিতেছিলেন, সেই ক্যাসিনো ধরা খাইয়াছে। যেই সেই ধরা না, রাম ধরা। দেশে যে এত্তগুলা ক্যাসিনো রহিয়াছে, তাহাই তো জানিতাম না। আজকের পেপারে কী ছবিই না আসিয়াছে, আহা।’

পেপারে ক্যাসিনোর ছবি দেখিতে গিয়া হাতের বনরুটির টুকরা চায়ের কাপে পড়িয়া কই গেল, আর খুঁজিয়া পাইলাম না। বিদ্যুেবগে একটা প্রশ্ন মাথায় আঘাত হানিল, ‘আচ্ছা, কাল যদি  সুমনের সহিত যাইতাম, তবে আজ আমাকেও কি কেউ খুঁজিয়া পাইত?’