ব্যাকরণ এবং আমি

  আফরীন সুমু

 

ডানহাত বুকের বামপাশে রেখে খুব কম লোকেই বলতে পারবে ব্যাকরণ নিয়ে তারা নাকানি-চোবানি খায়নি। যারা এ কথা বলতে পারে, তাদের আমি মানবের পর্যায়ে ফেলি না। তারা মহামানব জাতীয় কিছু। স্কুলজীবনে প্রতিটি ক্লাসেই এরকম গুটি কয়েক মহামানব থাকে। তারা কোনো এক দৈব উপায়ে ব্যাকরণটাকে গলাধঃকরণ করে ক্লাসে আসত। স্যার কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই টপাটপ সব উগরে দিত। তাদের কারণে আমরা আমছাত্রগণ স্যারদের রোষানলে পড়ে যেতাম। কী জ্বালা বাপু! কেন অমন বাহাদুরি দেখাতে হবে? যা লেখার পরীক্ষার খাতায় লেখ। স্কুলের পুরোটা সময়ে কেবল ভাবতাম, কবে এই ব্যাকরণের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাব। কোন কারকে কোন সমাস না কোন সমাসে কোন কারক—কিছুই মাথায় ঢুকত না। সমস্ত ও সম্বন্ধ পদ নামক এক কুটিল বিষয় নিয়ে স্যার যেদিন আলোচনা করছিলেন, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমার নাকডাকার ঘড়াত্ ঘড়াত্ শব্দ শুনে স্যার এগিয়ে এসে বোম্বাই জালি বেত দিয়ে চটাস চটাস করে পিঠের ওপর দু-চার ঘা কষালেন। ঘুমের ঘোরে মনে হচ্ছিল পিঠে আগুন ধরে গেছে। আমি চোখ মেলে আগুন আগুন বলে চেঁচিয়ে উঠতেই দেখি সামনে স্যার দাঁড়িয়ে। ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধানের ‘চাণক্য মানিক্যগণ, বাণিজ্য লবণ মণ, বেণু বীণা কঙ্কণ কণিকা’ পর্যন্ত বলে অ্যাঁ অ্যাঁ ছাড়া আর কিছু মুখ দিয়ে বেরোত না। রচনা, ভাব সম্প্রসারণ, চিঠি-ফিঠিগুলো ছিল বলে কোনো রকমে বেঁচে গেছি। নইলে এ জন্মে আর পাস করা হতো না। রচনা, ভাব সম্প্রসারণে আমার প্রতিভা দেখে কে! রচনাকে বানিয়ে ফেলতাম উপন্যাস, আর ভাবসম্প্রসারণকে রচনা। মহামানবেরা বাইরে এসে হিসাব করত, সব হয়েছে কি না, কে কত পাবে। আমি হিসাব করতাম, রচনা কয় পৃষ্ঠা লিখেছি, টেনেটুনে পাস হবে কি না। ভেবেছিলাম স্কুল-কলেজজীবন শেষ হলেই বুঝি ব্যাকরণ থেকে বেঁচে গেলাম। কিন্তু ব্যাকরণ এই অধমের পিছু ছাড়ল না। একটা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হলো বাংলায়, আর বেনামি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হলো সমাজকর্মে। সমাজের জন্য কিছু করার সুযোগ হলো না। নামকরা বলে ঐ বাংলাতে গিয়েই ঢুকতে হলো। উচ্চতর বাংলার সেইসব ব্যাকরণ দেখে আমার ভিমরি খাবার দশা। আমি দিনরাত কেবল পড়ি। কেবল পড়ি না, যেখানেই যাই চোখে মুখে কেবল ব্যাকরণ দেখি। খাওয়ার প্লেটে ব্যাকরণ, দেয়ালে পোস্টারে ব্যাকরণ, আড্ডায় ব্যাকরণ, এমনকি স্বপ্নেও ব্যাকরণ দেখে আমি ধরফড় করে জেগে উঠি। ভার্সিটির চার বছর এমন করে কাটিয়ে দিলাম। জীবন-যৌবন সমস্ত ঐ ব্যাকরণেই আটকে রইল। ব্যাকরণের কারণে সাধের প্রেমটাও টিকল না। আমি নাকি কথায় কথায় কেবল ব্যাকরণ কপচাই। ব্যাকরণের কাউকে ধরব, সে সাহসও হলো না। নিজের ব্যাকরণ নিয়েই বাঁচি না, তার ওপর আবার আরেক ব্যাকরণ। ভার্সিটি শেষ করে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। আর নয় ব্যাকরণ, এবার খুঁজব কেবল সুখের উপকরণ। আর কিছুদিন পড়াশোনা করে অবশেষে ব্যাকরণবিহীন একটা চাকরি জুটিয়ে ফেললাম। সরকারি চাকরি। বিকেলের পরে ফ্রি। বারান্দায় বসে চা নাস্তা খাই। একটা বিয়ে করেছি। বউয়ের সঙ্গে বসে গল্প-গুজব করি আর ছুটিছাটা পেলে বেড়িয়ে আসি। আহ্্! একেই বোধহয় বলে সুখ। কিছুদিন পর আমার মেয়ে হলো। ফুটফুটে মেয়েটির সঙ্গে সময় কাটাই। ভারী দুষ্টু হয়েছে মেয়েটা। চোখের সামনে দেখতে দেখতে কেমন বড় হয়ে যাচ্ছে। স্বপ্ন দেখি, রাজপুত্র জামাই দেখে বিয়ে দেব। ছেলে অবশ্যই বাংলায় পড়ুয়া হবে না। পালি-উর্দু পড়লেও সই। এসব ভাবতে ভাবতে দিন কেটে যায়। একদিন বিকেলে বউয়ের সঙ্গে বসে চা খাচ্ছি। চায়ে চুমুক দিতে দিতে বউ বলল, ‘হ্যাঁ গো, তুমি তো বাংলায় পড়েছ। ব্যাকরণটা ভালো বোঝ। মেয়েটাকে একটু দেখিয়ে দাও না। ও ব্যাকরণে বড্ড কাঁচা।’

আমার চা ছলকে পড়ল। হায়রে টুটাফাটা কপাল! মরার আগ পর্যন্ত ব্যাকরণ বুঝি আর পিছু ছাড়ল না। অতঃপর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললাম, ‘আচ্ছা।’