কাছের ছোটভাই

সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর

(গতসংখ্যার পর থেকে)

 

হিরুর চোখের সামনে সেদিনের পুরো ঘটনাটা ভেসে উঠল। এই ছেলেটা সেদিন হঠাত্ ওর পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল।

‘কে তুমি?’

‘আজ্ঞে, আমি আপনার একজন ভক্ত।’

‘কী চাই?’

‘আ-আপনার সাথে একটা ছবি তুলতে চাই।’ ছেলেটা কম্পিত গলায় বলেছিল।

হিরু আশপাশে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে বলল, ‘তুলে দেওয়ার মতো কাউকেই তো দেখছি না!’

‘কিছু মনে না করলে একটা সেলফি তুলি?’

‘আচ্ছা, তোলো।’

‘ইয়ে মানে... আপনার হাতটা যদি আমার কাঁধের ওপরে রাখতেন। আপনার আশীর্বাদ বলে ধরে নিতাম...।’

‘বেশ, রাখলাম। তোলো এবার।’

ছেলেটা মোবাইলের সেলফি মোড বের করে ফোনটাকে কতক্ষণ নাড়াচাড়া করল। একটা ছবিও তুলল না। হিরুর বিরক্তি যখন চরমে, ঠিক তখন ছেলেটা ওকে বলল, ‘ভাই, এপাশ থেকে লাইট পাচ্ছে না। একটু কষ্ট করে আপনিই যদি তুলতেন।’

হিরুর তাড়া ছিল। সে তাড়াতাড়ি ছবিটা তুলে এখান থেকে মানে মানে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ফোনটা হাতে নিল।

যখন ক্লিক করতে যাবে, তখন ছেলেটা বলল, ‘ভাইয়া, হাসিতে আপনাকে যা সুন্দর লাগে না!’

তোষামোদে হিরুর মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। বিস্তৃত সেই হাসির মধ্যদিয়েই অচেনা সেই ছেলেটির সাথে ওর ছবি তোলার পর্ব শেষ হয়েছিল তখন।

তারপরে এতকিছু ঘটে গেছে!

একটা সেলফি তুলেই ছেলেটা ওর কাছের ছোটভাই বনে গেছে! ওর কাছের লোকজনের থেকে টাকাপয়সা হাতিয়ে নিয়েছে। পরিচিত লোকজনকে ক্ষেপিয়ে তুলেছে। ওর প্রেস্টিজ পাংচার করে দিয়েছে!

বিরক্তি সত্ত্বেও হিরু না হেসে পারল না। এমন বুদ্ধিমান তথা চিকনাবুদ্ধির কাছের ছোটভাই কে না চায়!

 

দুই.

কাছের ছোটভাইকে নিয়ে বিবিধ বিড়ম্বনার পর হঠাত্ করেই হিরু নাই হয়ে গেল। নাই মানে, নাই। কোনো খোঁজই নেই তার। কোথায় গেল হিরু?

হিরুর এই ‘নাই’ হওয়ার আগে এলাকার প্রতিটি কোণ হিরু আর তার কাছের ছোটভাইটির সেই অন্তরঙ্গ সেলফিসম্মৃদ্ধ পোস্টারে ছেয়ে গেল। পাবলিকের বুঝতে আর অসুবিধেই হলো না—এই ছেলে হিরুর কাছের ছোটভাই না হয়ে যায়ই না। ছোটভাই তো অনেক থাকে, কিন্তু কাছের ছোটভাই একশতে একজন জোটে। তাও কপাল জোরে। হিরুর রাজকপাল। তাই সে এমন পয়সাওয়ালা কাছের ছোটভাইয়ের দেখা পেয়েছে। কিন্তু, কে এই চিকনা, পাটকাঠি শরীরধারী?

সবাই যখন হিরুর কাছের ছোটভাইকে নিয়ে বেশ মশগুল, হিরু তখন প্রত্যেকের থেকে টাকা ধার নিল।

হিরুকে যারা চিনে, তারা নির্ভাবনায় টাকা দিয়ে দিল। কিন্তু যারা একটু কম চিনে, তাদের দু-একজন জানতে চাইল, ‘কেন হিরু ভাই, তোমার ওই পয়সাওয়ালা ছোটভাইটি কোথায়?’

হিরু লাজুক হেসে বলল, ‘আমার একটু টাকার দরকার পড়েছে—একথা ও জানলে কি আর টাকা ধার দিত না ভাবছেন? কিন্তু আপনারাই বলেন, অমন কাছের ছোটভাইটির থেকে কি টাকা ধার নেওয়া যায়? যখন ফেরত দিতে যাব, তখন তো নিতেই চাইবে না। ছোটভাইয়ের কাছে কি ঋণী থাকা যায়?’

না, যায় না—এই ভেবে সকলেই হিরুকে টাকা ধার দিল। তারপর থেকেই হিরু হাওয়া।

তাহলে কি হিরু সবার থেকেই টাকা নিয়ে ভেগে গেল? দেশের এমএলএম কোম্পানিগুলোর কথা সকলেরই চোখের সামনে ভেসে উঠল তখন। হিরুটাও কি অমন কাজ করল শেষমেশ?

যার টাকা যায়, তার বিশ্বাসও নড়বড়ে হয়ে যায়। হারানো টাকা উদ্ধারে সকলে তত্পর হলো। হিরুকে তো আর পাওয়া যাবে না। তাহলে কাকে ধরতে হবে?

হিরুর বাপকে?

না, তাকে ধরে লাভ নেই। লোকটার পকেট থেকে টাকা বের করা পিঁপড়ের পেট থেকে চিনি বের করার থেকেও বেশ কঠিন হবে। আর দেবে কেন? হিরু তার কে হয়!

তাহলে টাকাটা দেবে কে? কোনো চাঁদাবাজ? ক্যাসিনো ব্যবসায়ী? জুয়াড়ি? ব্যাংক? নাকি গৌড়ি সেন?

কিন্তু এখন তো সেই গৌড়ি সেনদের আমলও নেই আর। অবৈধ উপায়ে টাকা কামাইকারীদের টাকা সরকার সিজ করে নিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকের বাতিল নোট কুচিকুচি করে জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। তাহলে?

হঠাত্ ইউরেকা ইউরেকা বলে চিল্লিয়ে উঠল সবাই। এত চিন্তা কিসের? এলাকার অলিগলি হিরুর সঙ্গে যার ছবিতে বোঝাই, হিরুর সেই কছের ছোটভাইটি আছে না!

কিন্তু, কী নাম ওর? থাকে কোথায়? করে কী?

অবশেষে পাওয়া গেল হিরুর কাছের ছোটভাইটিকে। বেচারা শহরে গিয়েছিল। এলাকার হালহকিকত সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না তার। জানতে পারেনি, এলাকায় সে এতটা ফেমাস হয়ে গেছে। সর্বত্র তার ছবি সম্বলিত পোস্টার শোভা পাচ্ছে, এমনকি তার ক্রাশদের বাড়ির সামনেও! অবশ্য খ্যাতির সুখ নেওয়ার আগেই বিড়ম্বনা শুরু হয়ে গেল তার।

হিরু সকলের থেকে টাকা নিয়ে ভেগেছে। এখন তার কাছের ছোটভাই হিসেবে সবার টাকা পরিশোধ করাটা তার একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। বেচারা হতোদ্যম। সময়ক্ষেপণ রামপ্যাঁদানির উপলক্ষ হতে পারে। অনন্যোপায় হয়ে সকলের পাওনা পরিশোধ করে দিল সে।

মনে মনে বেশ ক্ষিপ্ত হলো অবশ্য। ‘হিরু ভাই আমার সাথে এমনটা করতে পারলেন! আমি না তার কাছের...!’ ‘ছোটভাই’ কথাটি আর বলতে পারেনি, তার আগেই থেমে গেল সে। সত্যিই কি সে হিরুর কাছের ছোটভাই হতে পেরেছে? হিরুর কাছের ছোটভাই হওয়ার যোগ্যতা আছে তার? নিজের অপরাধ কর্মের জন্য লজ্জিত হলো সে।

 

তিন.

অবশেষে হিরুর খোঁজ পাওয়া গেছে। হিরু নিজেই পাতায়া সমুদ্রসৈকতে বসে তার কোল্ডড্রিঙ্কস পানরত ছবি ফেসবুকে আপলোড করেছে। সকলে টাস্কিত। টাকা ধার নিয়ে এভাবে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াচ্ছে হিরু!

একটু একটু ক্ষেপতে চাইলেও খুব বেশি ক্ষেপতে পারল না কেউ। হিরু তাদের থেকে টাকা ধার নিয়েছে সত্য, কিন্তু হিরুর কাছের ছোটভাইটি তো সবার টাকাই মিটিয়ে দিয়েছে।

হিরুর কাছের ছোটভাইটিও অবশ্য মনের মধ্যে বিন্দুমাত্র রাগ পুষে রাখতে পারল না। হিরুর সাথে দু-নম্বরি করার অনুশোচনাবোধ তো ছিলই, কিছুক্ষণ আগে একজন এসে হিরুর পক্ষ থেকে তাকে সমস্ত টাকা দিয়ে গেছে।

 

চার.

এয়ারপোর্টে থেকে বেরিয়ে হিরু ভীষণ চমকে গেল। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে বিশাল এক বহর হাজির।

‘আমাদের সাথে কি কোনো মন্ত্রী এসেছেন? কই দেখলাম না যে...’ একজন প্যাসেঞ্জারকে দ্বিধাভরা কণ্ঠে কথাটা বলতে শুনল হিরু। হিরু নিজেও কম অবাক হয়নি।

এত লোকের ভিড়েও অবশ্য হিরুর চোখ একজনের খোঁজ করতে লাগল। ওর সেই কাছের ছোটভাইটিকে। সবার পেছনে লাজুক বদনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল তাকে।

 

হিরুর ফেসবুকের একটা কন্টেস্টে উইনার হয়েছিল। পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিল—থাইল্যান্ডে আসা-যাওয়ার এয়ার টিকেট। সঙ্গে ওখানকার স্পা ফ্রি! টিকিট হাতে পেয়েও হিরুর কনফিউশন দূর হয়নি। ওখানে যাওয়ার পরে হয়তো হাতে বদনা ধরিয়ে দেবে! স্পা তো দূরের কথা। তাই জরুরি সবার থেকে টাকা ধার নিয়েছিল। কিন্তু ওখানে গিয়ে ভুল ভাঙে ওর। ভিনদেশে যথেষ্ট খাতির-যত্নই পেয়েছে ও।

হিরু আর তার কাছের ছোটভাইটির সেলফি সম্বলিত যেই পোস্টার পুরো এলাকায় সয়লাব হয়ে গেছে—সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না ওর। প্রথমে সন্দেহ করেছিল, এটাও বুঝি ওর সেই কাছের ছোটভাইটিরই কাজ! কিন্তু সকলে যখন টাকা উদ্ধারে বেচারাকে ধরল, এবং বেচারা কোনো উচ্চৈঃবাচ্য না করে সকলের টাকা শোধ দিল—ওর বুঝতে বাকি রইল না, এখানে তৃতীয় কোনো পক্ষ আছে। কারা তারা? যারা চায় না—হিরুর সাথে ওর এই কাছের ছোটভাইটির সুসম্পর্ক বজায় থাকুক। তারাই নিজ দায়িত্বে পোস্টার-ব্যানার টাঙিয়ে ওদের প্রচারণার কাজ চালিয়েছে। ব্যাপারটা খারাপ হয়নি অবশ্য। তাদের কারণেই তো হিরু ওর কাছের ছোটভাইটিকে ভালো করে চিনতে পারল।

হিরু প্রথমে চেয়েছিল, থাইল্যান্ড যাওয়ার কথাটা কাউকে না বলে পরে সবাইকে চমকে দেবে। কিন্তু এলাকায় দু-দুটো ঘটনা উলটো ওকেই চমকে দেয়, ভীষণ। তার পরপরই ফেসবুকে নিজের অবস্থান জানান দিয়ে হিরু সট্যাটাস দেয়।

শুধু ওখানেই থেমে থাকেনি। পুরো দেশই যখন ‘ক্যাসিনো’ ঘটনায় উত্তপ্ত, অনেক ক্যাসিনো ব্যবসায়ী পালিয়ে থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশে চলে গেছে, তখন হিরু ফেসবুকে আরেকটা পোস্ট দিয়েছে—থাইল্যান্ডে ক্যাসিনোতে খেলছি!

হিরুর চিত্রনাট্য মতো তোতা চাকলাদার ছড়িয়েছে, ‘হিরুও কি তবে ক্যাসিনো ব্যবসায়ী? নাকি স্রেফ জুয়াড়ি!’

সমাজে ‘ব’ শোনামাত্রই ‘বদনা’ ভেবে নেওয়ার মতো পাবলিকের অভাব নেই। তারা মুহূর্তেই খবরটাকে লুফে নিল। হিরুর নামে কুত্সা গাইতে লেট করল না আর।

এই অবস্থার মধ্যেই হিরু দেশে ফিরে এলো। বিমানবন্দর থেকে বেরোনোর পরে এত লোকজন দেখে চমকে যায় ও। মানুষ যখন বিপদে পড়ে, তখন তাদের পাশে কোনো লোকজন থাকে না। সুসময়ের সাথিরা সব পালানোর পথ খোঁজে। অবশ্য এটাও ঠিক, পাবলিক যখন বুঝতে পারে যে, খাদে পড়া হাতিটি ঠিকই উঠে আসতে পারবে, তখন তারাই আশপাশে ঘুরঘুর করতে থাকে! বরং তেলবাজির পরিমাণটা আগের থেকেও বাড়িয়ে দেয় তখন।

অবশেষে হিরু একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হলো—হয় এই বিশাল উপস্থিতি তার সত্যিকারের কাছের ছোটভাই, নতুবা তেলবাজ ছোটভাই। দুটোর একটা হবেই, মাস্ট।