মাছ ধরার জন্য নানা উপকরণ ও পদ্ধতি ব্যবহূত হয়ে আসছে আদিকাল থেকে। মাছ ধরার জন্য জাল, পোলো, চাঁই, টানা জাল, সুতি জাল, ডারকি, খলসি ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। স্থানের ভিন্নতায় নামেরও ভিন্নতাও আছে মাছ ধরার উপকরণের। উত্তর জনপদে বন্যার পানি ও পানি শুকানোর পর মাছ ধরার যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় তা হচ্ছে ‘ন্যাটা ও ভুরকা’। এ নিয়ে এবারের প্রতিবেদন—
মো. আমিরুজ্জামান
মাছ ধরার ফাঁদ ‘ন্যাটা ও ভুরকা’। নদী বা জলাশয়ে আইল বা বানা দিয়ে বিশেষ ফাঁদ তৈরি করা হয় বলে এই জনপদের লোকজন সবাই ‘ন্যাটা’ বলে। এই পদ্ধতিতে মাছ টপকে কাঁদামাটির বেডে ও জালে পড়ে। তারপর সঙ্গে সঙ্গে অথবা পরদিন সকালে কুড়িয়ে নেন মাছ শিকারিরা।
এই সময় নদী ও জলাশয়ে থাকা মাছ অভয়াশ্রম খোঁজে। একবার উজানে আরেকবার ভাটিতে চলাফেরা করতে থাকে। কারণ পানি কমে আসছে, তাই তার নিরাপদ জায়গা প্রয়োজন। এ অবস্থায় মাছ শিকারিরা মাছ চলাচলের রাস্তায় আইল তৈরি করে দেয়। ফলে মাছের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আইল বা বানা টপকে যেতে চায়। তখন এই ন্যাটার ফাঁদে পড়তে হয়।
কাঁদামাটি দিয়ে আইল তৈরি করে ‘ন্যাটা’ বানানো হয়। এলাকার বয়োবৃদ্ধরা জানান, ন্যাটা অর্থাত্ ঝামেলা বা বিপজ্জনক শব্দটি থেকে স্থানীয় শব্দে পরিণত হয়েছে ‘ন্যাটা’। কারণ মাছ এই পথ মাড়াতে গেলেই ওই মাছ ন্যাটায় পড়ে যাবে। ন্যাটায় পড়া মাছ যাতে টপকে পালাতে না পারে সেজন্য নেট বা কাপড় উঁচু করে দেওয়া হয়। আর একটি পদ্ধতি হচ্ছে ভুরকা। এই পদ্ধতিতে সরু করে নালা তৈরি করে ৮/১০ ফুট দূরে গর্ত করা হয়। সেখানে মগ বা কৌটার সাহায্যে পানি সেচে নেট জালে ফেলা হয়। ভুরকা শুধুমাত্র ডাইরকা ও পুটি মাছ পাওয়া যায় বলে তারা জানান। মাঝে মধ্যে বড় মাছও পড়ে।
উত্তর জনপদে এর নামের ভিন্নত থাকলেও গোটা নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে মাছ ধরার এই ফাঁদকে সবাই ‘ন্যাটা’ বলে জানে ও চেনে। এই ন্যাটা তৈরি করে এমনভাবে কচুরিপানা ছড়িয়ে দেওয়া হয় যাতে চালাক মাছের বোঝার উপায় থাকে না। এই ন্যাটায় মূলত শোল, টাকি, মাগুর, শিং, কৈ মাছ লাফিয়ে আটকে থাকে। অন্যান্য মাছও পড়লেও তার সংখ্যা নিতান্তই কম।
গ্রামের হাটবাজারে ন্যাটার জ্যান্ত মাছের চাহিদা থাকে বেশি। ফলে ২/৪ টাকা বেশি হলেও এসব মাছ কেনেন ক্রেতারা। প্রচলিত প্রবাদ আছে ‘পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে।’ মাছ নিরাপদ আশ্রয় খোঁজার চেষ্টাকালে এভাবে শিকারির ফাঁদে পড়ছে। ন্যাটা দেওয়ার এই চিত্র খাল-বিল, নদী-নালায় প্রায়ই দেখা যাচ্ছে।
কথা হয় নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের নিয়ামতপুর গ্রামের শমসের আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, দিনে কৃষি কাজ করি। আর রাতে ন্যাটা দিয়ে মাছ ধরি। এতে করে আমার পাঁচ পরিবারের সংসার ভালোভাবে চলে যাচ্ছে। যেহেতু উন্মুক্ত জলাশয় তাই কাউকে ভাগও দিতে হয় না।
নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয় শুকানোর সঙ্গে ডাইরকি, খলসি, হাত জাল, পলোসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে মাছ ধরা হলেও নীলফামারী জেলায় মাছ শিকারিদের কাছে এখনো জনপ্রিয় ‘ন্যাটা ও ভুরকা’।