বিশাল জলরাশি পাড়ি দিয়ে মহেশখালী

সৈয়দ আসাদুজজামান সুহান

 

‘যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম

যদি নতুন একখান মুখ পাইতাম

মহেশখালীর পান খিলি তারে বানাই খাবাইতাম।’

কেউ মহেশখালী যাক আর না যাক, মহেশখালীর পানের খিলি খাক আর না খাক, কিন্তু শেফালী ঘোষের গাওয়া এই বিখ্যাত গানটি সবারই শোনা আছে। শেফালী ঘোষের এই গানের মাধ্যমেই নাকি মহেশখালীর নাম সারাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তখনো নাকি কক্সবাজারের মতো মহেশখালী তেমন পরিচিত ছিল না। মহেশখালীর প্রাকৃতিক রূপ-সৌন্দর্যের কথা দেশের অধিকাংশ মানুষ জানতো না। আর বর্তমানের দৃশ্যপট পাল্টে গেছে, এখন মহেশখালী একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পট। যে কেউ কক্সবাজারে ঘুরতে গেলে, মহেশখালী ঘুরে দেখার জন্য একদিন হাতে রাখেই যাওয়ার চেষ্টা করে। আমি তো দুই এক বছরের মধ্যে অন্তত একবার হলেও কক্সবাজারে যাই, কিন্তু বিগত ৭ বছর যাবত্ মহেশখালী যাওয়া হয়নি। এবার কক্সবাজার গিয়ে সমুদ্র সৈকতে এক ছোট্ট মেয়ের কণ্ঠে শেফালী ঘোষের এই বিখ্যাত গানটি শুনতেই সিদ্ধান্ত নিলাম মহেশখালী ঘুরতে যাবো। যে ভাবনা, সেই কাজ। পরের দিন সকালে আমরা বন্ধুরা মিলে কক্সবাজার থেকে মহেশখালীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

কক্সবাজারের বিআইডব্লিউটিএ-এর ৬ নম্বর ঘাটে গিয়ে দেখি বঙ্গোপসাগর চ্যানেলটি বেশ উত্তাল হয়ে আছে। এই অবস্থা দেখে আমাদের গলা শুকিয়ে কাঠ। দু’জন বললো, যেতে হবে না, কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। একজন প্রস্তাব রাখে সড়কপথে চকরিয়া থেকে বদরখালী হয়ে মহেশখালী যেতে, কিন্তু এতে অনেক সময় লাগবে। তাই বুকে অনেক সাহস সঞ্চয় করে স্পিডবোটে করেই রওনা দিলাম। স্পিডবোটে মাত্র ১৫/২০ মিনিটের পথ, কিন্তু এই সময়র মধ্যেই আমাদের সবার চোখে পানি এসে গেল। অবস্থা ছিল এমন, ঢেউয়ের বাড়িতে স্পিডবোট যেন ভেঙে চৌচির হয়ে যাবে। প্রাণভয়ে আমাদের একজন হাঊমাঊ করে কান্না জুড়ে দিয়েছিল। যাই হোক, বিশাল এক দুঃসাহসিক অভিযান সেরে আমরা পৌঁছে গেলাম মহেশখালীর জেটি ঘাটে। এই জেটি ঘাটটি ১৯৮৯ সালে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড স্থাপন করে। ঝাউবনের মধ্যে দিয়ে ১৮২টি পিলারের ওপর জেটি দণ্ডায়মান। জেটি স্থাপন হওয়ার আগে মহেশখালীর যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল নাজুক। স্পিডবোট থেকে নেমে ঝাউবনের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া সরু জেটি ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। দু-পাশে ঝাউবন, সুনসান নীরবতা, সাঁইসাঁই বাতাস সময়টাকে আরো রোমাঞ্চকর করে তুলেছে। এরইমধ্যে আমাদের সব ভয় কেটে যেন একটা আলাদা প্রশান্তি অনুভব করছি। জেটির শেষপ্রান্তে এসে মিললো রিকশা এবং টমটম। সারাদিনের জন্য আমরা একটা টমটম ভাড়া করে নিলাম।

টমটমযোগে প্রথমে গেলাম রাখাইন পাড়ায়। সেখানে বেশকিছু সময় ঘুরে দেখলাম তাদের জনজীবন, হস্ত ও বস্ত্র শিল্পের কারুকাজ। কারো কারো সঙ্গে গল্প করেছি এবং তাদের ব্যবহারে বেশ মুগ্ধ হয়েছি। এদের বাংলায় কথা বলার ধরনটা আমার শুনতে বেশ মজা লাগে। তবে শুধু গল্পই করিনি, পছন্দমতো আমরা কিছু হস্ত ও বস্ত্রশিল্প কিনে নিলাম। তারপর এদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলাম স্বর্ণমন্দিরে। মুগ্ধ হয়ে অসাধারণ স্থাপত্য নিদর্শন, দৃষ্টিনন্দন, কারুকার্য খচিত স্বর্ণমন্দির দেখতে দেখতে এক সময় পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা অনুভব করলাম। তখন কাছেই একটা খাবার হোটেলে ঢুকে সামুদ্রিক কোরাল মাছ ও বিভিন্ন ধরনের শুঁটকি ভর্তা দিয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। তারপর সোজা চলে গেলাম মৈনাক পাহাড়ে। সেখানেই অবস্থিত আছে প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো আদিনাথ মন্দির। পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলাম। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছেই চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। ঘুরে ঘুরে আদিনাথ মন্দিরের চারপাশ দেখলাম। প্রতিবছর মার্চের ৪ তারিখ চতুর্দশী মেলা বসে এখানে, লাখ লাখ মানুষের মিলনমেলা হয়। তখন এই স্থানটি হয়ে ওঠে বাঙালির ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। ইচ্ছে ছিল সোনাদিয়া দ্বীপ ঘুরে দেখার, কিন্তু সবারই ছিল ফিরে যাওয়ার তাগিদ। তাই পরবর্তীতে সোনাদিয়া দ্বীপ দেখার ইচ্ছে রেখে আবারো ফিরে গেলাম কক্সবাজার। আর হ্যাঁ, ফেরার পথে মহেশখালীর কিছু পানের খিলি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম।

 

 

যেভাবে যাবেন

 

ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে বা প্লেনে করে কক্সবাজার যাওয়া যায়। ট্রেনে করে যেতে হলে চট্টগ্রাম স্টেশনে নেমে কক্সবাজারের বাস ধরতে হবে। কক্সবাজারের কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী বিচ থেকে রিকশা বা টমটম করে বিআইডব্লিউটিএ-এর ৬ নম্বর ঘাটে যেতে হবে। সেখানে থেকে স্পিডবোট বা ট্রলারে করে মহেশখালী যেতে হবে। স্পিডবোটে মাথাপিছু ৭৫ টাকা ও ট্রলারে ৩০ টাকা খরচ পড়বে।