এক ফ্রেমে বায়ান্ন থেকে একাত্তর

মো. নিজাম উদ্দিন লাভলু

রামগড়

 

মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ১-এর সদর দপ্তর ছিল ভারত সীমান্তবর্তী তত্কালীন পার্বত্য মহকুমা শহর রামগড়ে। পাকবাহিনী প্রাচীন এ জনপদের দখল নেওয়ার পর সেক্টর সদর স্থানান্তরিত হয় সীমান্তের ওপারে ভারতের ত্রিপুরার সাব্রুমে। রামগড় পতনের পূর্বে এখানেই সেসময় মুক্তিফৌজের সর্বপ্রথম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করা হয়েছিল। গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও ফেনী, নোয়াখালি, কুমিল্লা অংশের যুদ্ধ এখান থেকে পরিচালিত হয়। রামগড় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থাপিত ট্রেনিং সেন্টার থেকে যুদ্ধ প্রশিক্ষণ নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুদের মোকাবেলা করতে ছুটে যান বিভিন্ন অঞ্চলে। দেশের বিভিন্ন এলাকার  লক্ষ লক্ষ বাস্তুহারা মানুষ রামগড়-সাব্রুম সীমান্ত হয়ে ভারতের ত্রিপুরায় আশ্রয় নেয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের সমর্থন, সহযোগিতার জন্য সেদেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ সমন্বয় সবকিছুই হয় রামগড় সীমান্ত হয়ে। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট রাজনৈতিক, সামাজিক ব্যক্তিত্ব, লেখক, সাংবাদিক, অভিনেতা, সামরিক, বেসামরিক পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ভারতে যান এ পথ দিয়েই। এ সীমান্ত পথেই মিত্রবাহিনীর গমনাগমন, অস্ত্র, গোলা-বারুদ ইত্যাদি যুদ্ধ সরঞ্জাম আনা-নেওয়া হয়। দেশ স্বাধীনের পর ভারতের ত্রিপুরা থেকে প্রায় ১০ লক্ষ বাংলাদেশি উদ্বাস্তু রামগড় হয়েই স্বদেশে ফেরেন। ১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল মহালছড়ির পাহাড়ি এলাকায় পাকহানাদার ও তাদের সহযোগী মিজো ও চাকমা মুজাহিদ বাহিনীর সঙ্গে ভয়াবহ সম্মুখযুদ্ধে প্রাণোত্সর্গকারী বীর সেনা শহীদ ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের বীর উত্তমের সমাধিস্থলও রামগড়ের মাটিতে। সব মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধে রামগড়ের অবদান চির অমর, অক্ষয় ও অবিস্মরণীয়।

স্বাধীনতা সংগ্রামে রামগড়ের এ গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম অক্ষুণ্ন রাখতে পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্র রামগড় লেকপার্কে স্থাপন করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘বিজয়’, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আর ইতিহাস গাঁথা দীর্ঘ প্রাচীর বা দেয়াল। বিশাল লেক, দৃষ্টিনন্দন ঝুলন্ত ব্রিজ আর কাঠ বাদাম, পাম ট্রি, বকুল, খেজুর, দেবদারু ঘেরা মনোরম প্রকৃতির মাঝে যেন একখণ্ড ইতিহাস চত্ত্বর। বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। ৮৬ ফুট দৈর্ঘ্য আর ১০ ফুট প্রস্থের বিশাল দেয়ালের গায়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের ধারাবাহিক খণ্ডচিত্রের ম্যুরাল। চমত্কার শৈল্পিক কারুকাজে সুনিপূণভাবে তৈরি করা হয়েছে ইতিহাসের প্রতিচ্ছবির ম্যুরালটি। ৯টি ফলক চিত্রে সাজানো হয়েছে ইতিহাস গাঁথা প্রাচীর বা দেয়ালটি। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকার রাজপথে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিক্ষোভ মিছিল, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলার বীর সন্তানদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ঢাকার রাজপথে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নিরীহ বাঙালির গণহত্যার নির্মম ছবি, পাকবাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যা, জ্বালাও-পোড়াও, অত্যাচারের মুখে ভারতে আশ্রয় নিতে পলায়নরত অসহায় বাঙালি শরণার্থী, শত্রুবাহিনীর ওপর অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা হামলা, মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে পর্যদুস্ত পাকসেনাদের আত্মসর্মপণ, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভারতীয় জেনারেল আরোরার উপস্থিতিতে পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজীর আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষরের ঐতিহাসিক চিত্র এবং বীর বাঙালির বিজয় মিছিলের ম্যুরাল তৈরি করা হয়েছে নান্দনিকভাবে। দেয়ালের একপ্রান্ত থেকে শেষপ্রান্ত পর্যন্ত সাদা টাইলসে তৈরি বেদিমূলের সিঁড়ি পুরো ম্যুরালের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে। পোড়ামাটির আদলে সিমেন্ট সুরকি দিয়ে চমত্কার শিল্পশৈলীতে তৈ িকরা হয়েছে এ ম্যুরাল। রঙের কারুকাজও অসাধারণ। ২০১৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে এটি নির্মাণ করা হয়।

ম্যুরালের একপ্রান্তের সম্মুখে বিশাল আম্র বৃক্ষের ছায়াতলে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘বিজয়’। এক নারী চিকিত্সক অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধাসহ ৪ জন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধার মূর্তি স্থাপন করে তৈরি করা হয়েছে ‘বিজয়’ ভাস্কর্যটি। সাদা মূর্তিগুলোর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ মশাল। প্রখ্যাত স্থাপত্য শিল্পী মৃণাল হক এটি নির্মাণ করেন। ভাস্কর্যের সম্মুখে রয়েছে সাদা টাইলসের বৃহদাকার বেদি। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নির্মিত ভাস্কর্যটি ২০১২ সালে ২০ মে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। রামগড়ের তত্কালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার গোপাল চন্দ্র দাস এ ভাস্কর্য নির্মাণে অনন্য ভূমিকা রাখেন। তার উদ্যোগেই ম্যুরালের দক্ষিণ প্রান্তে জাতীয় শহীদ মিনারের ডিজাইনে নির্মাণ করা হয় উপজেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।

রামগড়ের বাসিন্দা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকরা মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য বিজয়, দৃষ্টিনন্দন ম্যুরাল ও শহীদ মিনার ঘুরে দেখেন। ইতিহাসের প্রতিচ্ছবির সঙ্গে আপন স্মৃতি জড়িয়ে রাখতে এখানে ছবি তুলতে ভোলেন না কেউ। চত্ত্বরটি সকলের কাছেই এখন অত্যন্ত প্রিয় ও আকষর্ণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।