বাধা এড়িয়ে এগিয়ে যাবে কন্যাশিশু

রহিমা আক্তার মৌ

জাতীয় দিবস হিসেবে আজ ৩০ সেপ্টেম্বর মেয়েদের দিন, মানে কন্যাশিশুর দিন। মেয়েদের শিক্ষার অধিকার, পরিপুষ্টি, আইনি সহায়তা ও ন্যায় অধিকার, চিকিত্সাসুবিধা ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, নারীর বিরুদ্ধে হিংসা ও বলপূর্বক বাল্যবিবাহ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালনের উদ্দেশ্যে ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর তারিখে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এরই ফলে ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর প্রথম আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালন করা হয়। আর সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ২০১৩ সাল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালন করা হচ্ছে।

কন্যাশিশু দিবসের প্রথম প্রতিপাদ্য ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করা’। ২০১২ সালের স্লোগান ছিল, ‘লিঙ্গ বৈষম্য দূর করা’, ‘কন্যাশিশুর জাগরণ, আনবে দেশে উন্নয়ন’, ‘শিক্ষা-পুষ্টি নিশ্চিত করি, শিশু বিয়ে বন্ধ করি’, ‘কন্যা মানেই বোঝা নয়, করবে তারা বিশ্ব জয়’। প্রতি বছর এমন একটি স্লোগান সামনে নিয়ে পালিত হয় জাতীয় কন্যাশিশু দিবস।

কন্যাশিশুদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানসহ সংশ্লিষ্ট সব আইন, নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণসহ তাদের শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠী রূপে গড়ে তোলার জন্য বর্তমান সরকার নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। আমাদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, কন্যাশিশুরা যদি প্রয়োজনীয় পুষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা ও নিরাপত্তা পায়, তবে তারা উপার্জনক্ষম এবং স্বাবলম্বী নারী হিসেবে বেড়ে উঠতে পারবে।

কন্যাশিশু দিবসের সার্বিক সাফল্য কামনা করে কন্যাশিশুদের সার্বিক সুরক্ষা ও উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমসহ সমাজের সর্বস্তরের জনগণকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাণীতে বলেছেন, ‘শিশু অধিকার রক্ষায় প্রণয়ন করা হয়েছে জাতীয় শিশু নীতি। কিশোরীদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধিসহ তাদের সুরক্ষার জন্য দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে কিশোরী ক্লাব। শিশুবিবাহ একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই বিবাহ রেজিস্ট্রেশনের আগে জন্মনিবন্ধন সনদ কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বর্তমান সরকার নারীবান্ধব সরকার। পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকসহ সব ক্ষেত্রে কন্যাশিশুর সমান অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে বিগত দিনে আমরা ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছি। নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীর প্রতি সকল প্রকার সহিংসতা ও বৈষম্য দূর করতে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।’

এই বছর বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকেও নানান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। ৯ অক্টোবর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করবেন বিশ্ব শিশু দিবস। তারপর ধারাবাহিকভাবে সব কর্মসূচি পালিত হবে। জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংঘটন বিশেষ বিশেষ আয়োজন রাখবে। কন্যাশিশুদের প্রতি বৈষম্য তুলে ধরবে, তা বন্ধে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা হবে। তাদের নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে ইত্যাদি আহ্বান থাকবে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায়। মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, ‘দিবসটি পালনে কন্যাশিশুর বাল্যবিবাহের কুফল, কন্যাশিশুর সুরক্ষা, কন্যাশিশুর পুষ্টিসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পাবে।’

সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে অনেক কিছু, কন্যাশিশুর জীবনযাত্রায় এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। তবে তা খুব একটা সহজে আসেনি। প্রতিটা পদে পদে লড়াই করতে হচ্ছে কন্যাশিশুকে। কন্যার পর কন্যার আগমন যেমন কিছু পরিবার যেমন স্বাভাবিকভাবে নেয় না, তার বিপরীত খবরগুলো ও আমাদের আনন্দ দেয়। কিছু খবর সত্যিই আনন্দ দেয়। একটি কন্যাসন্তানের জন্য ব্রিটেনের স্কটিশ হাইল্যান্ডের বাসিন্দা অ্যালিক্সি ব্রেট এক এক করে ১০টি ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েও ক্ষান্ত হননি। একটি কন্যাশিশু জন্ম দিয়ে তার পরিবার এখন বলছে তাদের হাতে আকাশের চাঁদ নেমে এসেছে। তাদের পরিবার দাঁড়িয়েছে ১৩ সদস্যের। ব্রিটেনে ডেইলি মেইল ফলাও করে এ নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন করেছে। ৩৯ বছরের অ্যালিক্সি বলেন, ‘ভেবেই নিয়েছিলাম হয়তো আমি আরেকটি ছেলেসন্তান জন্ম দিতে যাচ্ছি। কিন্তু ও ভূমিষ্ঠ হবার পর যখন দেখলাম মেয়ে হয়েছে, তখন আমার খুশি আর ধরে না। এ এক অসাধারণ অনুভূতি। মেয়েটির নাম রাখা হয়েছে ক্যামেরন, যে কিনা তার সবচেয়ে বড়ো ভাইয়ের চেয়ে ১৭ এবং ছোটো ভাইয়ের চেয়ে দুই বছরের ছোটো। তার বাবা ৪৪ বছরের ডেভিড বলেন, ‘সবাই এখন ক্যামেরনকে নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। তার চারপাশ ঘিরে থাকে। তাকে ঘুম থেকে জাগাতে চেষ্টা করে। কোলে নিতে চায়। খাওয়াতে চায়।’ আমাদের অপেক্ষা প্রতিটি পরিবার কন্যাশিশুর জন্য সুন্দর আগামী উপহার দেবে, কন্যাশিশুর জীবনযাত্রা হবে নিরাপদ।

n লেখক :সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক