শিফারুল শেখ
‘গণতান্ত্রিক’ ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রীর উচিত জনগণের কথা বলা। নতুন চাকরিতে যোগদানের সময় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সেই কাজটিই করেছিলেন। কিন্তু দিন যতই গড়াচ্ছে ততই গণতন্ত্রের প্রতি তার শ্রদ্ধা হারাচ্ছে। তিনি পার্লামেন্টের মুখ বন্ধ রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। এখন সুপ্রিম কোর্টের রায়কেও ভুল বলে আখ্যায়িত করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি শীর্ষ আদালতকেও অবজ্ঞা করলেন। অথচ তার গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট তথা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। ব্রিটিশ গণতন্ত্রকে তিনি খাদের কিনারায় নিয়ে যাচ্ছেন। এসব মন্তব্য করা হয়েছে ব্রিটিশ প্রভাবশালী মিডিয়া দ্য গার্ডিয়ানের এক সম্পাদকীয়তে (অবজারভার এডিটোরিয়াল)। তাইতো শূন্যে সুতোয় ঝুলছে প্রধানমন্ত্রী বরিসের ভাগ্য। চলতি সপ্তাহেই তার পদ তাকে ছেড়ে চলে যেতে হতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও বরিস নিজেই অনাস্থা ভোটের আহ্বান জানিয়েছেন।
চলতি সপ্তাহেই অনাস্থা ভোট!
প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের বিরুদ্ধে চলতি সপ্তাহে অনাস্থা ভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি) সিনিয়র এমপি স্টুয়ার্ট হোইসি। তিনি বলেছেন, ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ব্রেক্সিট এড়াতে এটাই হতে পারে একমাত্র পন্থা। এসএনপি নেতা নিকোলা স্টারজিওন বলেন, তিনি লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন দিতে পারেন। তবে লেবার ডেমোক্র্যাটস বলছে, করবিন খুবই বিভক্তি সৃষ্টিকারী, ফলে তাকে নিয়ে বিভক্তি আছে। হোইসি বলছেন, লেবার ডেমোক্র্যাটদের রাজনীতি নিয়ে খেলা বন্ধ করা উচিত। দেশকে বাঁচাতে এটাই একমাত্র সমাধান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে আইন মেনে চলবেন সেই আস্থা এখন আর তার প্রতি নেই। তিনি ভোটে হারলে সাময়িক সময়ের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের প্রধান হবেন জেরেমি করবিন। কিন্তু জরিপে করবিনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে। তিনি এখন সবচেয়ে অপছন্দের বিরোধী নেতা। করবিন বলেছেন, সম্প্রতি বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। মনে হচ্ছে, প্রতিদিনই জরুরি সরকার আসছে।
অনাস্থা ভোট চান জনসন!
বরিসের আশঙ্কা, ব্রেক্সিট না হলে দেশে অরাজকতা তৈরি হতে পারে। এমনকি হত্যার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। বিশ্লেষকরা তার এই মন্তব্যকে ভয়ঙ্কর বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, তিনি গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার যে, অবৈধভাবে স্থগিতের দুই সপ্তাহ পর পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনে বরিস নিজেই অনাস্থা ভোটের আহ্বান জানিয়েছেন। ‘কাম অন চ্যালেঞ্জ’ জানিয়ে কনজারভেটিভ নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনসন বিরোধী দলগুলোকে অনাস্থা ভোটের কথা বলেন। তার এই পদক্ষেপ দেশটিকে একটি সাধারণ নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পার্লামেন্ট স্থগিতের সিদ্ধান্তকে সুপ্রিম কোর্ট বেআইনি ঘোষণার পর প্রথম অধিবেশনে সরকারি এবং বিরোধী দলের এমপিরে মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। আদালতের রায় তুলে ধরে জনসন বলেন, পার্লামেন্ট স্থগিত করা ছিল রাজনৈতিক বিষয়। এটা আদালতের বিষয় নয়। এখানে আদালতের ভুল ছিল। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার সময় বিরোধী দলের এমপিরা ‘তুমি মিথ্যাবাদী’ বলে চিত্কার করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। এরপরও জনসন বলেন, আগামী ৩১ অক্টোবর যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবে এবং প্রথম গণভোটের ফলাফল বহাল রাখতে বদ্ধপরিকর তিনি। পার্লামেন্টে নারী এমপিদের নিয়েও তিনি বিদ্রুপ মন্তব্য করেন। এমনকি হত্যার শিকার নারী এমপি জো কক্সকে নিয়ে বরিস রাজনীতি করতে চাইছেন বলেও বিরোধী এমপিরা জানিয়েছেন।
নির্বাচনে জিততে বরিসের অস্ত্র ব্রেক্সিট!
সিএনএনের এক বিশ্লেষণে লিউক ম্যাকগি লিখেছেন, বর্তমানে ব্রেক্সিট ব্রিটেনের সবচেয়ে আলোচ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বরিস ব্রেক্সিটকে তেমন একটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন না। বরিসকে নিয়ে এই ধরনের মনোভাবের মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সরকারের একটি সূত্রও জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বরিস ব্রেক্সিটকে দেখেন আগামী নির্বাচনী প্রচারণার একটি মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে। কিন্তু বরিসকে জেতাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কোনো চেষ্টা করবে না বলে জানা গেছে। বরং ইইউর একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বরিস যদি ব্রেক্সিট করতে চান তাহলে তাকে অবশ্যই পার্লামেন্ট এবং নারী এমপিদের শ্রদ্ধা করতে হবে। কিন্তু বরিস চাইছেন ব্রেক্সিট নিয়ে কিছুই না করে সাধারণ নির্বাচনের দিকে যাওয়া। তিনি ইতিমধ্যে প্রচারণাও শুরু করেছেন এবং ব্রেক্সিট নিয়ে ইইউর কাছে সময় বাড়ানোর আবেদনকে ‘সারেন্ডার অ্যাক্ট’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইইউর একটি কূটনৈতিক সূত্র বলছে, বরিস ব্রেক্সিট নিয়ে যা কিছু করছেন তা লোক দেখানো। ইইউর সঙ্গে সমঝোতার আলোচনা করলেও মূলত বাস্তবসম্মত কোনো প্রস্তাব এখনো তার সরকার দেয়নি। এদিকে প্রধানমন্ত্রী জনসনকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানিয়ে করবিন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী ব্রেক্সিট ছাড়ার তারিখের মেয়াদ বাড়িয়ে দিলেই তারা সাধারণ নির্বাচনে যাবেন।