আশুলিয়া ক্রাইম জোনে পরিণত

সাভার উপজেলার শিল্পাঞ্চল আশুলিয়া এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। প্রতিদিন বাড়ছে জনবসতি। আর জনবসতি বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। এলাকাবাসী প্রশ্ন তুলছে থানা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। সন্ত্রাস, মাদক, ভূমিসদস্যুতা, খুন, ছিনতাই, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার, ধর্ষণ, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের জনপদে পরিণত হয়েছে এ শিল্পাঞ্চলটি। ফলে আশুলিয়া এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে চাপা আতংক দেখা দিয়েছে।

এছাড়া জমি দখল, নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানি, পোশাক কারখানায় অসন্তোষ, মিথ্যা মামালা দায়ের এখন এ এলাকার নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা হয়ে দাড়িয়েছে। অভিজ্ঞ মহলের অভিমত পুলিশের নিস্ক্রিয়তা ও অপরাধ দমনের অনাগ্রহের কারণেই এখানে একের পর এক অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে।

সাভারের আশুলিয়া এলাকায় ডিইপিজেডে ৫ শতাধিক ছোট বড় মিল কারখানা, বিনোদন কেন্দ্রসহ সরকারি ও বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ফলে এ অঞ্চলে জনবসতি বেড়েছে  বহুগুণ। আশুলিয়া থানা এলাকাটি ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হলেও জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশী।

আশুলিয়া থানা এলাকায় ৩০ লাখের অধিক মানুষের বসবাস। প্রতিদিন এর সংখ্যা বাড়ছেই। ফলে এ অঞ্চলে ভাসমান ও বহিরাগত বেশি হওয়ায় এরা কোন অপরাধ করে সটকে পড়লে ধরা কিংবা শনাক্ত করা অনেক ক্ষেত্রে  প্রশাসনের পক্ষে সম্ভব হয় না।  

এখানে জমি দখল বেদখল, ঝুট ব্যবসা নিয়ে রয়েছে একাধিক সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেট অর্থের বিনিময়ে মানুষের জমি দখল ও বেদখল করে থাকে। এই অঞ্চলের সরকারি সম্পত্তি বিশেষ করে বনবিভাগের জায়গা একটি শক্তিশালী ভূমিদস্যু চক্র জাল কাগজপত্র তৈরি করে গ্রাস করে ফেলেছে। 

জমির দাম বাড়ার ফলে জমি নিয়ে প্রতারণা অনেকটা বেশি। বিবদমান সম্পত্তির বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রে প্রশাসনও বাড়তি সুবিধা আদায় করে থাকে। ফলে অনেকেই জমি কিনে ও জালিয়াতির খপ্পরে পড়ে সর্বশান্ত হয়েছেন।

আশুলিয়া অঞ্চলে প্রায় প্রতিদিন উদ্ধার হচ্ছে নারী কিংবা পুরুষের মরদেহ। উদ্ধারকৃত লাশের অধিকাংশই অজ্ঞাতনামা। পুলিশের ধারণা কোনো সন্ত্রাসী চক্র অন্যত্র হত্যা শেষে এ অঞ্চলে লাশটি ফেলে যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে নিহতের পরিচয় এবং হত্যাকারীদের গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না। 

গত বৃহস্পতিবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বিপরীতে ডেইরি গেটের পাশ থেকে রবিউল ইসলাম রবিন (২৫) নামে এ যুবকের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। রবিন হানিফ পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার হিসেবে বাইপাইলে কর্মরত ছিলো। তার বুকে, মাথায়, চোখে ও কপালেসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। 

গত ১৬ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার পলাশবাড়ি এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে অজ্ঞাত এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রাম কৃষ্ণ জানান, নিহত যুবকের মুখে ফেনা লেগে ছিল। 

গত দুই মাসে আশুলিয়া এলাকায় ১ ডজনের অধিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।  ৯ সেপ্টেম্বর সোমবার দিবাগত রাতে উপজেলার উত্তর গাজীরচট ভূইয়াপাড়া মহল্লার ফজল ভূইয়ার মালিকানাধীন ভাড়া বাড়িতে এক পোশাক শ্রমিক দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী শ্রমিক আশুলিয়া থানায় মামলা দায়ের করলে রাতেই অভিযান চালিয়ে  ধর্ষক কাইয়ূম ও তুহিন আলমকে আটক করে পুলিশ। একই দিন উত্তর গাজীরচট এলাকার একটি পরিত্যাক্ত কারখানায় চাকরি দেওয়ার কথা বলে এক তরুণীকে ডেকে নেয় শারফিন নামে এক গাড়ি চালক। পরে তাকে ধর্ষণ করে সেখানে আটকে রেখে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী তরুণীর অভিযোগের ভিত্তিতে রাতেই গাজীরচট এলাকায় অভিযান চালিয়ে শারফিনকে আটক করে পুলিশ। 

এর আগে ১৭ আগস্ট  আশুলিয়ার ডেন্ডাবর এলাকার নতুন পাড়া মহল্লায় এক উপজাতি গৃহবধূ নিজ বাসায় গণ ধর্ষণের শিকার হন।  এছাড়া আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে একটি প্রতারক চক্র দীর্ঘদিন যাবৎ নারী দিয়ে প্রতিপক্ষ কিংবা প্রভাবশালীদের ফাঁসিয়ে অর্থ আদায় করে আসছে। মান ইজ্জতের ভয়ে অনেকে এ চক্রের শিকার হয়েও মুখ খুলছেন না। এ প্রতারক চক্রের সঙ্গে পুলিশের কতিপয় অসৎ সদস্যও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনেকক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার কিংবা প্রতারিত ব্যাক্তি অভিযোগ করতে চাইলেও অপরাধীরা প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে ভয়ে টু শব্দটিও করে না।  প্রশাসন অপরাধ সংগঠিত হয়েছে জেনেও অভিযোগ হয়নি অজুহাতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। ফলে অপরাধ করেও অপরাধী রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

অপরদিকে মিল-কারখানার ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে ছোট-বড় একাধিক গ্রুপ। এ সন্ত্রাসীচক্র মোটরসাইকেল ও গাড়িতে মহড়া দিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে। ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়শই নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

মাদকে ছেয়ে গেছে গোটা এলাকা।  এলাকার অলিগলিতে মাদকে সয়লাব। ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক ব্যবসা করে অনেকে আজ কোটিপতি বনে গেছে।  মাদকের ছোবলে যুবসমাজ ক্ষতবিক্ষত। এ অঞ্চলে মাদকের যে ভয়াবহ রূপ সেই অর্থে এ অঞ্চলে কোন মাদক ব্যবসায়ী ধরা পড়েনি। অনেক গার্মেন্টস ও পোশাক কারখানায় নারী শ্রমিকদের কৌশলে ব্ল্যাকমেইল করে ধর্ষণ ও যৌন ব্যবসা ব্যবসায় বাধ্য করাচ্ছে একটি চক্র। ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েও দেহ ব্যবসা চালাচ্ছে দেদারছে। 

সন্ত্রাসীদের উৎপাতে স্থানীয় অনেক শিল্প মিল-কারখানার মালিকরাও আতঙ্কিত উৎকণ্ঠিত। এসব সন্ত্রসাী ও মাস্তানরা স্ব-স্ব এলাকার প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থেকে স্থানীয় মিল কারখানা থেকে প্রতিমাসে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা আদায় করছে। ব্যবসা চালানোর স্বার্থে মালিকরা এ সমস্ত নেতা কিংবা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে তারা মুখ খুলছে না। 

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সাইদুর রহমান বলেন, সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান। প্রতিটি অপরাধেরই তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্সে প্রশাসন।

নাম প্রকাশ না কারার শর্তে এক কারখানা মালিক জানান, এ অঞ্চলে ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার দাপটের কাছে তারা অসহায়।

আরও পড়ুন: উখিয়ায় ফোর মার্ডার: তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন

আশুলিয়ার বিভিন্ন সংযোগ সড়কে গণপরিবহনে চাঁদাবাজি এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীন প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এলাকার সন্ত্রাসী যুবকরা এ চাঁদা আদায় করে থাকে। ফলে একের পর এক অপরাধে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়া এখন ক্রাইমজোনে পরিণত হয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু