আরশিনগর g বাহার উদ্দিন
দেড়শ বছরে পা দিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। অহিংসার জনক আর সত্যের অক্লান্ত পূজারি। বিশ্বের ইতিহাসে তিনিই প্রথম, যিনি সশস্ত্র সংগ্রাম ও হিংসাকে এড়িয়ে শাসকের বিরুদ্ধে, শাসকশ্রেণির ক্ষমতামত্তার বিরুদ্ধে এমন এক বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, যা দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। আর তার আত্মবিশ্বাসের জোর দেখে বিস্মিত বোধ করেছিল গোটা বিশ্ব।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সরব হয়েই শুরু করেছিলেন অহিংস আন্দোলন। এই আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি মেলে ভারতে ফিরে আসার পর। ১৯১৯ সালে দেশে চলে এসে গান্ধীজি বুঝতে পারলেন, রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম সম্ভব নয়। ক্ষমতার বিরুদ্ধে জনতার সম্মিলিত প্রতিবাদ আর প্রতিরোধকে জড়ো করতে হলে ইতিহাসের অহিংসার নির্দেশকে, সত্যের শাশ্বত গরিমাকে গুরুত্ব দিতে হবে। গান্ধীজির অহিংসনীতিতে বুদ্ধ-অশোকের আদর্শের অবস্থান অবশ্যই ছিল, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তার নিজের উপলব্ধির মহিমা, যেখানে সত্যই শেষ কথা। মূলত ১০টি আদর্শের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল তার ব্যক্তিপ্রতিভার ভিত। ব্যক্তিপ্রতিভাকে সমৃদ্ধ আর বিস্তৃত করেছিল বহুজাত দর্শন, যা যেমন দেশজ, তেমনি বিদেশি। তার দর্শনে যেমন ধর্ম রয়েছে, তেমনি ছড়িয়ে আছে বহুদেশি প্রজ্ঞার ধর্মরহিত নীতিশাস্ত্রের মর্মকথা। হিন্দুধর্মে পরম আস্থাবান, আচারনিষ্ঠ গান্ধী আর সত্যের উপাসক মহাত্মার উপলব্ধিতে মানুষই একমাত্র আরাধ্য। অন্তরের ভগবান আর মানুষের অধিষ্ঠিত ঈশ্বরে এখানে তফাত নেই। অনুশাসিত জাতপাত, বর্ণবৈষম্য, অশুচি বা যেকোনো ভেদাভেদ তার বিবেচনায় চূড়ান্ত সত্যের বিরোধিতা।
রাজনৈতিক দর্শনে, ব্যক্তিগত আচরণে, সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার ধর্মাশ্রিত আদর্শের কোথাও কোনো বিচ্যুতি নেই। তার ধর্মাবোধ আচারসর্বস্বতার ক্ষুদ্রতা পেরিয়ে পর্যায়ক্রমে একসময় ‘মানুষের ধর্ম’ হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গড়ে ওঠে তার চিরায়ত ধর্মচিন্তার অদ্ভুত সাদৃশ্য। খানিকটা বিরোধও। বিরোধের জায়গাটা পরিষ্কার; রহস্যময়তায় আবৃত নয়।
গান্ধীজি যেহেতু জননেতা, যেহেতু গণচিত্তের পছন্দ-অপচ্ছন্দের প্রবক্তা, সে কারণে ব্যক্তিগত ধর্মবোধকে, সত্যান্বেষণকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্তরে আড়াল করে সামাজিক আগ্রহকে অগ্রাহ্য করেননি। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণের মতো সবার মত আর পথকে মান্যতা দিয়ে সব সময় বুঝিয়ে দিতে চান, এক ধর্মের সঙ্গে আরেক ধর্মের স্বরূপ আলাদা হলেও নির্বিশেষের লক্ষ্য অভিন্ন, যার অন্য নাম কল্যাণবোধ। যেখানে একমানবের বা মহামানবের উপাসনাই তার সত্যান্বেষণ। এটাই তার জীবন আর ভাবনার সাধনা, যার সঙ্গে মিশে থাকে মঙ্গলচিন্তার চিরন্তন প্রবাহ।
‘মানুষের ধর্ম’ বক্তৃতামালায় রবীন্দ্রনাথ এই একমানব বা মানবপ্রবাহকে নিয়ে ব্যক্ত করেছেন তার ঐতিহ্য আশ্রিত অন্বেষণ। এই অন্বেষণে স্বাভাবিক স্রোতের মতো এসে পড়ে বেদান্তের সারকথা, এসে পড়ে লালন ফকির, হাসন রাজার মতো লৌকিক কবিদের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ। সুফিদের ঈশ্বরবোধ রবীন্দ্রপরিবারে বহু চর্চিত বিষয়। হাফিজ, ওমর খৈয়াম কণ্ঠস্থ ছিল মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের। সুফিদের একমানবের তত্ত্ব রবীন্দ্রনাথকে কতটা প্রভাবিত করেছে, তার ঘোষিত স্বীকারোক্তি নেই দর্শনমুখর কবিতা কিংবা গানে। কিন্তু গানের কথার অন্তরালে, দয়িতা আর নিরাকার যখন একাকার হয়ে ওঠেন, তখনই আমরা বুঝতে পারি, রবীন্দ্রনাথের প্রেমের কবিতার সঙ্গে সত্যানুভবের কোথাও দূরত্ব নেই। তার প্রেমের গান, প্রকৃতির গান সবই আকারহীনের সাধনা। যেখানে সাকার নেই, নেই সাকারের পূজা। এখানেই সুফিদের ঈশ্বরবোধের সঙ্গে অজ্ঞেয়বাদী রবীন্দ্রনাথের অঘোষিত আত্মীয়তা তৈরি হয়ে যায়। আর এখানেই আচারসর্বস্ব গান্ধীজির সঙ্গে তার সমসাময়িক সেরা প্রজ্ঞা কবিগুরুর একধরনের বিরোধ অনুভব করি আমরা। ধর্ম বা ঈশ্বর নিয়ে দুজনের আলাপচারিতার প্রমাণ খুব বিরল। তবু বুঝতে অসুবিধে হয় না, দুই কালোত্তীর্ণ মনীষা তাদের কর্মে আর মর্মে নিরন্তর একমানুষকেই খুঁজেছেন। দুজনের কেউই যোগী নন, জীবনবিমুখ সন্যাসী নন, জীবনের সুখ-দুঃখ সঙ্গে নিয়ে, কখনো প্রকাশ্যে, কখনো নীরবে বহন করে, বরণ করে দেখতে চেয়েছেন সত্যের উত্স আর সত্যতার বিস্তারকে। যেমন দেশ গঠনে, শিক্ষার নির্মাণে, তেমনি প্রেমতাড়িত স্বাধীনতা আন্দোলনে।
রাষ্ট্রদ্রষ্টা গান্ধীজি বাহ্যিকভাবে আচারসর্বস্ব হলেও অন্তরে প্রথাগত সর্বাচারকে, শাস্ত্রের নামে আরোপিত অনাচারকে কখনো বরদাস্ত করেননি। করার কথাও নয়। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণই আশা করি যথেষ্ট। ১৯৩৮ সালের মার্চে পুরিতে এসেছেন গান্ধীজি, সঙ্গে কস্তুরবা আর বাপুর সচিব মহাদেব দেশাইয়ের স্ত্রী দুর্গা। দুই অন্তরঙ্গ বান্ধবী হাঁটতে হাঁটতে জগন্নাথ মন্দিরে ঢুকে পড়লেন। মন্দিরে হরিজনদের প্রবেশ নিষিদ্ধ, অতএব মন্দিরপ্রাঙ্গণ গান্ধীজির পরিত্যাজ্য। মহাদেবকে মৃদুস্বরে বকে দিলেন। মহাদেব বললেন, ধর্মপ্রাণ মহিলা হিসেবেই দুই বন্ধু মন্দিরে ঢুকেছেন। এতে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়নি। মহাদেবের যুক্তি মেনে নিলেন গান্ধীজি। মহাত্মা নিজের বিশ্বাসে যেমন অনড় থাকতে অভ্যস্ত, তেমনি অন্যের বিশ্বাসকেও গুরুত্ব দিতেন। স্বাস্থ্যময় মতভেদ বজায় রেখেই অকপটে জানিয়ে দিতেন তার চিন্তার নিজস্বতা। এই শিক্ষা পশ্চিম থেকে ধার করা নয়, খানিকটা ব্যক্তিক ভাবনায় জারিত। খানিকটা প্রাচ্য চিন্তায় প্রাণিত। যিশু, মুহাম্মদ (স), বুদ্ধ, কনফুসিয়াস তার বিশ্বাসের বহু আশ্রয়। একইভাবে রাষ্ট্রদর্শনে মহামতি অশোক ও বাদশাহ আকবর তার অবলম্বন। অশোকের যুদ্ধবিরোধিতা উদ্বুদ্ধ করেছিল তার অহিংস নীতিকে। আর আকবরের ‘রাহে হক’ (সত্যের পথ) তার ভেদাভেদহীন ধর্মচিন্তা আর সত্যান্বেষণের খোরাক হয়ে উঠেছিল।
গান্ধীজি তার ঘোষিত দশ আদর্শের প্রায় শুরুতেই বলেছিলেন, সত্য এমন একটি গাছ, তাকে যত বেশি লালন-পালন করবেন, ততই সে ফল দেবে। তার ফলনের শেষ নেই। সত্য একাই সহ্য করে, একাই সে লড়তে জানে, বাকি সব জোয়ারের আগেই ভেসে যায়। অহিংসা নিয়ে গান্ধীজির অবস্থান আরো বেশি দৃঢ় এবং তার ধর্মবোধেরই অবিচ্ছদ্য অঙ্গ—‘অহিংসা মানুষের পরম ধর্ম। একে আত্তীকরণ করতে হবে। এটা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে তার বিশেষ গুণকে অনুভব করতে হবে। হিংসা থেকে দেশকে, মানুষকে দূরে রাখা জরুরি।
সত্যান্বেষী গান্ধীজি, স্বাধীনতা আন্দোলনের কান্ডারি গান্ধীজি ইতিহাসে অবশ্যই অমর হয়ে থাকবেন। তার অমরতায় অনিঃশেষ প্রাণ হয়ে আছে তার অহিংসার বাণী। হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবী, সন্ত্রাস আর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে বিবস্ত্র, রক্তাক্ত সভ্যতা যুগে যুগে, কালে কালে অনুভব করবে, কী এক মহাশক্তিধর, অপরাজেয় পুরুষকে জন্ম দিয়েছিল অবিভক্ত ভারত, যার কোনো ক্ষয় নেই, অন্ত নেই, নেই কাল অথবা ভৌগোলিক সীমা। ক্রমাগত বাড়ছে তার প্রাসঙ্গিকতা, নিরন্তর উঁচু হয়ে উঠছে গ্রহণযোগ্যতা। পীড়িত, ক্লান্ত, অবরুদ্ধ বিশ্ব অনিঃস্ব ফকিরকে চায়, চায় তার নীতি আর মানবপ্রীতির অমূল্য উপস্থিতি।
n লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক,
সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা
bahar.uddin.editor@gmail.com