বিজয় মানে সবুজের মাঝে লাল সূর্য

বছরঘুরে আবারও এলো বিজয় দিবস। বিজয় দিবসকে উপলক্ষ করে পুরো ডিসেম্বর জুড়েই সারাদেশ লাল-সবুজে ছেয়ে যায়। গৌরবের এ দিনটিকে নানা আয়োজনে উদযাপনের পাশাপাশি দেশকে নিয়ে প্রত্যাশার পারদ আরও বাড়ে। বিশেষ করে তরুণদের প্রত্যাশাই যেন বেশি। তারা স্বপ্ন দেখেন, এই দেশ আরও এগিয়ে যাবে, বিজয়ের অনুপ্রেরণা নিয়ে সবাই যার যার কর্মক্ষেত্রে সাফল্য বয়ে আনবে। এবারের আয়োজনে বিজয় দিবস নিয়ে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া একদল শিক্ষার্থীর ভাবনা লিপিবদ্ধ করেছেন

সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

নাফসিন জাহান নিতু

ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আমার কাছে বিজয় মানে স্বকীয়তা, স্বনির্ভরতার আনন্দ। যেভাবে বিজয় এসেছিল ৪৭ বছর আগে, ঠিক তেমনি দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে যুবসমাজে সচেতনতা নামক বিজয় নেমে আসুক সকল অনৈতিকতার বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের গল্প শোনার মাঝে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে কিংবা শুধু ফেসবুক, মুঠোফোনে সোচ্চার না হয়ে আশপাশের দেখা-অদেখা সকল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। নিজেদের প্রচেষ্টায় স্বনির্ভর হতে হবে নিজেদের স্বার্থে। সকল প্রতিবন্ধকতা দূরে ঠেলে দিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ ও কর্মের সংশোধনের মাঝে দায়িত্ব পালনই হোক এবারের বিজয় উদযাপন।

 

সব্যসাচী নিলয়

অ্যাগ্রিকালচার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম একের পর এক ম্যাচ জিতেই চলেছে। আমরাও উচ্ছ্বসিত হয়ে ভিক্টরি সাইন দেখিয়ে ছবি ইনস্টা কিংবা ফেসবুকে আপলোড দিচ্ছি। এই ভিক্টরি সাইন দেখানোর সৌভাগ্য হয়েছে একমাত্র একাত্তরে বিজয় নিশান উড়েছে বলেই। তবে সেলফি আর দেশপ্রেমের স্ট্যাটাস পোস্টে ব্যস্ত না থেকে আমরা যেন মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হই, এতেই দেশের জন্য আমাদের দায়িত্ববোধ বেগবান হবে। সর্বোপরি, দেশের উন্নয়ন ধারা অব্যাহত থাকুক, বিজয়ের মাসে এই কামনা রইল।

 

ফাহমিদুর রহমান সাকিব

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও দুর্নীতি, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বল অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থার নানা সমস্যা এখনো আমাদেরকে পরাধীনতার মাঝে আটকে রেখেছে। ঘুষ ছাড়া চাকরি, ডোনেশন ছাড়া স্কুল-কলেজে ভর্তির কথা এখনো অনেকে ভাবতে পারেন না। এসব সমস্যাগুলো দূর করতে প্রয়োজন আমাদের সমন্বিত প্রচেষ্টা। নিজেদের চিন্তাভাবনা ও মনমানসিকতা বদলাতে হবে। তাই বিজয়ের মাসে আজ থেকেই পণ করি, আমরা প্রত্যেকে যেন নিজ নিজ ক্ষেত্রে দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করব।

শাফায়াত হোসেন

আইবিএ,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বিজয় দিবস আমার কাছে উত্সবের মতো। ছোটবেলায় আমাদের হলদে রঙের বাড়িটায় সবাই মিলে লাল-সবুজ পতাকা লাগাতাম কাগজ কেটে। শৈশবের দিনগুলো হারিয়ে গেলেও এখনো বিজয় দিবস এলেই আলোড়িত হই। কল্পনায় ভাবি, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের কথা, যেদিন থেকে আমরা বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন দেশ হিসেবে জন্ম নিয়েছিলাম।

আমাদের প্রজন্মের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভালোভাবে জানি না। তাই বিজয়ের মাসে প্রত্যাশা হলো আমরা যেন সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হই।

 

তাসনিয়া হোসেন

ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঘুষ, দুর্নীতি এখনো দূর হয়নি। স্বজনপ্রীতির কারণে অনেক যোগ্য লোক এখনো চাকরি পায় না। রাস্তায় বের হলে ট্রাফিক জ্যামে কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ভিআইপিদের গাড়িবহরের কারণে রাস্তা বন্ধ থাকলে আটকে থাকে অ্যাম্বুলেন্সের রোগী। আমাদের স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এই সমস্যাগুলো যেন আমাদের উন্নতির পথে কাঁটাতারের মতো আটকে আছে। সবার আগে প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। বিজয়ের মাসে আমার প্রত্যাশা, আমরা যেন ‘স্বাধীনতা’র অপব্যবহার না করি। সুন্দর দেশের স্বপ্নপূরণে সবাই যেন সচেষ্ট হই।

অনিক চৌধুরী তপু

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

৪৭ বছর আগের এক ১৬ ডিসেম্বরে এই দিনে আমরা পেয়েছিলাম প্রাণের বাংলাদেশ। কিন্তু আজও সীমিত সম্পদ নিয়ে লড়তে হয় ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও নানারকম সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে। আজকাল বাসায় বাসায় পতাকা ওড়ানো, লাল-সবুজ পাঞ্জাবি-শাড়ি পড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে বিজয় দিবসের চেতনা। এ থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই পড়ে, চলচ্চিত্র দেখে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে দেশ সেবায় নিয়োজিত হবো, এটাই আমার কামনা।

 

প্রীতম দাস

নটরডেম কলেজ

সাফল্য সবসময়ই অনুপ্রেরণাদায়ী, আর তা যদি হয় জাতির বিজয়ের মতো ঘটনা, তবে সেই বিজয় আমাদের অনুপ্রেরণার সবচেয়ে বড় উত্স। নয় মাসের যুদ্ধ-আত্মত্যাগ, আর তার আগেও বহু সংগ্রাম করে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় বিজয় এসেছে। আমরাও যদি আপেক্ষিক মতানৈক্য ভুলে সবাই নিজের জায়গা থেকে আমাদের দেশকে প্রাপ্যটুকু দেওয়ার জন্য আত্মনিয়োগ করি, তবে দেশের অবস্থা বদলাবেই। আমাদের দেশ নিশ্চয়ই বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

 

হুমায়রা হক হিয়া

মুরারিচাঁদ কলেজ, সিলেট

একটি পরাধীন জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণ, একটি জাতীয় পতাকা অর্জন, একটি জাতীয় সংগীতকে ধারণ করে বেঁচে থাকার শুরু, একটি ভাষার কর্তৃত্ব লাভ আর একটি নিজস্ব সংস্কৃতি, এই ছিল একটি দিন, বিজয় দিবস! দিনটি দেশ-জাতি ও ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দিন। কিন্তু আমরা যদি বছরে একদিন বিজয় উদযাপন করে বাকি ৩৬৪ দিন নিজেদের সংস্কৃতিকে এড়িয়ে যাই, তবে তা কখনোই সুফল বয়ে আনবে না। তাই আসুন এই বিজয় দিবসে নতুন করে নিজেদের সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চার শপথ নিই।