চিন্তাপোকা

মোতাহারের মাথায় বেশ কয়েকটা চিন্তা আটকে গেছে। প্রথম চিন্তাটা তার নিজকে নিয়ে। গত দুই মাস হলো চিন্তাটা মাথায় ঢুকেছে। এক রাতে হঠাত্ই তার মনে হলো, আর কতদিন বাঁচব আমি? প্রশ্নটা মাথায় আসা মাত্রই মনে মনে হিসাব কষতে শুরু করল সে। এখন ছেচল্লিশ। ধরা যাক, বড় জোর আর বিশ বছর বাঁচব। তাতেই তো গড় আয়ুর চেয়ে বেশি হয়ে যায়। যুক্তিতে মানলেও হিসাবটা মন থেকে মেনে নিতে পারল না সে। তার মানে বিশ বছর পরেই তাকে কবর দেওয়া হবে। জীবন থেমে যাবে! মরার পর কী হবে? যে সব শাস্তির কথাবার্তা এ যাবত্ শুনে এসেছে সে সব যদি সত্যি সত্যি এসে হাজির হয়ে যায় তাহলে তো বড় মুসিবতে পড়ে যাবে সে। সত্যি কি মরার পর মানুষ আবার জীবিত হবে? এতদিন তো তা-ই জানত। এখন হঠাত্ করে তার সন্দেহ জাগছে কেন? কেউ যদি প্রমাণ এনে দিত তাহলে খুব ভালো হতো। কষ্ট করে বিশ্বাস করবার চেষ্টা করতে হতো না। কিন্তু সেটাই তো মুশকিল। মৃত্যু এমন এক পিকুইলিয়ার ঘটনা যে কেউ ফিরে এসে প্রমাণ করতে পারবে না যে সত্যি কী হচ্ছে সেখানে। কাটাকাটি করে মোতাহার অবশ্য মোদ্দাভাবে একটা যুক্তি দাঁড় করেছে। দুনিয়ার যাবতীয় জীব মরে গিয়ে মাটি হয়ে যায়। হিসাবমতো মানুষও মাটির সাথে মিশে যাওয়ার কথা। মানুষকে কেন আবার জীবিত করা হবে? জীব জগতের আর কারো বেলায় বিচার-আচারের ঝামেলা নেই। যত ঝামেলা শুধু মানুষের বেলাতে। মৃত্যু নিয়ে হাবিজাবি চিন্তা করতে গিয়ে ইদানীং মাথাটা ভারী হয়ে যাচ্ছে মোতাহারের। বিষয়গুলো কারো সাথে শেয়ার করতেও পারছে না সে। চিন্তাটা মাথায় না আসলেই ভালো হতো। সত্যি যদি জীবিত করে প্রশ্ন করা হয় তখন! মোতাহার কোনো কূলকিনারা পায় না। বিলকিসের সাথে আলোচনা করলে কেমন হয়? কিন্তু পরক্ষণেই সে মত পাল্টে ফেলল। বিলকিসকে বলার মানেই হয় না। দুই সন্তানের ঝামেলা নিয়েই সে জেরবার হয়ে আছে। তাছাড়া তার মতো নিরিবিলি নিরেট রমণীকে এসব কথা বললে সে মোবাইলে তার বাবাকে বলে দেবে। তখন সংসারটা কিছুদিনের জন্য ব্লক হয়ে যাবে। বিলকিস সরল বিশ্বাসী মেয়ে। আজো সে ভূতে বিশ্বাস করে। ভূত-প্রেতের আছর থেকে বাঁচতে ঘুমুবার আগে বুকে থু থু করে থুতু ছিটিয়ে তবে সে নিশ্চিত হয়। প্রথমদিকে নিজের গায়ে থুতু দেওয়া হলে মোতাহারের গায়েও ছোট করে থুতু, ছিটাত। গত বাইশ বছরে মোতাহার বহুবার এ নিয়ে তর্ক করেছে, বিলকিস, এসবের মানে কী? এর কোনো যুক্তি আছে! বিলকিস রাগ করেনি, হাসিমুখে বলেছে, তুমি বুঝবে না। এ হলো শনি কাটানি। আমার দাদাজান আমারে শিখাই গ্যাছে। বিলকিসের আরো কতক কীর্তিকলাপ আছে, যেমন—সে যখন চুল আঁচড়ায় তখন যে চুলগুলো চিরুনির সাথে উঠে আসে সেগুলো সে আঙুলে পেঁচিয়ে কুণ্ডলী করে তারপর তাতে থুতু ছিটিয়ে জানালার বাইরে ফেলে দেয়। মানেটা মোতাহার পরে জেনেছে। এভাবে চুলে থুতু ছিটিয়ে দিলে কেউ আর ফকিরালি বা জাদুটোনা করতে পারে না। বিলকিসের খালাত বোন সাহানার চুল নিয়ে নাকি একবার বশীকরণ করেছিল। চুলের তাবিজ এত মারাত্মক ছিল যে দুই মাস সহ্য হয়নি। ছেলেটার জন্য পাগল হয়ে গেল সাহানা। শেষে তো ওরা কোর্ট ম্যারেজ করল। এখনো চুলের কথা উঠলেই বিলকিস রাগে গজগজ করে—মাগি বুঝতাছে কত বড়ো ভুল করছে। চুলটাকে থুতু ছিটিয়ে রাখলে ছেমরিকে আজ এত কষ্ট করতে হতো না। সবই ছিল। বাপে বড়লোক, তুই দেখতি সুন্দরী। রাজপুত্র বিয়ে করে নিয়ে যেত তোরে। আর আজ তুই ভাতে-পানিতে মরছিস। বিলকিসের সামনে যুক্তি তোলা বৃথা। মোতাহার প্রতিবাদ করেনি বরং নীরবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আর যা-ই হোক অন্তত জটিল কোনো চ্যাপ্টার নিয়ে তার সাথে শেয়ার করা ঠিক হবে না। বিলকিসকে ঘাঁটতে ঘাঁটতে মেয়েমানুষ সম্পর্কে মোতাহারের একটা বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেছে—জীবগতভাবেই নারী এবং পুরুষ, দুটি ভিন্ন ভিন্ন জীব। তাছাড়া নারী-পুরুষের মনমর্জিতেও যথেষ্ট ফারাক আছে। মাঝখানে আঠার মতো অদম্য আদিম আকর্ষণটা না থাকলে হয়তো ভিন্ন জীবদ্বয়কে একত্রে রাখাই সম্ভব হতো না। মোতাহারের বিশ্বাস, দুটো পুরুষ মানুষ একসাথে থাকতে পারে, কিন্তু যৌনতা কিংবা সন্তানের প্রতি স্নেহ-মমতা না থাকলে নারীসঙ্গ জ্বালা ধরে যেত। কবেই পুরুষরা নারীকে ছেড়ে পালিয়ে যেত। এ নিয়ে মোতাহারের তাই তেমন আক্ষেপ নেই। ভাগ্য ভালো যে বিলকিস আর দশজন মহিলার মতো প্যানপ্যানানি টাইপের নয়। আজকালকার বাজারে তার মতো মেয়ে পাওয়া যাবে না। ব্যবসায়ীর মেয়ে ছিল সে। মোতাহার তখন সবেমাত্র কেরানির চাকরি পেয়েছে। বিলকিস ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে। বিয়ে হয়ে গেল। ৮০০ টাকা বেতন থেকে শুরু এখন বাইশ বছর বাদে ১৯০০০ টাকা। বাপের একতলা বাড়িটা ছিল বলে রক্ষে। বাদবাকি পানি থেকে শুরু করে সব কেনা। বিলকিসকে কোনোভাবেই নির্বোধ বলা যাবে না। পরিবার পরিকল্পার কথাই ধরা যাক। সে নিজ থেকেই আগেভাগে সর্তক করে নিয়েছিল। মোটে দুটো ছেলেমেয়ে। কাজের লোক মিলে মোট পাঁচ জনের সংসার। মোতাহার নিজের জন্য পাঁচ শ টাকা কেটে নিয়ে পুরো বেতনটা বিলকিসের হাতে তুলে দিয়ে মাসের জন্য খালাস হয়ে যায়। বাজারঘাট, কাপড় ইস্ত্রি, রান্নাবান্না, আত্মীয়স্বজন সামলানো, বাচ্চাদের লেখাপড়া, টিউশনি থেকে শুরু করে সংসারের তাবত্ কিছু এক হাতে সামলে নেয় বিলকিস। সংসারের ফুটো বন্ধ করতে সে নিজের শাড়িটা পর্যন্ত ঠিকমতো কেনে না। এত কিছুর পরও অভিযোগ নেই, বরং যেদিন মোতাহার খুব ক্লান্ত থাকে সেদিন নিজ থেকেই মোতাহারের পা টিপতে শুরু করে দেয় সে। মেয়েকে নিয়ে ঝামেলা নেই। সে মাটিমুখো। কিন্তু ছেলেটা মানুষ হবে কি না বোঝা যাচ্ছে না। ঠিক বখাটে নয়। মেয়েলি সমস্যাও নেই। আড্ডাবাজিটাই ওকে খেয়ে ফেলল। দিনরাত বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে থাকে। ইদানীং বিলকিস একা পেড়ে উঠতে পারছে না। তাছাড়া নতুন বুয়া জনতার মায়ের হাতটানের অভ্যেস দেখা দিয়েছে। আঁচলের তলায় করে সে নাকি মুলাটা, মাছের চাকাটা, চাউলটা লুকিয়ে নিয়ে যায়। বিলকিস দু-একবার হাতেনাতে ধরে ফেলেছে। তাতে লাভ হয়নি। জনতার মা লজ্জা পায় না। ধরা পড়লে হাসতে হাসতেই কথা পাল্টায়—খালাম্মা, এতি তো সামান্যি চাউল, ভাবিছিলাম আপুনি কেছো মনে করবিন না, তাই। বিলকিস কী করবে, গালাগাল শুরু করে দেয়। গালাগালে অবশ্য কিছুই এসে যায় না। পরদিন ভোরেই জনতার মা চলে আসে এবং সাবেক নিয়মে কাজকর্ম করতে থাকে। মাঝে মধ্যে ছেলের ঝালটা মোতাহারের ওপর পড়ে যায়। কানের ওপর বকতে শুরু করে দেয় বিলকিস—পিতা হিসেবে তোমার কোনো কি দায়িত্ব নেই। ছেলেকে কিছু একটা বলো। সব দায়িত্ব কি আমার একার! বাপেরা ছেলের জন্য কত কী করে! আর তুমি গণ্ডারের চামড়া গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ! মোতাহার কথার ঝালে ঝনঝনিয়ে ওঠে না। সে জানে খানিক পরেই বিলকিস ঠান্ডা হয়ে যাবে। রুটিন করা কথা বলবে, কতবার না বলেছি ঘরের ভিতর সিগারেট টানবে না। ছাদে যাও, আমি বিছানা গোছাবো। বিলকিস সত্যিই অসাধারণ। মোতাহারের মাথায় চুল প্রায় উঠেই গেছে। হবে না! বয়স তো কম হলো না পঁয়তাল্লিশ পার হতে চলল। বলতে গেলে বিলকিসের রূপলাবণ্য এখনো দেখার মতো। যদিও দুই সন্তানের পর শরীরটা খানিক ভারী হয়ে গেছে বটে। তবে রূপে এখনো তেমন করে টান ধরেনি। মাঝে মাঝে বিলকিসের পাশে শুয়ে নিজকে খুব বুড়ো মনে হয় মোতাহারের। বিলকিস বোধ হয় মনে মনে আর পছন্দ করে না তাকে। খামোখাই সন্দেহ লাগে। কিন্তু বিলকিস আগের মতোই ভালোবাসে মোতাহারকে। নোটিশ ছাড়া দুই ঘণ্টা না থাকলেই অস্থির হয়ে যায় সে। কোনাকানচি সবই তার নখদর্পণে। বড়লোকের সুন্দরী মেয়ে এভাবে ক্রীতদাসীর মতো দিনরাত খেটে চলেছে, এই তো ইহজনমে পরম পাওয়া। কিন্তু মাঝবয়সে এসে এ কোন যন্ত্রণায় পড়ল সে। মাথার মধ্যে পোকাটা কেন যে ঢুকল? কোনো মানে হয় না। মরার পর সব মাটি হয়ে যাবে? সেও তো মানা যাচ্ছে না। আবার কিছুই হবে না এমন বিশ্বাস করাও তো বিরাট ঝুঁকির ব্যাপার। কী করা যায়? কোনো সমাধান আসে না, বরং উল্টাপাল্টা চিন্তায় সারাক্ষণ অস্থির হয়ে থাকে তার মন। যতই সে মন থেকে মৃত্যুচিন্তা দূর করতে চায় ততই নাছোড় নীল মাছির মতো ঘুরে ঘুরে ঘোরপাক খায় চিন্তাপোকা। দিন দিন যেন শূন্য হয়ে আসছে সবকিছু। যদি দেহটা মাটি হয়েই যায় তবে মোতাহার কার কাছে নিজকে সমর্পণ করবে? পরপার বলে যদি কিছু না-ই থাকে তবে ভালোমন্দ ভেবে লাভ কী! খাওদাও ফুর্তি করো। কিন্তু মনকে সে কোনোমতেই সান্ত্বনা দিতে পারছে না। শেকড়ছাড়া হয়ে মনটা কেবল শূন্যতার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। সবকিছু পানসে আর বিস্বাদ লাগছে। ব্যাপারটার সুরাহা হওয়া দরকার। কারো সাথে আলাপ করতে পারলে একটু হালকা হওয়া যেত। কিন্তু কার সাথে কথা বলবে সে। সহকর্মীরা এসব বিষয় জানলে, ভাববে মাথায় ছিট আছে। খুঁজে খুঁজে বলার মতো কাউকেই পেল না সে। একমাত্র বিলকিসই তার শেষ ভরসা। বিয়ের পর আজ পর্যন্ত সবকিছুই বিলকিসের সাথে শেয়ার করেছে সে। তারপরও বিলকিসকে বলা যাবে না। নিজের মনেই যুক্তি মানল সে। বললে যদি সেও উল্টাপাল্টা চিন্তা শুরু করে তবে তো পুরো সংসারটাই এলোমেলো হয়ে যাবে। দুশ্চিন্তা বুকে নিয়ে দিন যেতে লাগল মোতাহারের। চালচলনেও খানিক অন্যমনস্কতা দেখা দিল। ব্যাপারটা ধরতে খুব বেশি সময় লাগল না বিলকিসের। মোতাহারকে মুখস্থ করে ফেলেছে সে। মোতাহারের এলোমেলো ভাবটা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। ইদানীং সে খাট থেকে উঠে যায়। পায়াচারি করে। নিজ মনে কী সব বিড়বিড় করে। তারপর আবার আলগোছে শুয়ে পড়ে। প্রথম কয়েক রাতে বিলকিস মুখ খোলেনি। এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। বিলকিস ইচ্ছে করেই ধরে ফেলল তাকে। মোতাহারের পিছু পিছু বারান্দায় চলে গেল সে। পেছন ফিরতে গিয়ে মোতাহার ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। বিলকিস আলতো করে পিঠে হাত রাখল। তারপর খুব নরম করে বলল, কী হয়েছে তোমার? বহুদিন পর মোতাহারের বাবার কথা মনে পড়ে গেল। একমাত্র বাবাই মোতাহারের পিঠে এমন করে হাত রাখতেন। সামনে ছাদ ভরে সাদা জোছনা ফুটে আছে। জোছনায় মুখ রেখে বড় করে নিঃশ্বাস ফেলল মোতাহার—আহ্ আজ যদি বাবা বেঁচে থাকতেন! বিলকিস সহজ গলায় জিজ্ঞাসা করল, তোমার কী হয়েছে, আমাকে বলো। মোতাহার জানে বিলকিসের কাছে লুকিয়ে কোনো লাভ নেই। তারপরও মোতাহার রা রা করে উঠল, নাহ্, কী হবে? কিছুই হয়নি। বিলকিস নাছোড়। অগত্যা মোতাহার মুখ খুলল—সব কথা আমি বলতে পারব না। বললে আমাকে পাগল ভাববে তুমি। আরো গভীর হয়ে এলো বিলকিস। তারপর স্বর নিচু করল—পৃথিবীর সবাই তোমাকে পাগল ভাবলেও আমি তো তোমাকে চিনি। তুমি তো আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ। তুমি বলো। মোতাহারের কাছ থেকে সব শোনার পরও বিলকিসের কোনো পরিবর্তন হলো না। সে নিঃশব্দে ছাদের কার্নিশে চলে গেল। মোতাহার দৃশ্যটির জন্য প্রস্তুত ছিল না। এগিয়ে আসার আগেই সে সাবধান করে দিল—আর যদি এক পা এগোও তাহলে আমি ঝাঁপ দিব। বিলকিস কি পাগল হয়ে গেল নাকি? আর অর্ধেক পা টানলেই সে দোতলা থেকে নিচে পড়ে যাবে। হঠাত্ সিনক্রিয়েট করার মানে কী! আতঙ্কে চিত্কার করার আগেই বিলকিস তাকে হাত ইশারায় থামিয়ে দিল। কার্নিশে এক পা রেখেই সে খানিক দম নিল। পুনরায় পা তোলার আগে বিলকিস প্রশ্ন করল, বলো তো আমি এখন কী করবো? মোতাহারের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেছে। আর একটু হলেই সে জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়বে। সে আর সহ্য করতে পারল না। চিত্কার করে উঠল—আমি জানি না, জানি না। তুমি চলে এসো। কী পাগলামি করছো? তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। বিলকিস সশব্দে হেসে উঠল—যে বেঁচে থাকতে নিজের বউয়ের মনের কথা বলতে পারে না, সে কিনা মরণের পরের চিন্তা করে। এরপর হাসতে হাসতেই কাছে এল বিলকিস। মোতাহার যেন মাটি খুঁজে পেল। বিলকিস পুনরায় মোতাহরের পিঠে হাত রাখল—শোনো, তুমি যে শঙ্কা নিয়ে মাথা ভারী করে ফেলেছ, সেরকম একটা ভাবনা ইন্টার ফার্স্ব ইয়ারে পড়াকালে আমার মাথাতেও এসেছিল। কিছুদিন উল্টাপাল্টা চিন্তাও করেছি। কোনোকিছুই ভালো লাগত না তখন। কোনো কূলকিনারা পাইনি। সবসময় কেবল মনে হতো—এসবের  কোনো মানে নেই, এভরিথিং ইজ মিনিংলেস। একবার ভাবলাম এ জীবনের কোনো মানে নেই। বিশ্বাস করবে কি না জানি না, আত্মহত্যার মতো ভয়ানক কথাও চিন্তা করেছিলাম। পরে দেখলাম, ব্যাপারটা খামোখা। কী হবে, হবে। না হলে, না হবে। দরজার ওপাশে কী আছে, না আছে তা ভেবে ফলাফল কী? যা জানা যাচ্ছে না, তা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার নেই। মোতাহার তাজ্জব হয়ে বিলকিসের কথা শুনছে। কী বলে মেয়েটা! যাকে এতকাল নিরেট গৃহবধূ ভেবেছে, সে এখন দার্শনিকের মতো কথা বলছে। লোক-পরলোক নিয়ে আরো কিছু কথা চালাল বিলকিস। তারপর বলল, অনেক রাত হয়েছে, চলো ঘুমিয়ে পড়ি। সকাল সকাল উঠতে না পারলে অফিসে তোমার দেরি হয়ে যাবে। মোতাহার ফিরে আসতে আসতে ভাবল—মরার পরে কী হবে, না হবে—তা বড়ো কথা নয়; ঘরের মানুষ যে মনের কথা বুঝতে পেরেছে এটাই বড়ো কথা।