তাসখন্দের সুফি চিত্রকর

তাসখন্দের কুকেলবাসি মাদ্রাসার ভেতরে ঢোকার মুখে বিশাল তোরণ। তবে তোরণের নিচে লটকে থাকা কাঠের দরজাটি কিন্তু তেমন বিশাল নয়। ওটির একটি পাল্লা হাট করে খোলা। সেখান দিয়ে গা গলিয়ে ভেতরে ঢোকার পরপরই ঝকঝকে সবুজ বাগিচা আমাকে অভ্যর্থনা জানায়। দু দিকে তিসির গাছ। মাঝ দিয়ে খোয়া বিছানো সর্পিল আকৃতির পথ। চাইলে কেউ সেই পথ মাড়িয়ে যেতে পারে ভবনের অপরপ্রান্তে। আবার কেউ চাইলে চৌকোনা আকৃতির এই ভবনের বারান্দার পথ ধরেও হেঁটে হেঁটে পৌঁছাতে পারে সেই একই বিন্দুতে। আমি দ্বিতীয় পন্থাটিই বেছে নিলাম। তাতে করে আমার লাভ হলো এই—বাঁ পাশের ক্লাস রুমের ভেতরকার ছাত্র-শিক্ষকের পাঠদান আর পাঠ গ্রহণের একটি চিত্র দেখার সুযোগ মিলল। আর সেই চিত্রটি দেখে দক্ষিণ এশিয়া থেকে আগত একজন হিসেবে কিছুটা ভিরমি খেলাম বৈকি।

ক্লাসরুমের ঝকঝকে কাচের জানালার মাঝ দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি—মাথায় উজবেক টুপি ‘ডুপি’ আর কালো কোট পরে চেয়ার টেবিলে বসে দুলে দুলে পড়ছে ছাত্ররা। তাদের শিক্ষকের পোশাকও ওই একই; কালো কোট আর মাথায় জরির কাজ করা ডুপি। তবে এদের কারোরই মুখে শ্মশ্রু নেই। কামানো মসৃণ গাল। আমাকে দেখতে পেয়ে দু-একজন ছাত্র শিক্ষকের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কৌতূহলী দৃষ্টিতে এদিকে তাকায়। শিক্ষকটি বয়সে তরুণ। তিনি ছাত্রদের দৃষ্টি অনুসরণ করে আমার দিকে ক্ষণিকের জন্যে তাকান। তারপর হাতের চক দিয়ে দেয়ালে টানানো বোর্ডে কিছু একটা লিখতে উদ্যত হন।

ঘোড়ার খুরাকৃতির এই ভবনটির বক্রতার স্থানটিতে লম্বাটে একচিলতে ঘর। দরজার পাল্লা কিছুটা ভেজানো। কিছুটা দ্বিধা সত্ত্বেও আমি সেই পাল্লা ঠেলে ভেতরে ঢুকি। আর তারপর আমার চোখজোড়া ছানাবড়া হবার জোগাড়। সরু এক ফালি এই ঘরটির দুই দিকের দেয়ালে টানানো অসংখ্য পেইন্টিং। বেশকিছু পেইন্টিং আবার স্থানাভাবে মাটিতেই দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো। ঘরের মাঝ বরাবর চামড়ায় পৃষ্ঠভাগ মোড়ানো একটি টেবিল। টেবিলে উপচে পড়ছে বই আর কাগজের স্তূপ। পাশের চেয়ারে বসে আছেন যিনি, তার চেহারা ঠিক মঙ্গলীয় ধাঁচের নয়। উজ্জ্বল গাত্রবর্ণ। উলের মাফলার গলায় না পেঁচিয়ে কাঁধের দুই পাশে ফেলে রাখা। টেবিলের একপাশে মাঝারি উচ্চতার একটি মেয়ে আমার দিকে পিঠ ফিরিয়ে এই ভদ্রলোকের সঙ্গে কোনো এক আলোচনায় মত্ত। মেয়েটির মুখশ্রী আমি দেখতে পাই না। কেবল দেখতে পাই পিঠের ওপর আছড়ে পড়া তার চেস্টনাট বর্ণের কেশদাম। কিন্তু উজবেক ভূমিনারীদের চুল তো সাধারণত বাঙালি মেয়েদের মতোই কুচকুচে কালো! তবে কি ও এই দেশে এসে মিশে যাওয়া রুশ কিংবা তুর্কি জাতির বংশানুক্রম ধারণকারিণী? সে নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করার আগেই চেয়ারে উপবিষ্ট সেই ভদ্রলোক—‘আসুন, আসুন, ভেতরে আসুন’—বলে আমাকে সম্ভাষণ জানান। এবারে মেয়েটি আমার দিকে ফিরে তাকায়। আমি দেখি, তার মুখের কোণে লেগে রয়েছে অমায়িক হাসির মুক্তোদানা।

ওদিকে আমার মাথায় কিন্তু ঘুরছে হাজারো প্রশ্ন। এই পেইন্টিংগুলো এমন এক মাদ্রাসায় কেন? কে এঁকেছেন এগুলো? এই যে সামনে উপবিষ্ট ভদ্রলোক, তিনিই কি তবে মূল চিত্রকর? বস্ফািরিত নেত্রে চারদিকে নজর বোলানোর সময়ে আমি তাই ভদ্রলোককে বলি—‘বেশকিছু প্রশ্নের মেঘ জমেছে মনে। যদি আপনার কিছুটা সময় থাকে, তবে একে একে প্রশ্নগুলো আপনার সামনে পেশ করতে চাই।’

ভদ্রলোক আমার কথা শুনে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে করমর্দন করেন। নাম তার মুজাফফর। পেশায় চিত্রশিল্পী। এই ঘরটিই তার স্টুডিও। আর আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পেইন্টিংগুলোও তারই আঁকা। নিজের এই নাতিদীর্ঘ পরিচয়টি দেবার পর কিছুটা লজ্জিতভাবে বলেন, ‘আপনি যে আমাদের সম্পর্কে জানতে চাইছেন, সে তো পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। তবে কী জানেন, আমি ইংরেজিতে ততটা পটু নই। তাই আপনি প্রশ্নগুলো কিছুটা ধীরে ধীরে করলে ভালো হয়।’ তারপর পাশের সেই মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘আর আমি কোথাও থেমে টেমে গেলে নিলুফার হয়তো সেগুলো ইংরেজিতে তর্জমা করে দিতে পারবে।’ নিলুফার, অর্থাত্ সেই মেয়েটির সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ ঘটে এবার। উজবেক দেশের এই মেয়েটি প্যারিসে পড়ছে স্থাপত্য নিয়ে। ছুটিতে তাসখন্দে এসেছে। মুজাফফরের কাছে আজ এসেছে ইসলামিক স্থাপত্যকলা নিয়ে কিছু জ্ঞানলাভের অভিপ্রায়ে। কারণ, প্যারিসের কলেজে ওর অভিসন্দর্ভ এই বিষয়টি নিয়েই।

‘মাদ্রাসার অভ্যন্তরে এই স্টুডিও খোলার অনুমতি কী করে পেলেন আর কেনই বা এখানে আপনার স্টুডিও, এই ব্যাপারটি একটু খোলাসা করে বলবেন?’—মুজাফফরকে আমি জিজ্ঞেস করি। উত্তর দেবার আগে তিনি টেবিলে রাখা একটি বাটিতে হাত ডুবিয়ে বের করে আনেন হলুদ রাংতা কাগজে মোড়া একটি চকলেট। তারপর আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন—‘গত সপ্তাহে কাজাকিস্তানে গিয়েছিলাম একটা সম্মেলনে। সেখান থেকে এনেছি। খেয়ে দেখুন না একটা।’ আমি কাগজের মোড়ক খুলে চকলেটটি মুখে পুরি। তিনি হয়তো কথাগুলো গুছিয়ে নেবার জন্যে আর মস্তিষ্কের মাঝে অনুবাদ করার জন্যে কিছুটা সময় নেন। তারপর বলেন, ‘আপনি হয়তো জানেন, সোভিয়েত সময়ে এখানকার অনেক মসজিদ-মাদ্রাসায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এই মাদ্রাসার কথাই ধরুন। এটিকে ওই সময়ে পরিণত করা হয় অজ্ঞেয়বাদী জাদুঘরে। মাদ্রাসার অধীনে থাকা ওয়াকফ সম্পত্তিগুলোকে অর্পিত করা হয় স্থানীয় সরকারের জিম্মায়। তবে স্বাধীনতার পর পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টেছে। আমাদের মাদ্রাসাগুলোতে আবারও ধর্মভিত্তিক শিক্ষা চালু হয়েছে। তবে একটা ব্যাপার কী, মাদ্রাসাগুলোতে এখনো কিন্তু সোভিয়েত সময়ের মতোই কিছু সরকারি নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান। এর সম্পদ এখনো সরকারি সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। ওদিকে আমি শিল্পী হিসেবে সরকারের খাতায় যুক্ত। আঁকাজোকার জন্যে একটি সরকারি স্থানের আবেদন জানালে তারা দেখল—এখানের একটি ঘর আমার স্টুডিও হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া যায়। কারণ, ওটা বহুদিন ধরেই খালি পড়ে ছিল। সেভাবেই বলতে পারেন, এই রুমটিতে আমার স্টুডিওর যাত্রা শুরু।’

‘কিন্তু এখানে স্টুডিও চালাবার কারণে মাদ্রাসা ছাত্রদের বিরোধিতার মুখে পড়তে হয় না আপনাকে?’

‘দু-একজনের স্বল্পমাত্রার বিরোধিতার মাঝে পড়েছি। তবে সেটা খুব বাড়াবাড়ি পর্যায়ের নয়।’

 

‘আপনার কথা গলধঃকরণ করতে আমার কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। কারণ, এই যে ছবি আঁকার বিষয়টি, সেটি কি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয়?’

‘এক অর্থে নয়। কারণ, ইসলামে যে কোনো জীবন্ত প্রাণীর ছবি আঁকার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আছে। কিন্তু আমি তো কোনো জীবন্ত কিছুর ছবি আঁকি না। একটু ভালো করে খেয়াল করে দেখুন, আমার ছবিতে নর-নারীদের চক্ষু নিমীলিত। আর চক্ষুদান ছাড়া কাউকে প্রাণসুধায় ভাসানো যায় না। সে অর্থে আমার ছবির নর-নারীরা প্রাণবিহীন সত্তা।’

মুজাফফরের কথার সত্যতা যাচাইয়ের জন্যে তার কিছু শিল্পকর্মের ওপর চোখ বোলাই। আমার ঠিক পাশেই বিশাল একটি চিত্রকর্ম। আকাশনীল রঙের মাঝে সুফি চেহারার একজন অনন্ত অম্বরের দিকে মুখ করে চেয়ে কিছু একটা আবাহন করছেন। আর সেই ঊর্ধ্বাকাশ থেকে নেমে আসছে আরবি ক্যালিগ্রাফি। ছবিটির দিকে তাকিয়ে আছি দেখে মুজাফফর বলেন, ‘এই যেমন, এই ছবিটির কথাই ধরুন। এখানে আমি সুফি দরবেশের অবয়ব এঁকেছি, কিন্তু তার মুখমণ্ডল ইচ্ছে করেই অপ্রকাশ্য রেখেছি। তার আহ্বানে সাত আসমানের পাড় থেকে নেমে আসছে খোদার বরকত।’ 

‘আপনার আরো কিছু ছবিতে সুফি দরবেশের ছায়া দেখতে পাচ্ছি, এটা আমার নিছক অনুমান?’

কিছুটা প্রীত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মুজাফফর বলেন, ‘আপনার পর্যবেক্ষণের তারিফ করতে হয়। মোটামুটি ঠিকই ধরেছেন। আমি ব্যাক্তিগত জীবনে সুফিবাদে বিশ্বাসী। সেজন্যেই হয়তো আমার ছবিতে ঘুরেফিরে এসেছে—সুফি দরবেশরা ভেসে যাচ্ছেন মাওলার দরদী সাগরে।’ 

‘আপনার নিজ জীবনে এই যে সুফিবাদের আলোকসম্পাত, এটি কি কোনোভাবে পারিবারিকভাবে প্রাপ্ত? আমি আসলে আপনার পূর্বজীবন, আপনার পরিবার, সোভিয়েতকালে তাদের ধর্মপালন—এসব নিয়ে জানতে আগ্রহী।’ 

আমার প্রশ্নে মুজাফফর বেশ উজ্জীবিত হন। কিছুটা নড়েচড়ে বসেন। টেবিলে থাকা একটি পেপারওয়েট নিজের মুঠিতে নিয়ে বলে চলেন পূর্বজীবনের কথা। নিজেকে আজকাল পুরোদস্তুর চিত্রশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিন্তু ছিল স্থাপত্য বিষয়ে। তাসখন্দ স্থাপত্য ইনস্টিটিউটে পড়ার সময়ে তাকে অবশ্য বছর দুয়েকের জন্যে সেনাবাহিনীতে শ্রম দিতে হয়। সেটা ৮৭ সালের দিকের কথা।

আমি এ পর্যায়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলি, ‘আপনাকে নিশ্চয়ই আফগানিস্তানে পাঠানো হয়েছিল? ৮৭ সালের কথা বললেন। তখন তো যুদ্ধ তুঙ্গে।’

‘উফ, আগফান যুদ্ধ। কী এক অন্যায়, বীভত্স যুদ্ধেই না জড়িয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন সে সময়ে। না, আমাকে কাবুলে পাঠানো হয়নি। শুধু আমি না, এ অঞ্চলের মুসলিমপ্রধান দেশের যুবকদের সাধারণত আফগান ফ্রন্টে পাঠানো হতো না; পাছে আমরা মুজাহিদিনদের কোনোভাবে সাহায্য করি—সেই সন্দেহে। আমাকে পাঠানো হয়েছিল বালটিক দেশের একটা গ্যারিসনে। সেখানে দুই বছরের সার্ভিস শেষ করে তাসখন্দে ফিরে এসে ডিগ্রি শেষ করি।’ 

‘আর সুফিবাদ? সুফিবাদে দীক্ষা নিলেন কী করে?’ 

‘আসলে দীক্ষা নিয়েছি, তেমনটা বলা হয়তো ঠিক হবে না। সুফিবাদের দর্শনকে আমি শ্রদ্ধা করি, আত্মায় ধারণ করি। ও হ্যাঁ, আপনি জানেন কি না জানি না, সুফি দর্শনের প্রবক্তা নক্সবন্দির মাজার কিন্তু আমাদের এই উজবেকিস্তানেই, বুখারায়। ওই মাজারটা সোভিয়েত আমলের শেষদিকে সংস্কার করা হয়।’ 

‘এই মাজারগুলোতে কি সোভিয়েত সময়ে মুরিদদের সমাগম ছিল?’ 

‘স্বল্পমাত্রায় হলেও ছিল। একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। ব্রেজনেভের সময় থেকে এগুলোর কিছু কিছু করে সংস্কার শুরু হয়। কখনো স্থানীয় পঞ্চায়েত, কখনো স্থানীয় পুরাকীর্তি অধিদপ্তরের উদ্যোগে। তবে সার্বিকভাবে ধর্মপালনের ক্ষেত্রে নিরুত্সাহ তো ছিলই। একবার মনে আছে—ফারগানার ওদিকে একটা বিদ্যুত্ উত্পাদনকেন্দ্রে রোজার মাসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল—ইফতারের সময় শুরু হলে কয়েকবার বিদ্যুত্ সচল-অচল করে বুঝিয়ে দেওয়া হবে, যাতে লোকে সঠিক সময়ে রোজা ভাঙতে পারে। কিন্তু পরে এ নিয়ে মেলা হৈ চৈ হয়। বন্ধ হয়ে যায় সে উদ্যোগ।’

‘এই যে ধর্মপালনে বাধা, সেটা তো নিশ্চয়ই সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর দূর হয়েছে। এখনকার সময়ে সেই স্বাধীনতাকে কাজে লাগিয়ে উজবেক সমাজ আর রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্ম কতটা প্রভাব রেখেছে বলে আপনি মনে করেন?’ 

‘বড্ড কঠিন প্রশ্ন করে ফেললেন আপনি।’—মুজাফফরকে একটু চিন্তিত বা দ্বিধাগ্রস্ত দেখায়। আড়চোখে একবার তাকান নিলুফারের দিকে। তারপর কিছুটা থেমে বলেন—‘স্বাধীন হবার পর ধর্মপালন নিয়ে আগেকার অধিকাংশ বিধিনিষেধই উঠে গিয়েছিল। মসজিদ-মাদ্রাসাগুলো পুনর্নির্ির্মত হচ্ছিল। ওয়াকফের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল মাজার-মাদ্রাসার কাছে। কিন্তু আফগান যুদ্ধপরবর্তী সময়ে যে অস্থিতিশীলতার ঢেউ জেগেছিল, সেই ঢেউ তাজিকিস্তান পেরিয়ে এসে পৌঁছেছিল এই উজবেকিস্তান অবধি। সে সময় কয়েকটি চরমপন্থি দল সরকারের ওপর চড়াও হয়। তারপর থেকে সরকার বেশ সতর্ক হয়ে যায়। এখন তাই ধর্মপালন আছে, কিন্তু এই পালন নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি নেই।’—মুজাফফরের কণ্ঠস্বর শুনে বুঝি, ঠিক এই বিষয়টি খুব বেশি আলোচনায় তিনি ইচ্ছুক নন। আমি তাই প্রসঙ্গ ঘোরাবার জন্যে ভিন্ন প্রশ্ন খুঁজতে থাকি।

ঘরের দেয়ালে ঝুলানো অসংখ্য চিত্রকর্মের মধ্যে একটিই মাত্র সাদাকালো ছবি। বেশ ছোট মাপের ছবি। কাচের ফ্রেমে বাঁধাই। কাঠের একটি বাড়ির সামনের দাওয়ায় ঝলমলে রোদে স্নাত হয়ে চারজন মধ্যবয়সী পুরুষ চেয়ারে বসে আছেন। তাদের পরনে উজবেক ঐতিহ্যবাহী পোশাক। মাথায় উটের লোমের মোটা টুপি। ছবিটি দেখিয়ে আমি প্রশ্ন করি, ‘এই যে ছবিটি—এটি কি আপনার পরিবারের কারোর ছবি?’

‘মাঝের যিনি, ওই যে পুরু গোঁফ, উনি আমার বাবা। পাশের তিন জন আমার চাচা। বাবা ছিলেন কবি, সাংবাদিক। জাদিদবাদের নাম শুনেছেন কি না জানি না, বাবা ছিলেন জাদিদ মতাদর্শী।’ 

‘জাদিদবাদের কথা শুনেছি। এই যে জাদিদবাদ, একে কি ইসলামের আরেকটি ধারা হিসেবে গণ্য করা যায়?’ 

‘না, যায় না। জাদিদ ঠিক ধর্মের আরেকটি শাখানদী নয়, বরং জাদিদবাদ একটা নতুন ধরনের যাত্রা। মূল ইসলামকে সাথে নিয়েই সে যাত্রা।’

মুজাফফরের ঠিক পেছনের দেয়ালে তার একটি ছবি ঝুলানো। আগে খেয়াল করিনি। বহুকাল আগের ছবি, বোঝাই যায়। হলদেটে হয়ে এসেছে। একটা দেয়ালে ঠেস দিয়ে মাটিতে বসে আছেন যুবা বয়সী মুজাফফর। আমি ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই জিজ্ঞাসা করি, ‘ভারতীয় উপমহাদেশে এই জাদিদবাদের নাম শুনেছি বলে তো মনে পড়ে না।’

‘শোনার কথা নয়।’—আমার কথা শেষ হবার আগেই মুজাফফরের উক্তি। তারপর পাকা ইতিহাসবিদের মতো করে আলোচনার স্রোত ঠেলে দিয়ে বলেন, ‘কারণ, জাদিদবাদের পত্তন আর বিস্তার হয়েছিল এই মধ্যএশিয়ার তুর্কিস্তানেই। রুশ জারের সাম্রাজ্যকালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখন সবে শেষ হয়েছে। একদল তরুণ তুর্কি ভাবলেন—মক্তব আর মাদ্রাসার যে শিক্ষাব্যবস্থা, সেটিকে ঢেলে সাজাতে হবে। বিজ্ঞান শিক্ষাকে টেনে এনে শিক্ষাকে করতে হবে যুগোপযোগী আর ধর্মনিরপেক্ষ—যাতে করে এ অঞ্চলের মুসলিমরা পৃথিবীর আর সব সমৃদ্ধ জাতিগোষ্ঠীর থেকে পিছিয়ে না পড়ে। তখন আমাদের মাদ্রাসার শিক্ষা ছিল আরবিতে। জাদিদরা রুশ শেখার ওপরও জোর দিলেন। কারণ রাজার ভাষা না জানলে আগামীর তরুণসমাজ রাজকার্যে যুক্ত হবে কী করে? এর কিছুকাল পর জার’কে হটিয়ে বলশেভিকরা যখন ক্ষমতা দখল করল—জাদিদরা হলেন বলশেভিকদের সহায়ক শক্তি। বলশেভিকরা দেখল—জাদিদরা ধর্মমুখী হলেও কট্টর ধর্মান্ধ নয়; এরা বিজ্ঞানবাদী, আধুনিকতামনস্ক। ফলে বেশকিছু আদর্শিক মতপার্থক্য থাকলেও তারা জাদিদদেরকে পার্টিতে ঢোকার পথ তৈরি করে দিল। এই যেমন আমার বাবা—বাবা জাদিদবাদী যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য।’

এই যে এতক্ষণ মুজাফফর আর আমার মাঝে আলোচনা চলছে, এর মাঝে কিন্তু অনেকবারই নিলুফারকে সংযুক্ত হতে হয়েছে। হয়তো কথার মাঝে কোনো এক বিশেষ শব্দের ইংরেজি অনুবাদ মুজাফফর গেছে ভুলে। তখন তাকে অসহায়ভাবে তাকাতে হয়েছে নিলুফারের দিকে। মেয়েটি না থাকলে হয়তো বিশেষ বিপদে পড়তে হতো। আমার দৃষ্টিভ্রম কি না জানি না—ওর মাঝে কিঞ্চিত্ উসখুস ভাবের উপস্থিতি নজরে এল। নিশ্চয়ই বেচারির অনেকটা সময় নষ্ট করে ফেললাম। এভাবে ওকে আটকে রাখা হয়তো ঠিক হচ্ছে না। আমি তাই আলোচনার একটা আচমকা ইতি টানার জন্যে মুজাফফরকে জিজ্ঞেস করি, ‘বর্তমান সময়ের পৃথিবীতে নানা জাতির নানা ধর্মের মাঝে অসহিষ্ণুতার যে ছাইচাপা আগুন, তা নির্বাপণের কোনো স্বপ্ন বা আশা কি আপনি হূদয়ে লালন করেন?’

‘কেন করব না, অবশ্যই করি।’—দুয়ার ঠেলে বাইরের উঠোন থেকে এ ঘরে সন্তর্পণে ঢোকা একমুঠো আলোর দিকে তাকিয়ে মুজাফফরের উত্তর। ‘এই যে আমি আঁকছি, এঁকে চলেছি ইসলামের ইতিহাস, ইসলামের কল্যাণময়-করুণাময়-মানবতাময় রূপ—এটাই তো আমার আশাবাদের বহিঃপ্রকাশ। এটাই আমার ইবাদত। আর স্বপ্ন দেখি বলেই তো আমার ছবির মাধ্যমে কথা কইতে চাই পৃথিবীর বাদবাকি জাতিধর্মের মানুষের সাথে। আমার মতো আরো অসংখ্য মানুষ নিশ্চয়ই আছেন। তারাও নিশ্চয়ই কাজ করে যাচ্ছেন নিজ নিজ স্থান থেকে। সেভাবেই একদিন দেখা যাবে—হ্রস্ব হয়ে আসছে সকল আস্ফাালন, বিভেদের ঘন মেঘ কেটে গিয়ে উঁকি দিয়েছে আনন্দময় সূর্য। আমার ভূমির পিতৃপুরুষরা বহু বহুকাল আগে যে স্বপ্ন দেখে গেছেন, তা বিফল হবে বলে মনে হয় না।’

আমি মুজাফফরকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিতে চাইলে তিনি এগিয়ে আসেন মাদ্রাসার সেই প্রধান ফটক অবধি। ‘তাসখন্দে পরে কখনো এলে আবার আমার স্টুডিওতে আসবেন, কথা হবে।’—বলে তিনি আমাকে মেট্রো স্টেশনের পথ দেখিয়ে দেন।