বাঙালির শারদীয় দুর্গোত্সব

নীল আকাশে সাদা মেঘ। নদীর কাশে জমেছে সাদা রঙের আভা। শিউলিবোটায় সাদা শিউলি ফুল। ফসলের খেতে সবুজের ঢেউ। প্রকৃতির পরতে পরতে স্নিগ্ধ বাতাসে শিশিরের আগমনী বার্তা। ভাদ্র পেরিয়ে আশ্বিন। বাংলার এপারে-ওপারে কাঁসরের ধ্বনি—ঢং ঢং। চলে এল শারদীয় দুর্গোত্সব। দেবী একা নন। সঙ্গে কন্যা-পুত্র। দশ হাতে দশ অস্ত্র। ত্রিশূল হাতে সিংহের পিঠে দেবী। কার্তিকের সঙ্গে আছে ময়ূর, লক্ষ্মীর পেঁচা, সরস্বতীর হাঁস, গণেশের ইঁদুর। নিচে খড়্গ হাতে পরাজিত অসুর। বুকে বিদ্ধ ত্রিশূল। সবাই পুজো পাচ্ছে। এমনকি অসুরও। তার মাঝে যে ছবিটি ভক্তদের চোখে ভাসে, তা হচ্ছে দেবী দুর্গার রণমূর্তি। তার লক্ষ্য অসুর দমন। আমাদের প্রতিদিনের কাজে যে অশুভশক্তি আসে, সেই তো অসুর! দেবী তাকে হত্যা করে সমাজে শান্তি নিয়ে আসবেন। তাই তিনি শক্তি প্রয়োগ করছেন। তোমরা জানো অন্যায়-অশান্তি সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনিয়ম ও উচ্ছৃঙ্খলতা যখন আমাদের দেশে বেশি হয়; তখন রাষ্ট্রকেও দশ হাত দিয়ে অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতি দমন করতে হয়। সবাই যেন ভালো থাকতে পারে তার জন্য এর প্রয়োজন রয়েছে। এটুকু তো বড়দের পাশাপাশি তোমরা ছোটরাও বেশ বুঝতে পারো। আর এ অশুভকে নাশ করতেই দুর্গার হাতে ত্রিশূল; কার্তিকের হাতে তীর-ধনুক; যেন এক যুদ্ধযাত্রা। দুর্গাদেবীর অন্য সদস্যগণ কিন্তু শান্ত সৌম্য। যেন দুর্গারই দুই রূপ। শক্তি এবং শান্তির। ঠাকুরের ঘণ্টার শব্দে এবং মন্ত্রে সে কথাই যেন বেজে চলে। সরস্বতীর বীণায় এবং মা লক্ষ্মী, গণেশের চোখে মুখে যেন শান্তিরই ললিত রূপ। গণেশের মাতারূপে তিনি মাতৃশক্তি। লক্ষ্মীরূপে সম্পদের এবং সরস্বতীরূপে বিদ্যার দেবী তিনি। শরতেও তার দুই রূপ। ভাদ্রে পার্বতী, আশ্বিনে দুর্গা। নারী হলেও একাধারে তপস্যা, বিদ্যা, শক্তি ও স্নেহরূপের অধিকারী। তিনি সকলের মঙ্গলের দেবী। মহামাতা। তার পুজোয় যে নবপত্রিকা সাজানো হয় তা হলো বাংলার কৃষিজ উপাদান—কলা, ডালিম, ধান, হলুদ, মানকচু, কালোকচু, বেল, অশোক ও জয়ন্তী। পুজোর ঘটে থাকে আমের নয় পাতার একটি গুচ্ছ। এসব প্রকৃতির দান। এ যেন প্রকৃতিরই পুজো। আর সে পুজো শরত্কালে প্রচলন করেন রাজা রামচন্দ্র।   ১০৮টি নীলপদ্ম দিয়ে তিনি পুজো করেন তার স্ত্রী সীতাকে উদ্ধারের জন্য। শরত্কালে পুজো হয় বলে এ পুজোর নাম শারদীয় দুর্গোত্সব। প্রতি বছর দেবী সন্তানদের নিয়ে কৈলাস ছেড়ে আসেন পিতৃকুলে। পুজো পেয়ে দশমীতে তিনি বিদায় নেন। এ বিদায়ে সবার হূদয় কেঁদে ওঠে। নিজ মেয়েকে বিদায় জানানোর মতো হূদয় হাহাকারে ভরে ওঠে। বাঁশিতে বেজে ওঠে বিদায়ের করুণ সুর। ভক্তদের আকুতি—‘মাগো তুমি আবার এসো’। সবারই নতুন প্রহরের প্রতীক্ষা। দেবী আবার আসবেন নির্দিষ্ট তিথিতে; কোনো এক বাহনে চড়ে; সুখ-শান্তির সংবাদ নিয়ে; কলি ফোটা আজকের মতোই শারদ পুজোতে।