শিবগঞ্জে বন্যার অবনতি, প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি

ভারতের উজান থেকে আসা আকস্মিক বন্যায় শিবগঞ্জের পদ্মা ও পাগলা নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ৪টি ইউনিয়নের প্রায় সম্পূর্ণ ও ২টি ইউনিয়নের আংশিক ক্ষতির পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ৬টি ইউনিয়নের প্রায় ২০হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

মাসকলাইসহ বিভিন্ন ধরণের প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কয়েকটি পাকা রাস্তাও ভেঙে গিয়ে যাতায়াতের বিঘ্ন সৃষ্টি হযেছে। বিশুদ্ধ পানিসহ খাদ্যসংকট রয়েছে। তাছাড়া গবাদি পশু নিয়েও বিপাকে পড়েছে সহস্রাধিক পরিবার।

শিবগঞ্জ উপজেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়ন পাকা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান বলেন, 'প্রায় ১ হাজার পরিবার পানির নিচে। আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সবগুলো রাস্তা পানির নিয়ে তলিয়ে যাওয়ায় কিছু রাস্তা কেটে গেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যাতায়াত। প্রায় ৩শ হেক্টর জমির মাসকলাই পানির নিচে। ৩শ পরিবারকে ১০ কেজি করে চাউল দেওয়া হয়েছে। সাড়ে ৩ হাজার পরিবারের তালিকা দেওয়া হয়েছে।'

দূর্লভপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজিব রাজু বলেন, 'আমার ইউনিয়নে ৭,৮ ও ৯নংওয়ার্ডের দেড় হাজার পরিবার পানির নিচে ও ২ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফসলের ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৯শ হেক্টর জমির। তারমধ্যে মাসকলাই ১৩৭০ হেক্টর, কলা ২৫ হেক্টর, বর ২৫ হেক্টর, হলুদ ২৫ হেক্টর, সবজি ৬৬ হেক্টরসহ অন্য ফসল মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৯শ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে। প্রায় ২ হাজার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকার চাহিদা দেওয়া হয়েছে।'

মনাকষা ইউপি সচিব জানান, মনাকষা ইউনিয়নে ৬টি ওয়ার্ডের  সাড়ে ৪ হাজার পরিবারের ৩৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। তাছাড়া প্রায় ৪০ হেক্টর জমির মাসকলাইসহ বিভিন্ন ধরণের ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে আড়াই মেট্রিকটন চাউল ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা সংশ্লিষ্ট অফিসে দেওয়া হয়েছে।

ছত্রাজিতপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামসুল হক বলেন, 'আমার ইউনিয়নে  প্রায় ২শ পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। প্রায় ২৫হেক্টর জমির মাসকলাই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ত্রাণের জন্য আবেদন করা হয়েছে।'

ঘোড়াপাখিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইসমাইল হোসেন জানান, ৩শ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ফসলের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩০টি পরিবারকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে এবং আরও চাহিদা দেওয়া হয়েছে। উজিরপুর ইউনিয়নের বেশীর ভাগ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। ফসলের ক্ষতি হয়েছে প্রচুর।

তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহিদুল ইসলাম বলেন, বুধবার হতে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা এপর্যন্ত পদ্মা নদীতে ২২.২৩ সেন্টিমিটার ও পাগলা নদীতে ২০.২৩সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বিপদ সীমার ১২ সেন্টিমিটার নিজ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তবে দু-একদিনের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে জানান তিনি।

শিবগঞ্জ উপজেলা পরিকল্পনা অফিসার আরিফুল ইসলাম জানান, সার্বক্ষণিক পানিবন্দি জনগণের সেবায় নিয়োজিত রয়েছি। শিবগঞ্জ উপজেলায় এ পর্যন্ত ৮হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। ১৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। 

উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার আব্দুল মান্নান বলেন, 'এ পর্যন্ত কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি। তবে ২২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা যেতে না পারায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।'

প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার আরিফুল ইসলাম আরও জানান, 'এ পর্যন্ত ৫২ মেট্রিক টন চাল ও অন্য শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।'

তিনি আরও বলেন, 'এ পর্যন্ত আড়াই হাজার হেক্টর জমির মাসকলাই, ২৩০ হেক্টর জমির সবজি ও ৯৩ হেক্টর জমির হলুদ পানির নিচে তলিয়ে গেছে।'

কিন্তু শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আমিনুজ্জামান জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ৩ হাজার ৯শ হেক্টর জমির মাসকলাই, ২শ ৪৫ হেক্টর জমির সবজি, ৯৫ হেক্টর জমির হলুদ, ৫৭ হেক্টর জমির কলা ও ৩৫হেক্টর বোরো ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা ত্রাণ কমিটির সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, 'সংশ্লিষ্ট বিভাগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে আরও ত্রাণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে আবেদন করা হয়েছে। 

৪৩ চাঁপাইনবাবগঞ্জ ১ শিবগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য ডাক্তার সামিল উদ্দিন আহমদ শিমুল বলেন, 'আমি ইতিমধ্যে শিবগঞ্জের বন্যা ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছি। গত দুদিনে পরিবার প্রতি ১০ কেজি করে ৫২ মেট্রিক টন চাল, ৩ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত রোগীদের মাঝে ওষুধ বিতরণ করা হয়েছে।' 

আরও পড়ুন: নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে রাবির সেই উপ-উপাচার্যের সংবাদ সম্মেলন

তিনি আরও বলেন, 'যেহেতু আমি নিজেই একজন ডাক্তার, সেহেতু বন্যা কবলিত মানুষের সেবা নিজেই করবো। তাছাড়া বন্যা কবলিত মানুষের জন্য সব ধরনের সাহায্য দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছি।'

ইত্তেফাক/নূহু