শফিকুর রহমান রয়েল
নিশ্চিত জেনেই হোক বা সাহস করেই হোক, সবার প্রথমে কথাটি উচ্চারিত হয়েছিল গ্রামীণ ব্যাংকের তত্কালীন সর্বেসর্বা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মুখে— এমন দিন আসবে, যখন এই বাংলাদেশেই দরিদ্র লোক খুঁজতে গিয়ে জাদুঘরে যাওয়ার প্রয়োজন হবে। এ কথা শোনার পর তখন অনেকে হাসি-তামাশা পর্যন্ত করেছে। কিন্তু এখন তো সে কথাই ঘুরেফিরে ভিন্নভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। সর্বশেষ এ বিষয়ে বলেছেন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। তার দেওয়া বক্তৃতা অনুসারে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই এ দেশের জিডিপি ডাবল ডিজিটে পৌঁছুবে, যে চমকটা দীর্ঘদিন দেখানোর পর চীন আজ বিশ্ব অর্থনীতির দ্বিতীয় পরাশক্তি এবং দারিদ্র্যকে জানিয়েছে গুডবাই। ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও যে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে যাবে, এমন কথা এখন সর্বত্রই বেশ জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং এডিবি’ও তাতে সুর মেলাচ্ছে। তথ্য-উপাত্ত সহকারে তারা যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, সেই রিপোর্টের সারমর্মটা অবশ্য একটু ভিন্ন— ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেবে সত্য; তবে দারিদ্র্য নয়, চরম দারিদ্র্য। শুধু দরিদ্র আর একেবারে হতদরিদ্রের ফারাকটা বুঝলে বলার পাশাপাশি মানতেও হবে দারিদ্র্যকে না হলেও চরম দারিদ্র্যকে বিদায় জানানোর সময় আসতে খুব একটা দেরি নেই। একেবারেই সহায়-সম্বলহীন লোক দেখা না যাওয়ার সম্মান অর্জন এখন শুধু কয়েকটা বছরের ব্যাপার। এর পরের ধাপে হয়তো মূলোত্পাটিত হয়ে যাবে দারিদ্র্যেরও। তার মানে ক্রমান্বয়ে এখন কেবল সামনের দিকেই এগোবে অদম্য বাংলাদেশ। স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো কিছু না ঘটলে অর্থনীতির সঠিক ট্র্যাকে থেকেই পৌঁছুতে থাকবে নির্ধারণ করা একের পর এক গন্তব্যে।
বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক ধারা নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাদের প্রাক্কলন স্পষ্টভাবেই বলে দিচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ চরম দারিদ্র্য দূরীকরণে ঠিকভাবেই অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে পোভার্টি অ্যান্ড শেয়ারড প্রোসপারিটি ২০১৮: পিসিং টুগেদার পেভার্টি পাজল শিরোনামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখিয়েছিল, ২০১৫ সালে গোটা বিশ্বে চরম দরিদ্র লোকের মোট সংখ্যাটা ছিল ৭৩৬ মিলিয়ন। এর অর্ধেক অর্থাত্ ৩৬৮ মিলিয়ন লোকের বাস ছিল মাত্র পাঁচটি দেশে, আর সেই দেশগুলো হলো— ভারত, নাইজেরিয়া, কঙ্গো, ইথিওপিয়া ও বাংলাদেশ। সেই রিপোর্টে সারা বিশ্বের মোট চরম দরিদ্র জনসংখ্যার মাত্র ৩ শতাংশের ঠিকানা ছিল বাংলাদেশ। বাকি চারটি দেশের মধ্যে ভারত, নাইজেরিয়া, গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো ও ইথিওপিয়ায় ছিল যথাক্রমে ২৪, ১২, ৭ ও ৪ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞানুযায়ী ১.৯০ মার্কিন ডলারেরও কম বা কিংবা তার সমপরিমাণ অর্থ খরচ করে যারা দিন পার করে তারাই পড়ে চরম দরিদ্রের কাতারে।
বাংলাদেশ পারলেও ২০৩০ সাল নাগাদ ভারত চরম দারিদ্র্যকে নির্মূল করতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ২০১৫ সালে ১৭০ মিলিয়ন দরিদ্র লোক থাকা ভারত ২০৩০ সাল নাগাদ চরম দরিদ্র লোকের সংখ্যা যথেষ্টই কমাবে, তবে সেটি হয়তো বাংলাদেশের গতিতে নয়। এখন পর্যন্ত বিশ্বের মোট চরম দরিদ্র জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশেরই বসবাস আমাদের প্রতিবেশী বৃহত্ রাষ্ট্রটিতে। রিপোর্টে দেখানো হয়েছে নাইজেরিয়া, গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো ও ইথিওপিয়ায় চরম দারিদ্র্য কমিয়ে আনার বিষয়টি প্রায় স্থির। এটি আবার বৈশ্বিক অসম অগ্রগতির ইঙ্গিত, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ নয়। ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হার ৩ শতাংশেরও নিচে নামিয়ে আনাটা বৈশ্বিক লক্ষ্য। সে বিচারে উল্লিখিত পাঁচটি দেশে ওই কাতারের লোকসংখ্যার ব্যাপক হ্রাস যে কোনো বিচারেই গুরুত্বপূর্ণ, এই অভিমত বিশ্ব ব্যাংকের।
দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে প্রতি পাঁচ জন চরম দরিদ্র লোকের চার জনেরই বসবাস ভারতে। দারিদ্র্যের হার ১৩.৫ শতাংশ তো আছেই ১৩০ কোটি মোট জনসংখ্যাও অতি দরিদ্র লোকের পরিমাণ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট আরো বলছে, বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া ও নাইজেরিয়াসহ উচ্চ দারিদ্র্য হারের অনেক দেশই নিম্ন আয়ের দেশের পরিচিতি থেকে বেরিয়ে মধ্য আয়ের দেশে রূপ নেওয়ার রাস্তায় রয়েছে। এসডিজির একটি প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ২০৩০ সাল নাগাদ সব রকম ও আঙ্গিকের দারিদ্র্যকে একেবারেই দূর করে দেওয়া। জিডিপি ও মাথাপিছু আয় যেভাবে বাড়ছে তাতেই দারিদ্র্যের জাল থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা থেকে যায়। তার ওপর যদি ডাবল ডিজিটের জিডিপি প্রবৃদ্ধি যোগ হয় তাহলে সাহস করে যদি বলেই দেওয়া হয়, হ্যাঁ আমরা অদূর ভবিষ্যতেই দারিদ্র্য কী জিনিস, তা ভুলে যাওয়ারই উপক্রম হবে আমাদের। তবে তা মোটেও বাড়াবাড়ি হবে না। মাথাপিছু জিডিপি ও আয়ের প্রশ্নে পাকিস্তানকে এরই মধ্যে পেছনে ফেলেছি। ডাবল ডিজিটের জিডিপি ঘটলে ভারতকে পেছনে ফেলাও কঠিন কোনো বিষয় নয়। ভালো থাকা না থাকার অনেক সামাজিক উন্নয়ন সূচকে এখনই আমরা তাদের চেয়ে এগিয়ে। বিভিন্ন প্রাক্কলন স্পষ্টতই বলে দিচ্ছে, ২০৩৩ সালে বাংলাদেশ হবে পৃথিবীর চব্বিশতম বৃহত্ অর্থনীতির দেশ। তখন নাগাদ চরম দারিদ্র্যের পাশাপাশি দারিদ্র্যেরও সম্ভাবনা রয়েছে অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার এবং এটিকে তখন কিছুতেই বলা যাবে না অস্বাভাবিক।