অয়েজুল হক
হারুন সাহেব হাসতে পারছেন না। কী একটা কারণে তিনি গম্ভীর হয়ে আছেন। কেউ হাসলে বা হাসির কথা বললে তার মুখে বিতৃষ্ণা, বিরক্তি ফুটে ওঠে। হাসি থামাতে কখনো কখনো জোরালো ইংরেজি শব্দ ‘শাট আপ’, ‘স্টুপিড’ ব্যবহার করছেন। রিনা বেগম প্রথম স্বামীর এই না হাসা রোগ আবিষ্কার করেন। ভার্সিটিপড়ুয়া মেয়ে শম্পার কাছে এ রোগের কথা প্রকাশ করতে গিয়ে ফিসফাস করে বলেন, ‘এই শম্পা।’
—হু।
—তোর বাবার না-হাসা রোগ হয়েছে। আমি বিগত একমাসের বেশি তাকে হাসতে দেখিনি।
বাবার হয়েছে না-হাসা রোগ আর শম্পা মেয়েটার হয়েছে হাসি রোগ। কারণে অকারণে একটু পরপর ক্যাঁকক্যাঁক করে হেসে ওঠে। রিনা বেগমের গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনে সে ক্যাঁকক্যাঁক করে হেসে উঠল।
—তুই হাসছিস!
—হু।
—তোর বাবার জন্য এতটুকু ভালোবাসা নেই। বেচারা হাসে না। মুখ গম্ভীর করে দিনরাত বসে থাকে।
—কিছু হাসি কিনলেই তো পার।
—হাসি কেনা যায়!
শম্পা কিছুক্ষণ হেসে বলল, ‘তোমার ভবঘুরে ভাগ্নে লিটনকে ফোন দিয়ে দেখতে পার। আমার মনে হয় সে হাসি বিক্রি করতে পারে।’
শম্পার কথায় রিনা বেগম কিছুটা খুশি হয়েছেন বলে মনে হলো। মোবাইল এনে লিটনকে ফোন করেন, ‘হ্যালো লিটন।’
—হু।
—তুই কী হাসি বিক্রি করিস?
—কী বলছ খালা? হাসি বিক্রি! ঠিক বুঝলাম না।
—মানে তোর খালু দীর্ঘদিন হাসেন না। মুখ গম্ভীর করে বসে থাকেন। হাসি তার সহ্য হয় না। কাউকে হাসতে দেখলে রেগে যান। চিত্কার করেন।
—ঠিক হয়ে যাবে।
—সত্যি!
—আমি কাল-পরশু আসছি। ওনার না-হাসা রোগ ভালো করে দেব। তুমি একদম চিন্তা কোরো না।
শম্পা ক্যাঁকক্যাঁক করে হাসে।
কথার ভেতর হারুন সাহেব উপস্থিত। গম্ভীর গলায় বললেন, ‘এই ক্যাঁকক্যাঁক করে মুরগির মতো হাসে কে?’
শম্পা হারুন সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘বাবা মুরগি কি হাসতে পারে?’
হারুন সাহেব রেগে ওঠেন। চোখ দুটো লাল হয়ে ওঠে। গম্ভীর গলায় বলেন, ‘আমি হাসি দেখতে পারি না। হাসির শব্দ সহ্য করতে পারি না। আমার বাড়িতে একদম হাসাহাসি চলবে না।’
হারুন সাহেবের ধমক আর লাল চোখে নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে সারাদিনের হিসাব করে লিটন। এক. পত্রিকা অফিসে গিয়ে একটা বিজ্ঞাপন দিতে হবে। দুই. হাত খরচ বাবদ কিছু টাকা না হলে চলবে না। আপাতত নাসিম সাহেব ভরসা। তিন. মেসের বকেয়া তিন মাসের ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে হবে। সেটা নির্ভর করছে হারুন সাহেবের হাসির ওপর।
একটা ছোট কাগজে লেখা শুরু করে, ‘প্রিয় ভাইসব, বোনসব। আমার নাম হারুন। আমি একজন না হাসা রুগী। হাসতে পারি না। হাসি দিবসে কিছু হাসি কী বিক্রয় হবে? আমি হাসি কিনতে চাই। বিনীত, অভাগা না-হাসা হারুন। মোবাইল নম্বর...’
কাগজ পকেটে পুরে বের হতেই নাসিম সাহেবের সঙ্গে দেখা। তার প্রেমিকা জেমির সঙ্গে সম্পর্ক ছুটে গেছে বলে বিষণ্ন।
লিটন মুচকি হাসে। বিভ্রান্তির হাসি। ‘আজ ফোন করবে।’
—কে?
—জেমি। দাঁত কেলিয়ে আপনাকে হাসি দিবসের শুভেচ্ছা জানাবে।
নাসিমের মুখটা উজ্জ্বল হলো। সে হয়তো লিটনের কথা বিশ্বাস করেছে। জেমি ফোন না করুক, মানুষটা যে একটু খুশি হলো এটাই বা কম কী।
—শ পাঁচেক টাকা হবে ভাই?
নাসিম সাহেব দেরি করেন না। পকেট থেকে পাঁচশত টাকার একটা নোট গুঁজে দেন। টাকা না দিলে যেন জেমি ফোন করবে না এমন একটা ভাব।
টাকা নিয়ে লিটন বেরিয়ে পড়ে। পত্রিকা অফিসে লিখিত কাগজ বিজ্ঞপ্তি হিসেবে প্রকাশের জন্য অনুরোধের পরে মিরপুরের দিকে যাত্রা শুরু করে। রিনা খালার বাসায় যেতে হবে। হারুন সাহেবকে হাসানোর মহান দায়িত্ব পড়েছে তার ঘাড়ে। হঠাত্ রিকশা দাঁড়িয়ে যায়। ঢাকা শহরে এই একটা বিপদ। কিছুদূর যেতে না যেতেই থমকে দাঁড়াবে গাড়ি, রিকশা। জ্যাম। বড়ো বিরক্তিকর হলেও বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। আশপাশে বাস-গাড়ির প্যাঁপুঁ শব্দে কান ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা। হঠাত্ খট শব্দে বাসের জানালা থেকে মুখ বের করে উনিশ-কুড়ি বছরের তরুণী। ফর্সা মায়াবী চেহারা। বড়ো বড়ো চোখ। লিটন হা করে কিছুটা উপরে বাসের জানালার দিকে তাকিয়ে। আহা কী সুন্দরী মেয়ে! ভাবনা শেষ হওয়ার আগেই হড়বড় করে বমি। সবটুকু লিটনের মাথা-মুখে। একবার দুইবার। লিটন চিত্কার করে, ‘দোহাই লাগে...।’ তৃতীয়বারের কিছু তীব্র গন্ধযুক্ত তরল পদার্থ মুখের ভেতর চলে যায়। ঢোঁক গেলা যাবে না। পানি দরকার। সেই থেকে বিশ মিনিট হলো বসে আছে। বমি গোসল হয়ে বসে থাকা। রিকশা ড্রাইভার বেজায় খুশি। একজন মানুষের গা ভরে উত্কট গন্ধের বমি ঢেলে দিলে যেন বিরাট খুশি হতে হয়। চিড়িয়াখানায় একজন শিশু যেভাবে কৌতূহল নিয়ে বাঘ, সিংহ দেখে একটু পরপর সেভাবে লিটনের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাচ্ছে। লিটনের রাগ হলেও কিছু বলতে পারছে না।
—ভাইসাব খুব গন্ধ বেরোচ্ছে। কড়া বমি। মানুষের মাথায় ঢালতে হলে এ রকম বিষ মার্কা বমিই ঢালা উচিত।
লিটন থ মেরে আছে। কথা শুনে বেচারা ড্রাইভারকে লাথি মেরে ড্রেনের ভেতর ফেলে দিতে ইচ্ছা করে। এই মুহূর্তে সে কাজটাও করা যাবে না। দ্রুত রিনা খালার বাসায় পৌঁছাতে হবে।
রিনা খালার বাসায় পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে যায়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডোরবেল চাপতেই দরজা খুলে যায়। রিনা বেগম। লিটনকে দেখে চমকে ওঠেন। নাক চেপে বলেন, তোর এই অবস্থা কেন! সেফটিক ট্যাঙ্কিতে ডুব দিয়ে এসেছিস নাকি!
—আর বলো না, বাসের জানালা দিয়ে এক মেয়ে আমার গায়ে হড়বড় করে ঢেলে দিল।
রিনা বেগম বলেন, ‘তাড়াতাড়ি বাথরুমে যা। সাবান, শ্যাম্পু সব আছে। পুরো একঘণ্টা গোসল করবি।’
লিটন প্রবেশ করার পর থেকেই হারুন সাহেবের মেজাজ খারাপ। বদমাশটা বাড়িতে আস্তানা গেড়ে বসেছে। ভাবখানা এমন সে যেন এ বাড়ির বড়কর্তা। একটা জোচ্চোর ছেলে বাড়িতে ঢুকে হুলস্থূল করছে। তার সঙ্গে স্ত্রী রিনা, মেয়ে শম্পা এক নাগাড়ে ক্যাঁকক্যাঁক করে হাসছে। সহ্য করতে না পেরে হারুন সাহেব ধেয়ে আসেন, ‘এই কী হচ্ছে বাড়িতে? এইটা কী ক্লাব নাকি?’
লিটন মুচকি হাসে। কিছু হাসি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। কেউ কড়া গলায় ধমক দিলে বিচলিত না হয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে মুচকি হাসি দেওয়া কঠিন। ধমকানো লোক ঘোরের ভেতর পড়ে যান। অবশ্য হারুন সাহেবের বেলায় সেটা ঘটল না। তিনি আরো রেগে বললেন, ‘এই জোচ্চর হাসছিস কেন? আমি হাসি দেখতে পারি না। হাসির শব্দ সহ্য করতে পারি না। একদম হাসবি না।’
—এটা তো একটা রোগ। আমি তো আপনার চিকিত্সার জন্য এসেছি।
—এই ছাগল তুই কী ডাক্তার নাকি?
—রিনা খালা আসেন ওনাকে ধরে কাতুকুতু দিই। কাতুকুতু দিলে স্নায়ু উদ্দীপ্ত হবে এবং মস্তিষ্ক সচল হওয়ার ফলেই তিনি হাসবেন। সাধারণত, শরীরের যে অংশগুলিতে হাড় থাকে না, সেই অংশগুলোতে কাতুকুতুর অনুভূতি বেশি হয়। যেমন পেটের পাশে বা নিচে অথবা পায়ের পাতার নিচে। ছয়টা হাতে ওনাকে বিশ মিনিট একভাবে কাতুকুতু থেরাপি দেওয়া হবে। লিটন শুরু করতেই রিনা বাঘের মতো হামলে পড়ে। তারপর শম্পা।
অল্পসময়। হারুন সাহেব খিলখিল করে হাসতে শুরু করেন। কুড়ি মিনিট পর হারুন সাহেবকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েন। লিটন বলল, ‘খালা, হাসা যখন শুরু করেছেন আর থামবেন বলে মনে হয় না।’
সন্ধ্যা নামতেই হারুন সাহেবের মোবাইলে একের পর এক ফোন আসতে শুরু করে। রিসিভ করলেই ওপ্রান্তে হাসির শব্দ। হাসি দিবসের শুভেচ্ছা। হাসি ক্রয় করবেন? আমার হাসিটা ভালো না? হাসি বিক্রয় হবে। সবার প্রায় একই কথা। কথা শেষ করতে না করতে আবার ফোন। আবার। হারুন সাহেব কিছু বুঝে উঠতে পারেন না।
‘হাসি দিবসের শুভেচ্ছা।’ মায়াবী মিষ্টি গলার এক মেয়ে। হারুন সাহেব ভারী গলায় বলেন, ‘কিসের হাসি দিবস! তোমাকে তো চিনতে পারলাম না।’
—আমাকে তো চেনার কথা না। আমি হাসি বিক্রয় করব।
—বি ক্রয় না করে এ ক্রয় করা যায় না?
—আপনি কিনবেন না?
—না কিনা উপায় আছে! জোর যার মুল্লুক তার। মুল্লুকটা দিন দিন ভাল্লুক হতে চলেছে।
কথা শেষ করে হারুন সাহেব সাহেব হাসতে হাসতে নিজের রুম ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। হাসিমুখে ডাকেন, ‘রিনা, শম্পা।’
লিটন, রিনা, শম্পা তিনজন পাশের রুমে গল্প করছিল। রিনা স্বামীর হাসিমুখ দেখে অবাক হলো। মায়া নিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে গো?’
—একের পর এক ফোন আসছে। লাইন দিয়ে মানুষ হাসি দিবসের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। সবাই হাসি বিক্রি করতে চায়। এই আজ কী হাসি দিবস নাকি? হাসি দিবসে সবাই হাসি বিক্রয় করতে চাচ্ছে কেন রে?
কথা শেষ করেই গাল ভরে হোঃ হোঃ করে হেসে
ওঠেন। g