আবুল বাশার মিরাজ
ভালো বীজ আর কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে পাল্টে যাচ্ছে কৃষকের জীবন। আর এই কৃষি প্রযুক্তি বিস্তারে কাজ করে যাচ্ছেন সদ্য অবসরে যাওয়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) পরিচালক কৃষি বিজ্ঞানী ড. এ কে এম জাকারিয়া। অবসরে গিয়েও তিনি তার গবেষণা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্মানী পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন তার নিজ প্রতিষ্ঠানেই।
ড. জাকারিয়া বলেন, ‘২০০২ সালে মারিয়া গ্রাম থেকে ফিরে আমার কর্মস্থল আরডিএ এসে ভাবতে থাকি। কীভাবে এসব কৃষকদের সাহায্য করা যায়। এভাবে জমি ফেলে রাখলে কিংবা ফসল খারাপ হলে তো দেশের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। কিছুদিন পর আবার গেলাম ওই গ্রামে। ওদের সমস্যাগুলো আগ্রহ নিয়ে শুনলাম। যা বুঝলাম ভালো বীজ না থাকার কারণেই মূলত তারা ফসল ফলাতে পারছেন না। এ কারণে দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে এদের জীবন। এরপর লেগে গেলাম কাজে। এই কৃষকদের বীজের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে কী করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে লাগলাম। আবার ভাবলাম, কেবল গবেষণা করলেই হবে না, বীজ-প্রযুক্তি যদি এই গরীব কৃষক ভাইদের কাছে সহজে পৌঁছে না দিতে পারি তাহলে আমার গবেষণা বৃথা যাবে। বছর দুয়েক পর একটি পূর্ণাঙ্গ মডেল দাঁড় করলাম। আমি চেষ্টার করেছি ওদের কোনো গ্রামীণ উদ্ভাবন কাজে লাগিয়ে উদ্বুদ্ধ করবো। এতে সেটি গ্রহণ করা তাদের জন্য সহজ হবে। আমি তাই করেছি। আমি কেবল সায়েন্টিফিক বিষয়টি এটিতে যুক্ত করেছি। কীভাবে ভালো বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে প্রতিটি পরিবার পরিণত হতে পারে। একটি ‘বীজ ব্যাংক’ই ছিল আমার গবেষণার প্রধান লক্ষ্য। মারিয়া গ্রামের জন্য তো বটেই, আমার নিজের জন্যও সুখবর বলা যায়। কারণ সেসময় এ গবেষণায় সহযোগিতা করতে এগিয়ে এলো আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনিস্টিটিউট (ইরি) এবং পরবর্তীতে আসে আইএফসি ও ড্যানিডা। কৃষি মন্ত্রাণালয় থেকেও সহযোগিতা পেলাম। তখন আবার চলে গেলাম মারিয়া গ্রামে। যেহেতু এ গ্রামের লোকেরা প্রযুক্তিটি উদ্ভাবন ও বিস্তারে শুরু থেকে আকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন, তাই তাদের সম্মানে এ প্রযুক্তিটির নাম দিলাম ‘মারিয়া বীজ প্রযুক্তি’ মডেল।
ড. জাকারিয়া বলেন, ‘বহির্বিশ্বেও এখন মারিয়া মডেল প্রযুক্তিটি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রযুক্তিটি দেখতে দেশ-বিদেশের কয়েক হাজার উচ্চপর্যায়ের লোক ও প্রশিক্ষার্থীরা এ গ্রামে এসে হাতে কলমে কীভাবে বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা যায় তা গ্রামের নারীদের কাছ থেকে শিখে যান। এমনকি আরডিএতে যত ধরনের প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয় তাতেও প্রযুক্তিটি শেখানোর ব্যবস্থা থাকে। এজন্য আমি আরডিএর মহাপরিচালক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ দিতে চাই। গতবছর সার্কভুক্ত ৮টি দেশের ৪৫ জন প্রতিনিধি প্রশিক্ষণ নিতে এখানে এসেছিলেন। এর আগে কম্বোডিয়া থেকেও ৩০ জনের একটি দলকে এ প্রযুক্তি সম্পর্কে জানাতে প্রশিক্ষণ দিয়েছি আমরা। এশিয়ান ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের ওয়েবসাইটে মারিয়া বীজ প্রযুক্তি মডেলকে সফল ফার্মারস বীজ ব্যাংক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বলতে গেলে, প্রযুক্তিটির বিস্তারে আমাদের এখন কিছুই করতে হয় না। বর্তমানে এ গ্রামের প্রতিটি পরিবারই এক একটি বীজ ব্যাংকে পরিণত হয়েছে। তারাই দেশি-বিদেশিদের প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষমতা অর্জন করেছে। এটি শুনে আমার কাছে খুবই ভালো লাগে যে, এ গ্রামের নারীরা এক একজন নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে ভালো বীজ বিক্রি করে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করছেন। এমনকি এ বীজ অঙ্কুরোদগম থেকে শুরু করে উত্পাদন ও গুণগতমা সরকার ঘোষিত বীজমানকেও স্পর্শ করতে সক্ষমতা অর্জন করেছে। বর্তমানে এই মডেলটি বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশ, যেমন পশ্চিম আফ্রিকার ৮টি দেশে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও নেপালে প্রযুক্তিটি ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হচ্ছে।’
কৃষিবিজ্ঞানী ড. জাকারিয়ার আরেকটি অন্যতম কাজ হলো চর ডেভেলাপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (সিডিআরসি) প্রতিষ্ঠা করা। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চরাঞ্চলের কৃষির অন্যতম প্রতিবন্ধকতা ছিল কৃষিপণ্যের যথাযথ বিপণন ব্যবস্থা না থাকা। এখানকার কৃষকরা অনেক কষ্ট করেই কৃষিপণ্য উত্পাদন করেন। কিন্তু একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্যে তারা ফসল উত্পাদন করেও সুবিধা করতে পারতেন না। আবার চরে কোন কোন ফসল ফলানো যেতে পারে তা নিয়েও চরাঞ্চলের মানুষের তেমন জ্ঞান ছিল না। এটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিভিন্নভাবে আমরা তাদের পাশে থেকে চরের কৃষিজ উত্পাদন বাড়াতে সক্ষম হয়েছি। প্রকৃতপক্ষে সিডিআরসি একটি সরকার অনুমোদিত উন্মুক্ত প্লাটফর্ম। যেখানে যে কেউ চর নিয়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ করতে চাইলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হয়ে থাকে।’
মারিয়া বীজ প্রযুক্তি, ভুট্টা বীজের প্রটোকল উদ্ভাবন কিংবা সিডিআরসি প্রতিষ্ঠাতা ছাড়াও অসংখ্য গবেষণা রয়েছে ড. জাকারিয়ার। দেশে কম সেচে ফসল ফলানোর যে প্রযুক্তি সেটিও তার হাতে তৈরি। জৈব বালাইনাশক তৈরিতে তিনি টাইকোড্রার্মা ছত্রাক নিয়েও কাজ করেছেন। এছাড়াও তিনি গ্রামে ঘুরে ঘুরে কোন ফসলের কী চিকিত্সা তা দিয়ে বেড়ান। তার উদ্যোগেই বগুড়ার শাহজাহানপুরে পরীক্ষামূলকভাবে বেশ কয়েকটি গ্রামে ‘পল্লী ফসল ক্লিনিক’ তৈরি করা হয়েছিল। এ কারণে তিনি কৃষকদের কাছে ‘ফসলের ডাক্তার’ নামেই বেশি পরিচিত।