একটি সাজানো জনপদ গড়ে ওঠার গল্প

ইসমাইল মাহমুদ

 

গ্রামের নাম মোহাজেরাবাদ। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৬নং আশীদ্রোণ ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্তবর্তী গভীর অরণ্যে গ্রামটির অবস্থান। সরকারি খাস জমি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে তিলতিল করে গড়ে ওঠা গ্রামটি জেলার সর্ববৃহত্ ফলদ গ্রাম। এ গ্রামে উত্পাদিত লেবু, আনারস, কাঁঠাল এলাকার চাহিদা মিটিয়ে প্রেরণ করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। গভীর অরণ্যের এ গ্রামটির বাসিন্দাদের মৌসুমী ফল বিক্রির অর্থে গ্রামটিতে চলছে শিক্ষা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া সংগঠনের কর্মকাণ্ড। আজ থেকে প্রায় ৯ দশক পূর্বে বন্যপ্রাণী ও প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধ করে তৈরি করা এ গ্রামীণ জনপদের মানুষ এখনো প্রতিনিয়তই যুদ্ধ করে চলেছে। দিন বদলের ছোঁয়া লাগা গভীর অরণ্যের গ্রাম মোহাজেরাবাদে সরকারি-বেসরকারি অর্থায়নে এরইমধ্যে গড়ে ওঠেছে ১টি উচ্চ বিদ্যালয়, ১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১টি রেজিস্ট্রার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১টি কমিউনিটি ক্লিনিক, ১টি হাফিজিয়া মাদ্রাসা, ৩টি মক্তব ও ৩টি মসজিদসহ অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। গ্রামে যাতায়াতের রাস্তা পাকাকরণ করা হয়েছে। গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিকটি জেলার সর্বপ্রথম কমিউনিটি ক্লিনিক। শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সীমান্ত ও পাহাড়ি এ গ্রামের মানুষ এখন আধুনিক জীবনের ছোঁয়া পাচ্ছেন। সুযোগ হয়েছে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের। গ্রামের বাড়িতে জ্বলছে সৌরবিদ্যুত্ ও পল্লী বিদ্যুতের আলো। গ্রামের যুবকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আলাদীনের জাদুর চেরাগের মতো কয়েক বছরের ব্যবধানে পাল্টে গেছে গ্রামটির আদি চেহারা। গ্রামের বাসিন্দাদের জীবনে দেখা দিয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন।

শ্রীমঙ্গলের লেবু-আনারসের তীর্থক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত গভীর অরণ্যের মোহাজেরাবাদ গ্রামে এরইমধ্যে ডিস সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। ফলে গ্রামের মানুষ দেশ-বিদেশের খবরাখবর জানতে পারছেন। গত এক দশক পূর্বেও এ গ্রামের মানুষ টেলিভিশন দেখার সুযোগ পাননি। এখন গ্রামে অনেক পরিবারে চলছে রঙিন টেলিভিশন। গ্রামের যে অংশে বিদ্যুত্ নেই সে অংশের প্রায় অর্ধশতাধিক বাড়ি আলোকিত হয়েছে সৌরবিদ্যুতের আলোয়। গ্রামের মানুষ হয়ে উঠেছেন কর্মচঞ্চল। ২০০৯ ও ২০১০ সালে এ গ্রামের দিনমজুরের ছেলে মাহফুজুর রহমান ও বাগান মালিকের ছেলে তোফাজ্জল হোসেন রায়হান মোহাজেরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। গ্রামের বাসিন্দাদের অনেকেই আজ দেশ-বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। এত পূর্ণতার মাঝেও গ্রামের বাসিন্দাদের অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাসও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। গ্রামে বিশুদ্ধ জল ও সেচ ব্যবস্থার সমস্যা প্রকট। সেচের অভাবে ফসল ফলানো অনেকটা অসম্ভব। এছাড়া মোহাজেরাবাদ থেকে হোসেনাবাদ চা বাগান রাস্তার অবস্থা একেবারে অথৈবচ। সেইসঙ্গে বারবার গ্রামটি দখলে নেওয়ার চেষ্টাকারী ভূমি লোভী প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু তো রয়েছেই।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্য থেকে ৮টি পরিবার, ১৯৫৪ সালে ১১১টি পরিবার ভারতীয় সীমান্তবর্তী গভীর এ পাহাড়ে এসে পাহাড়ের ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করে বাঘ-ভাল্লুকের সঙ্গে যুদ্ধ করে এখানে খাস জমিতে বসতি স্থা্পন করে। এ পরিবারগুলো জীবিকানির্বাহের জন্য কৃষিজ পণ্য চাষ, বিশেষ করে লেবু ও আনারস চাষ করা শুরু করেন। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে মোহাজেরাবাদ গ্রামের মো. তাজুল ইসলামসহ অনেকেই দেশ মাতৃকাকে রক্ষা করতে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যুদ্ধকালীন সময়ে সীমান্তের মোহাজেরাবাদ গ্রামটি মুক্তিসেনাদের অন্যতম ঘাঁটিতে পরিণত হয়। গ্রামের সাধারণ মানুষ বিশেষ করে এ গ্রামের নারীরা মুক্তিসেনাদের খাবার সরবরাহ থেকে শুরু করে সব কাজে সার্বিক সহায়তা প্রদান করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে মোহাজেরাবাদ গ্রামের সাধারণ মানুষের অবদান এখনো শ্রীমঙ্গলবাসী কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৪ শতাধিক পরিবারের আবাসস্থল মোহাজেরাবাদ গ্রামের ভোটার রয়েছেন দেড় সহস্রাধিক। এ গ্রামটি বর্তমানে একটি পরিপূর্ণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী গ্রাম হিসেবে পুরো জেলায় পরিচিতি লাভ করেছে।

জানা গেছে, এক সময় পুরো গ্রামের মানুষ দারিদ্রতার কাছে ছিল নতজানু। ১৯৯০ সালে স্থানীয় যুবকরা ‘সমাজ প্রগতি সংস্থা’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলেন। এ সংগঠনের সহায়তা এবং গ্রামের মানুষদের কর্মচাঞ্চল্যতায় গ্রামটির চেহারা বদলাতে থাকে প্রতিনিয়ত। এখন গ্রামের মানুষ উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। দিন বদলের ছোঁয়া এ গ্রামে লেগেছে ব্যাপকভাবে। এক সময় মোহাজেরাবাদ গ্রামে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। এখন এখানে শিক্ষিতের হার ৯৫ শতাংশ। এ গ্রামের অনেক বাসিন্দা এখন সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত। পাল্টে যাচ্ছে গ্রামটির চেহারা, পাল্টে যাচ্ছে এ গ্রামের বাসিন্দাদের দিনকাল।