ট্রাম্পের ভাগ্য রিপাবলিকানদের হাতে!

তালেব রানা

 

আড়াই বছর আগে এক অকল্পনীয় জয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছেন তিনি। ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের বিষয়ে প্রায় ২১ মাসের তদন্ত শেষে ট্রাম্পকে ইমপিচ করার মতো যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ পায়নি ডেমোক্র্যাটরা। যদিও এ বিষয়ে এখনো কয়েকটি তদন্ত চলছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ওঠা সর্বশেষ অভিযোগটি অনেক বেশি গুরুতর! ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে বিদেশি শক্তির সাহায্য নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে ট্রাম্পকে অভিশংসনের জন্য এই অভিযোগের আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে ডেমোক্র্যাট পার্টি।

গত ২৫ জুলাই ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনে আলাপ করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার ঘনিষ্ঠ এক ‘হুইসেলব্লোয়ার’ এই ফোনালাপ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেন। সম্প্রতি প্রকাশ করা হুইসেলব্লোয়ারের ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউজ এই ফোনালাপের বিস্তারিত কিছু আড়াল করতে চেয়েছিল। ঐ ‘হুইসেলব্লোয়ার’ আরো অভিযোগ করেন যে ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অন্য দেশের হস্তক্ষেপের জন্য নিজের কার্যালয়ের ক্ষমতাকে ট্রাম্প ব্যবহার করেছেন। আগামী নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন এমন একজনের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য বিদেশি রাষ্ট্রকে চাপ দিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের এই কার্যকলাপ আইনের লঙ্ঘন, অপব্যবহার এবং ভয়াবহ সমস্যা।

এর আগে হোয়াইট হাউজের প্রকাশ করা দুই প্রেসিডেন্টের কথোপকথনের মেমোতে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার ছেলে হান্টারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে ইউক্রেনকে চাপ দিয়েছেন। বাইডেনের ছেলে হান্টার ইউক্রেনের এক জ্বালানি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। এই ফোনালাপের কয়েক দিন আগেই ইউক্রেনকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, এই সহায়তা বন্ধের মাধ্যমে ইউক্রেনকে চাপ দিয়েছেন ট্রাম্প। এ বিষয়ে এখন তদন্ত হচ্ছে।

ইউক্রেনের তদন্ত চলার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে বাইডেনের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্পের অভিযোগ, জো বাইডেন ও তার ছেলে হান্টার বাইডেন ইউক্রেন ও চীনের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক যোগাযোগে দুর্নীতি করেছেন। তবে এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ হাজির করেননি তিনি।

মার্কিন আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ রয়েছে। যদি দেখা যায়, প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ হুমকিতে পড়েছে, সে ক্ষেত্রে এটি প্রেসিডেন্টের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি চীনকে আহ্বান জানিয়ে নিজের জন্য আরো বিপদ ডেকে আনতে পারেন। কারণ ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন জো বাইডেন। যদিও বিতর্ক হচ্ছে ট্রাম্প এই আহ্বান জানিয়ে কোনো আইন ভেঙেছেন বা অভিশংসনের মতো অপরাধ করেছেন কি না, তা নিয়ে।

নির্বাচনে হস্তক্ষেপ এবং প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে তদন্ত জোরদার করেছে ডেমোক্র্যাটরা। ইতিমধ্যে হাউজ কমিটি সমন জারি করে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে নথিপত্র জমা দিতে বলেছে। যদিও সেই সময়ের মধ্যে কাগজপত্র দিতে ব্যর্থ হয়েছেন পম্পেও। হোয়াইট হাউজকে সমন জারি করে নথি দিতে বলা হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে আরো কিছু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সাক্ষীকে শুনানির জন্য ডাকা হবে। তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হলে হাউজের বিচার বিভাগীয় কমিটি একটি ইমপিচমেন্ট আর্টিকেল তৈরি করবে। এটি ঐ কমিটিতে পাশের পর হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে যাবে। সেখানে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। সেটি পাশ হলে এরপর সিনেটে যাবে। সিনেটররা জুরি হিসেবে অভিযোগ দেখবেন। এরপর তারা মতামত দেবেন। প্রেসিডেন্টকে অপসারণে দুই-তৃতীয়াংশ সিনেটরের সমর্থন লাগবে। যদিও রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটে এর সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ এখন পর্যন্ত হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে দুই জন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করা হয়েছে। কিন্তু সিনেটে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন না থাকায় তাদের পদ থেকে সরানো যায়নি। রিপাবলিকানদের মধ্যে দলীয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ক্ষোভ দেখা গেলেও তারা তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেবে কি না, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে অসম্ভবও কিছু নয়। তাই এই রিপাবলিকান সিনেটরদের হাতেই শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে ট্রাম্পের ভাগ্য।