তৌহিদ আজিজ
ইরাকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে গত কয়েক দিনে অর্ধশতাধিক নিহত ও বহু লোক আহত হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষে হতাহতের এ ঘটনা ঘটেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই হতাহতের পেছনে স্নাইপারদের গুপ্ত হামলাকেও দায়ী করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদেল মাহাদি সংকট নিরসনে সব পক্ষকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাত্ কেন উত্তপ্ত ইরাক? এর উত্তরে অনেকেই বলছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের সীমাহীন দুর্নীতি, অত্যন্ত নিম্নমানের সরকারি পরিষেবা, সর্বোপরি দেশটিতে বেকার সমস্যা চরম আকার ধারণ করায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, দারিদ্র্যের কশাঘাতে তাদের পিঠ এখন দেওয়ালে এসে ঠেকেছে। একশ্রেণির লোক সবকিছু লুটেপুটে খাচ্ছে আর সাধারণ মানুষ অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছে। তারা বলেন, চরম বেকারত্ব তাদের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। সরকারের পক্ষ থেকে যে ছিঁটেফোঁটা পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে, তা অত্যন্ত নিম্নমানের। এ অবস্থা বেশি দিন চলতে থাকলে সেখানে চরম মানবিক বিপর্যয় নেমে আসতে বাধ্য। তারা বলেন, তাদের দাবি-দাওয়া পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না। পরিস্থিতি যখন এতটা নাজুক, তখন সরকার রাজধানী বাগদাদে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করতে বাধ্য হয়েছে। সেই সঙ্গে সেখানে বন্ধ রয়েছে ইন্টারনেট সেবাও। কিন্তু তার পরও সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কমছে না।
সম্প্রতি বিক্ষোভকারীরা পুলিশের বেস্টনী ভেদ করে তাহরির স্কয়ারে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়। সরকারের ধারণা যে তাহরির স্কয়ারে তারা যেতে পারলে পরিস্থিতি আরো মারাত্মক আকার ধারণ করবে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, শুধু শুক্রবার ১০ জন নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে দুই জন পুলিশ কর্মকর্তাও রয়েছেন। তারা সবাই স্নাইপারের গুলিতে নিহত হয়েছে বলে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এদিকে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পালে হাওয়া লাগানোর চেষ্টা করছে প্রভাবশালী শিয়া নেতা মোকতাদার আল সদর। তিনি পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। মোকতাদার আল সদর সব ইরাকির দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পার্লামেন্ট বয়কট করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার এই বক্তব্যের পর ইরাক জুড়ে বিক্ষোভ পরিস্থিতি আরো মাত্রা পাবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। তবে শিয়া নেতার এই আহ্বানের পেছনে আরেকটি কারণ হচ্ছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় যেসব এলাকায় এই বিক্ষোভ হচ্ছে, তার বেশির ভাগই শিয়া অধ্যুষিত এলাকা। আর এ কারণেই তিনি সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছেন।
মূলত দেশটিতে দুর্নীতি এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে রয়েছে নিম্নমানের সরকারি পরিষেবা। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ যে বিষয়টি তা হচ্ছে, সেখানে বেকারত্ব অনেক বেড়ে গেছে। আর এতে করে ফুঁসে উঠছে তরুণ সমাজ। চাকরির অভাবে তারা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তাদের পুঞ্জীভূত এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশই হচ্ছে আজকের বিক্ষোভ। বিশ্বব্যাংকের ২০১৪ সালের হিসাবে বলা হয়েছে, দেশটিতে মোট জনসখ্যার ২২.৫০ শতাংশ লোকের দৈনিক গড় আয় ১.৯০ ডলারের নিচে। ছয়টি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবারে রয়েছে খাদ্যের চরম নিরাপত্তাহীনতা। গত বছর দেশটিতে বেকারত্বের হার ছিল ৭.৯ শতাংশ। তবে তরুণদের মধ্যে এই হার প্রায় দ্বিগুণ। বিশ্লেষকেরা বলছেন, জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের কারণে সেখানকার অর্থনৈতিক অবস্থা বেশি খারাপ হয়। আইএস দখলমুক্ত হলেও এখনো অনেক স্থানে জঙ্গিরা গোপনে আস্তানা গেড়ে আছে। বিশেষ করে মরু অঞ্চলে তাদের আনাগোনা বেশি বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এরই মধ্যে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই অবস্থায় ইরাক সংকট সত্যিকার অর্থে কতটা সমাধানের দিকে যাবে, তা এক কথায় বলা কঠিন। তবে পরিস্থিতি যদি সরকার সামাল দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে জঙ্গিরা। এতে করে সেখানে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে আইএস।