মা হ বু ব আ ল ম
করতোয়া নদীর বুক-পিঠে দাঁড়িয়ে থাকা পুণ্ড্রের বরেন্দ্রী এক সমৃদ্ধ জনপদ সেই সভ্যতার আদিকাল থেকেই। সমতল এই ভূমিকে কেউ শাসন করেছে জোর করে আবার কেউ শাসন করেছে ভালোবেসে। প্রজাকূলকে কেউ নিজের বুকে আগলে নিয়েছে, আবার কেউ প্রজাদের সমূলে উত্পাট করেছে। কেউ শাসন করেছে ধর্মের অনুশাসনে, আবার কেউ শাসন করেছে ধর্মবিদ্বেষে। তেমনি কৈবর্তরাজ ভীম বরেন্দ্রীতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কৈবর্ত, পুলিন্দ, নিষাদ, হালিক, জালিকদের রাজ্য। প্রজাকূলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সকলের প্রিয়ভাজন, শ্রদ্ধাভাজন, পূজনীয়। রাজা ভীম তার রাজ্যকে সাজিয়েছিলেন নানা বৃক্ষরাজিতে। বসতি গড়ে তুলেছিলেন সমাজের সকল শ্রেণিপেশার মানুষকে নিয়ে। সেখানে সুসজ্জিত প্রাকার যেমন ছিল, তেমনি ছিল কুঁড়েঘরও। রাজ-রাজরাদের বসতি যেমন ছিল, তেমনি বারাঙ্গনাদের বসতিও ছিল। সব মিলিয়ে ভীমের রাজ্য হয়ে উঠেছিল পার্শ্ববর্তী বা দূরবর্তী রাজাদের কাছে ঈর্ষণীয়। রাজা ভীম একসময় বৌদ্ধ ধর্মজাত রাজা রাম পালের কাছে ঈর্ষণীয় হয়ে ওঠেন। রাজা রাম পাল আশপাশের সকল রাজন্য বর্গের সহায়তায় ভীমের রাজ্য আক্রমণ করেন এবং পুনঃদখল করে নেন। তিনি নৃশংসভাবে হত্যা করেন ভীমের পরিবারের শিশু-নারীসহ সকলকে। এমনকি ভীমের যত অনুসারী বা সভাসদ ছিল সবাইকে। ক্ষমতা লোভে অন্ধ হয়ে রাম পাল হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠেন। রাজ্য হয়ে পড়ে প্রজাশূন্য। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে রাজা ভীম ধিক্কার জানায় রাম পালকে। সে বৌদ্ধ ধর্মজাত হয়েও কতটা নৃশংস হয়ে উঠেছে তার জন্য। রাজা ভীম মনে করেন, যে ধর্ম শান্তির বার্তা শোনায়, সে ধর্মে দীক্ষিত হয়ে একজন শাসক কিভাবে এতটা নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে? কিন্তু রাম পালের কাছে ধর্ম আর ক্ষমতা এক কাতারে এসে দাঁড়ায়। একদিকে ধর্মে আচ্ছাদন, অন্য দিকে ক্ষমতার বলয়। ক্ষমতার বলয়ে আচ্ছাদিত হয়ে পরে ধর্মের মর্মকথা। ধর্মনীতির নিচে চাপা পরে রাজনীতি। বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসনির্ভর এই কাহিনি নাট্যে লিপিবদ্ধ করেছেন নাট্যকার আব্দুল্লাহেল মাহমুদ আর নির্দেশনা দিয়েছেন ফয়েজ জহির। যশোর বিবর্তনের এই ১১তম প্রযোজনা ‘কৈবর্ত গাথা’ নতুন আঙ্গিকে মঞ্চে এনেছেন তারা। গত ৪ অক্টোবর ২০১৯-এর সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে নব উদ্বোধনী মঞ্চায়ন করা হলো নাটকটির। নাটকটি নির্দেশনার পাশাপাশি মঞ্চ ও আলো করেছেন ফয়েজ জহির নিজেই। সুন্দর সাবলীল গল্প নির্মিত হচ্ছিল একটু থেমে থেমে। প্রতিটি দৃশ্যান্তরেই মনে হয়েছে দর্শক মনোযোগ নড়ে যাচ্ছে, সরে যাচ্ছে। ইতিহাসের মালা এমনভাবে গাঁথা, যে সেখানে একটুখানি ছেদ পড়লেই বিপত্তি ঘটার সম্ভাবনা থাকে। দৃশ্যান্তর ভাবনা ভিন্নতা পেলে নিবিড় আনন্দ দিতে পারে দর্শককে। নির্দেশকের আলো ও মঞ্চ ভাবনা যথোপযুক্ত মনে হলেও দৃশ্যান্তরে সেটি বিড়ম্বনাপূর্ণ মনে হয়। তবে নায়লা আজাদ নূপূরের পোশাক আর পরিমল মজুমদারের সংগীতের ব্যবহার ছিল অসাধারণ। অভিনয়ের ক্ষেত্রে কানাই চরিত্রে মৃন্ময় চক্রবর্তী বেশ স্বাচ্ছন্দ্য ছিলেন। কানাইয়ের সঙ্গে মঞ্চ ভাগাভাগিতে সাবলীল ছিলেন কঙ্কাবতী মানে মাধবীলতা। এছাড়া রামপাল চরিত্রে মনিরুল ইসলাম, ভীম চরিত্রে সজীব বিশ্বাস আর চণ্ডক চরিত্রে শেখর ব্যানার্জী বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। সন্ধ্যাকর নন্দী চরিত্রে রূপদানকারী দেবাশীষ ভট্টাচার্য পলাশ ভালো চরিত্রায়ণ করেছেন, কিন্তু যখন তিনি বারাঙ্গনা পল্লীতে এলেন, মনে হলো আগে থেকেই তার নেশা হয়েছিল। কঙ্কাবতীর হাতে মদ পান না করেও তিনি মাতাল হয়ে গেলেন।
যাহোক, ইতিহাসের কিছু বাঁক থাকে যেখান থেকে জন্ম নেয় ভিন্নতা। কৈবর্তদের মধ্যমণি রাজা ভীম আর বৌদ্ধ ধর্মজাত রাজা রামপাল ছিলেন তেমনি শাসক, যাদের কারণে পুণ্ড্রবাসী দেখেছিল এক ভয়াবহ বর্বরতা। তাদের চোখের সামনে পাল্টে গিয়েছিল ধর্ম আর রাজনীতি। তারা দেখেছিল রক্তবন্যা আর সাধারণের আহাজারি। পেয়েছিল এক রাজার স্নেহ-ভালোবাসা আর আরেক রাজার রক্তচক্ষু। সময়ের পরিক্রমায় রাজাদের আমলের পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু স্নেহ-ভালোবাসা আর রক্তচক্ষু যেন সেই আগের মতোই বিরাজমান ধরিত্রী ধারায়। ‘কৈবর্ত গাথা’ হয়ে ওঠে ভাঙা গড়ার ইতিহাস, যা দেখে বর্তমান শিখে নেয় তাদের যা প্রয়োজন। অভিনয় আর দৃশ্যান্তরের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে যশোর বিবর্তনের ‘কৈবর্ত গাথা’ হয়ে উঠুক বর্তমানের শিল্পিত প্রযোজনার একটি।