রামেক মর্গে মোমবাতি জ্বালিয়ে ময়নাতদন্ত!

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) মর্গের লাশকাটা ঘরে রয়েছে ১৩টি রড লাইট। আছে ৯টি এনার্জি বাল্বও। কিন্তু একটাও জ্বলে না। ময়নাতদন্তের সময় যারা লাশ কাটেন তারা তিন গজের মতো বৈদ্যুতিক তার দিয়ে একটা লাইট জ্বালানোর ব্যবস্থা করেছেন। বিদ্যুৎ চলে গেলে সে লাইট বন্ধ হয়ে যায়। তখন মোমবাতি জ্বালিয়ে লাশের ময়নাতদন্ত করতে হয়। ফলে উঠে আসে না মৃত্যুর সঠিক কারণ।

গতকাল বৃহস্পতিবার রামেক মর্গের অ্যালকোহল পানে মৃত নওগাঁর বদলগাছির ভাণ্ডারপুরের ছইমুদ্দিনের ছেলে শফিকুল ইসলাম (৩৫) ও বগুড়ার আদমদীঘির মাতাপুরের অখিল চাকির ছেলে অলিক চাকির (৪০) লাশের ময়নাতদন্ত হচ্ছিলো। দুটি লাশের জন্য জ্বলছিল একটি মাত্র এনার্জি বাল্ব। ওই ঘরের ১৩টি রড লাইট এবং আরও ৯টি সাধারণ লাইটের কোনটি জ্বলেনি। তবে ফ্যান চলছিলো তিনটি।

তবে যে এনার্জি বাল্বটি জ্বলছিলো সেটির সুইচ বোর্ডের সঙ্গে নেই। তিন গজের মতো বৈদ্যুতিক তার ও সকেট দিয়ে জ্বালানো হয়েছে। ডোম রনি জানান, তারাই লাইটটির ব্যবস্থা করেছেন। বিদ্যুৎ না থাকলে জ্বালাতে হয় মোমবাতি। প্রচণ্ড গরমের ভেতর তাদের লাশ কাটা এবং সেলাইয়ের কাজ করতে হয়।

ওই ঘরে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের বসার জন্য কয়েক সারি বেঞ্চ রয়েছে। ময়নাতদন্তের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের হাতেকলমে শিক্ষা দেওয়া হয়। সে সময়ে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা বলেন, ফ্যান চলে না বলে গরমের সময় তারা বসতে পারেন না।

ডোমেরা বলেন, সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ময়নাতদন্ত হয়। বিকাল ৪টার পর লাশ এলে পরের দিনের জন্য রেখে দেওয়া হয়। অথচ ৮টি লাশ রাখার মতো ফ্রিজ ৭/৮ বছর ধরে নষ্ট। এছাড়া ঘরে নেই পানির ব্যবস্থা। লাশ কাটার পর রক্ত পরিস্কারে অন্যত্র থেকে পানি আনতে হয়। এসব সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিলেও সমাধান হয়নি।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক করতেন ডা. মারুফুল আরেফিন বলেন, 'একটা আদর্শ মর্গের প্রথম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পর্যাপ্ত আলো থাকতে হবে। ফলে রামেক মর্গ আধুনিক মর্গের সংজ্ঞায় পড়ে না। লাইট জ্বলে না, ফ্যানও চলে না। শিক্ষার্থীদের মানবদেহের সবকিছু দেখানো যায় না। বিদ্যুৎ চলে গেলে মোমবাতি জ্বালাতে হয়। এমন পরিবেশের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ভুল আসাটা স্বাভাবিক।'

রামেক ফরেনসিক বিভাগের সদ্য সাবেক প্রধান ড. এনামুল হক ঘটনার সত্যতা স্বীখার করে বলেন, 'এমন অনেক ঘটনা আছে, ময়নাতদন্তের সময় বিদ্যুৎ ছিলো না। তখন মোমবাতি বা টর্চ লাইটের আলোতে লাশ কাটা হয়েছে।'

রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়ের আলম জানান, পুলিশের তদন্তে দেখা যাচ্ছে খুন, অথচ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আত্মহত্যা। এমন অনেক ঘটনা আছে। আরএমপিতে থাকার সময় এমন একটি ঘটনা তারা আদালতের দৃষ্টিতে আনেন তিনি। পরে আদালত দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেন। দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে সত্যিই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবেদন আসে। দ্রুত বিচার নিশ্চিতে এমন ভুল ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন যেসব কারণে আসে, তার অবসান করতে হবে।

আরও পড়ুন: রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের গোলাগুলি, আহত ২

রামেকের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. কফিল উদ্দিন জানান, তিনি দায়িত্বে নিয়েছেন কিছুদিন আগে। তখন মর্গে অনেক সমস্যা ছিলো। কিছু কাটিয়ে উঠেছেন। কিছু সমস্যা এখনও রয়েছে। সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। মর্গের আধুনিকায়নে অনেক কিছু করা প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/এএন