পরমতসহিষ্ণুতার অভাব এক বড়ো সমস্যা

আবরার ফাহাদের হত্যা সারা দেশের মানুষকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। এ ঘটনা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ের মানুষের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতার অভাব এমন একটা অবস্থায় পৌঁছেছে যে যার হাতে ক্ষমতা, তার ভাবনার বাইরে যেন আর কারো কিছু ভাবার কোনো অধিকার নেই। আবরারকে কেন প্রাণ দিতে হলো—এমন প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে সমাজবিদেরা বলছেন, প্রধানত আইনের শাসন না থাকায় এমন সব ঘটনা বারবার ঘটছে। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে তারা জানে যে তাদের বাঁচানোর জন্য একটা প্রভাবশালী মহল পাশে দাঁড়াবে। তারা প্রভাব খাটিয়ে মুক্ত হয়ে যাবে। তা না হলে একটা ফেসবুক পোস্টের জন্য কেন এভাবে হত্যা করবে তার বন্ধু, সহপাঠীরা?

সমাজবিদেরা এও বলছেন, মানুষের বাক্স্বাধীনতার প্রতি অবহেলা ও অপ্রীতিই সমাজে যত অশান্তির মূল। সব সমস্যার সূত্রপাত সেখানেই। আর পরমতসহিষ্ণুতা যখন লোপ পায়, তখনই মানুষ দানবের মতো আচরণ করতে শুরু করে। ধর্ম, দার্শনিক তত্ত্ব—সবখানেই সহিষ্ণুতা মানবিক গুণাবলির মধ্যে শ্রেষ্ঠতম ও সামাজিক মূল্যবোধ নির্মাণের মূল ভিত্তি হিসেবে স্বীকার করা হয়। অন্যের কথা, বক্তব্য, মতামত, পরামর্শ ও জীবনাচার যতই বিরক্তিকর ও আপত্তিকর হোক না কেন, তা সহ্য করার মতো ধৈর্য যদি মানুষের মধ্যে না থাকে, তাহলে সমাজে নৈরাজ্য, উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে বাধ্য। মত প্রকাশের স্বাধীনতা যদি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে আধিপত্যবাদ, স্বৈরতন্ত্র মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। জীবনের সব ক্ষেত্রে; সমাজ-সংসার, রাষ্ট্র, দেশ-মহাদেশে, মানবজীবনের প্রতিটি পদে সহিষ্ণুতা শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। এই পরমতসহিষ্ণুতার অভাব এবং আইনের শাসন না থাকা যখন রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিটি অঙ্গে ঢুকে যাবে, তখন তা দেশের বেড়ে ওঠা ভবিষ্যত্ প্রজন্মের মধ্যেও প্রভাব ফেলবে। খুব মারাত্মক আকারে যে তা পড়েছে, সেটা বোঝা যায় দেশের সবচেয়ে মেধাবীদের প্রতিষ্ঠান বুয়েটের শিক্ষার্থীদের এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।

সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক নেহাল করিম বলেন, এসব কিছুর মূলে নষ্ট রাজনীতিও রয়েছে। রাজনীতি আর মানুষের ভাগ্য বদলের জায়গায় নেই। রাজনীতিতে যদি আয়ের পথ না থাকত, তাহলে এখন যারা রাজনীতি করেন তাদের ৯০ শতাংশ লোক রাজনীতি করত না। তারা রাজনীতি করেন, কারণ রাজনীতি অপরিমেয় ক্ষমতার উত্স।

আইনের শাসনের দুর্বলতা, পরমতসহিষ্ণুতার অভাব ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের প্রভাবে বিপথে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম। একই সঙ্গে পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিক শিক্ষার অভাবেও ভালো-মন্দ বিচারের ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে তাদের। এতে করে নিজের মতের বিরুদ্ধে কিছু দেখলেই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠছে। শুধু তাই নয়, নিজের মতো করে শাস্তিও দিচ্ছে তারা।

আবরার হত্যার প্রসঙ্গ টেনে এনে অধ্যাপক নেহাল করিম বলেন, আইনের শাসন নেই বলেই এসব যথেচ্ছাচার হচ্ছে। কারণ তারা জানে, বিচার হবে না। হলেও বের হয়ে আসার রাস্তাও আছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে টর্চার সেল গড়ে উঠেছে। সেখানে যেসব ছাত্র অডিটোরিয়ামে থাকে, তারা মিছিলে না গেলে কিংবা ছাত্রনেতাদের মতের বিরুদ্ধে গেলে তাদের টর্চার করা হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, শিক্ষকেরা সেসব জেনেও কোনো ব্যবস্থা নেন না। ফলে হলগুলোর নিয়ন্ত্রণ শিক্ষকদের হাতে নেই, রয়েছে ছাত্রদের হাতে। সুবিধাভোগী শিক্ষকেরা তাদের কিছু বাড়তি পাওয়ার আশায় ছাত্রদের কাছে নতজানু। ফলে ছাত্ররা আর ছাত্র নেই, তারাই নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, একটি শিশুর প্রাথমিক যে নৈতিক শিক্ষা প্রয়োজন, তা সে তার পরিবার থেকে পাচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিক যে শিক্ষাব্যবস্থা, তা একটি শিশুর মানসিক বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারছে না। এর ফলে ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ বিচারের ক্ষমতা তাদের মধ্যে গড়ে উঠছে না। তাই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে আমাদের শিশুরা, হয়ে উঠছে অপরাধপ্রবণ।

মনোবিজ্ঞানী ও কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল বলেন, একজন মানুষ পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে যখন তার মধ্যে আত্মপর্যবেক্ষণ, নিজেকে আবিষ্কার ও মূল্যায়নের ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। এই মূল্যায়নের ক্ষমতাই তার মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তৈরি করে। ফলে সেই মানুষটি নিজেকে ভালো কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে শেখে আর খারাপ কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখে। যদি কোনো খারাপ কাজ তার দ্বারা হয়ে যায়, তখন তার মনে অনুতাপ সৃষ্টি হয়। সে সেই কাজের জন্য নিজেকে শাস্তি দেয় এবং শুধরে নেয়। এই মানবিক গুণাবলি যদি ছোটবেলা থেকে সৃষ্টি না হয়, তাহলে সেই শিশু অধৈর্য, রাগী এবং মনোবিজ্ঞানের ভাষায় দুর্যোগপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে বেড়ে উঠবে। তখন তারা অল্পতেই হতাশ ও অধৈর্য হয়ে উঠবে, যা তাকে আগ্রাসী ও আক্রমণাত্মক চরিত্রের মানুষে পরিণত করবে।

আরও পড়ুন: চলে গেলেন মীনা কার্টুনের পরিচালক রাম মোহন

মোহিত কামাল বলেন, একজন মানুষ হঠাত্ করে খারাপ বা ভালো হয় না। ছোটবেলা থেকেই তার চরিত্র গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তাই আমাদের শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যত্ নিশ্চিত করতে হলে বর্তমান থেকে তাদের সময় দিতে হবে। পরিবারে তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বড়ো করতে হবে। মা-বাবার ঝগড়া, মা-বাবার সত্ উপার্জন, বড়ো-ছোটদের মান্য করা, খেলাধুলার চর্চা এবং খেলায় হেরে গেলে সেই হারকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

ইত্তেফাক/কেকে