পেঁয়াজের নেকলেস

  শিমুল শাহিন

 

সকালবেলা ঘুম ভাঙল ছোট শ্যালিকা মিতুর ফোনে। ফোনটা কানের কাছে ধরেই ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বললাম, ‘কী খবর ছোট গিন্নি! হঠাত্ এ অসময়ে সেকেন্ড প্রেমিকের কথা মনে পড়ল যে!’

আদুরে স্বরে মিতু বলল, ‘ঢং রাখেন দুলাভাই, খালি ঢঙের কথা শোনাতেই পারেন, কাজের বেলা কিছুই না!’

বললাম, ‘কেন! কী করা লাগবে আমার বলো!’

আহ্লাদি স্বরে ও বলল, ‘আমাকে এ মাসে পেঁয়াজ বসানো রিং কিনে দেওয়াই লাগবে!’ মিতুর এমন কথা শুনেই দুশ্চিন্তা পেয়ে বসল, ঘুম নিমিষেই উধাও হয়ে গেল! বিছানা থেকে উঠে ফ্রেশ হলাম। নাস্তার টেবিলে বসা মাত্রই দেখলাম বউ হাসি হাসি মুখ করে এগিয়ে আসছে। ওর হাসি মুখ দেখেই চিন্তায় অস্থির হয়ে গেলাম। বছর চারেকের সংসারজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে বলতে পারি, ও নিশ্চয়ই কোনো আবদার নিয়েই আসছে!’

রিতু পাশে এসেই কোনো ভূমিকা ছাড়াই বলল, ‘গোটা একটা মাস পার হয়ে গেল, এতদিনে তুমি একবারও শপিংয়ে নিয়ে যাওনি! এ সপ্তাহে কিন্তু নিয়ে যাওয়াই লাগবে!’

চেয়ারে আয়েশ করে বসতে বসতে বললাম, ‘বেশ তো! তা কী কিনবা? ডায়ামন্ডের কোনো নেকলেস নাকি জামদানি শাড়ি?’

ও মুখ ভেঙচিয়ে বলল, ‘ধুরো, ওসব কেউ এখন পরে নাকি!’

‘তাহলে?’

পেছন থেকে গলা জড়িয়ে ধরে সে বলল, ‘আমাকে কেজি পাঁচেকের একটা পেঁয়াজের নেকলেস বানিয়ে দেওয়াই লাগবে!’

চোখ কপালে তুলে বললাম, ‘বলো কী! পাঁচ কেজি পেঁয়াজের নেকলেস? কত দাম পড়বে হিসাব আছে তোমার? কতই বা বেতন পাই বলো!’

স্বরে কাঠিন্য এনে ও বলল, ‘অত কিছু বুঝি না, রেডিমেড নেকলেস কিনে না দিলেও অন্তত খোলা পেঁয়াজ আমারে কিনে দেওয়াই লাগবে। আমি নিজেই গেঁথে গেঁথে নেকলেস বানিয়ে নেব!’

‘আচ্ছা! ভেবে দেখি!’

‘কোনো দেখাদেখি নাই! যদি না দাও, তবে কালকেই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব!’

বেশ দুশ্চিন্তায় পড়লাম। পেঁয়াজ এখন সোনার হরিণ, কেজি পাঁচেক পেঁয়াজ কেনার মতো অত টাকাও হাতে নাই। কিন্তু রিতুকে আমি চিনি, ওর আবদার পূরণ না করা পর্যন্ত ওর ঘ্যানঘ্যান চলতেই থাকবে! ধার-দেনা করে হলেও ওকে পেঁয়াজের নেকলেসটা কিনে দেব মনস্থির করলাম! বিপদ-আপদের নিত্য সঙ্গী বন্ধু সবুজকে টাকার জন্য ফোন দিলাম, সব শুনে ও টাকা নিয়ে আসতে ওর ওখানে ডাকল। গতকাল শখ করে পেঁয়াজের ফ্লেভারওয়ালা একটা সুগন্ধি কিনেছি, ওটাই একটুখানি গায়ে স্প্রে করে বের হলাম!

বাসার সামনের মোড়টায় অন্যান্য দিন রিকশার ভিড় লেগেই থাকে, কিন্তু আজ কোনো এক অজ্ঞাত কারণে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে একটাও রিকশা পেলাম না! সামনে একটু এগিয়ে গিয়ে শেষমেশ বাসে উঠলাম। বাসে উঠতেই দেখলাম সবাই কেমন করে যেন আমার দিকে তাকাচ্ছে। ঘটনা কী? বেশ চিন্তায় পড়লাম। প্যান্টের পেছন ফেটে যায়নি তো? নাকি জিপার ঠিকমতো লাগাইনি! সবার অলক্ষ্যে এসব চেক করলাম। কয়েকটা সিট সামনে বসা গালে কাটা দাগওয়ালা একটা লোককে দেখলাম দীর্ঘক্ষণ আমার দিকে পেছন ফিরে চেয়ে আছে! ওর চাহনি দেখেই ভয়ে গা শিওরে উঠল। কিছুক্ষণ পর সবুজদের বাড়ির পাশের মোড়টায় নামলাম। আমার পিছু পিছু দেখি সেই গালে কাটা দাগওয়ালা লোকটাও নামল নেমে গেল! আমি ওকে পাত্তা না দেওয়ার ভান করে সবুজের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম! বেশ কিছু সময় চলে গেল, তবুও সবুজ আসছে না! হঠাত্ একটা কালো মাইক্রোবাস এসে থামল আমার সামনে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভেতর থেকে দুজন লোক আমাকে টেনে তুলতে লাগল, আর কাটা দাগওয়ালা লোকটা আমায় ঠেলা দিয়ে তুলে ফেলল মাইক্রোবাসে।

চিত্কার করার সময়ই পেলাম না, নাকের কাছে রুমালজাতীয় কিছু একটা ধরল, অজ্ঞান হয়ে গেলাম। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন দেখলাম একটা আবছা আলোকিত ঘরে আমি বাঁধা অবস্থায় বসে আছি। আর আমার সামনে বসে আছে সেই কাটা দাগওয়ালা লোকটা!

আমার মাথাটা উঁচু করে ধরে বলল, ‘জলদি কইরা ক, মাল কই রাখছস?’

বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিসের মাল ভাই?’

সপাটে একটা চড় লাগিয়ে সে বলল, ‘মাল বুঝো না, জুস খাও? জলদি ক পেঁয়াজ কই রাখছস!’

সেই সকাল থেকে শুরু হইসে পেঁয়াজ নিয়ে যন্ত্রণা সইতে হচ্ছে! প্রথমে শ্যালিকা মিতু, তারপর রিতু আর এখন এই দাগওয়ালা ষণ্ডামার্কা লোকের নির্যাতন! বেশ ঝাঁজালো কণ্ঠেই উত্তর দিলাম, ‘পেঁয়াজ কই পাব আমি?’

আমার উত্তরে সন্তুষ্ট হলো না দাগওয়ালা লোকটা! আমার মাথায় মৃদু আরেকটা টোকা দিয়ে বলল, ‘আমার লগে গেম খেলতাছ মিয়া? তোমার গা থিক্যা ভুরভুর কইরা পেঁয়াজের সুগন্ধ আইতাছে, কিছু বুঝি না মনে করছস?’

এতক্ষণে রহস্য ভাঙল আমার! কিছুটা হেসে বললাম, ‘ওটা তো বডি....’

আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই ও বলল, ‘চুপ থাক, আমি জানি তোর গুদামে ম্যালা পেঁয়াজ! আমি কিচ্ছু শুনবার চাই না, ধরে কল্লা রাখতে চাইলে তোর বউরে ফোন দিয়া বল ১ মণ পেঁয়াজ আনতে!’

আমি হ্যাঁ-না কিছুই বললাম না, ওরাই আমার পকেট থেকে ফোনটা বের করে ডায়াল লিস্টে থাকা বউয়ের ফোন নম্বরটা নিয়ে ফোন দিয়ে বলল, ‘হ্যালো ম্যাডাম, আপনার স্বামী আমাগোর হাতে জিম্মি! হেরে বাঁচাইতে চাইলে ১ মণ পেঁয়াজ লইয়া আমগো এহানে বিকেল চারটার ভিতরেই চইলা আহেন!’

লাউডস্পিকারে মুঠোফোনের অপর প্রান্তের আমার বউয়ের ঝাঁজালো কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম, ‘ফাজলামি করিস ছাগল? ঘরে এক ছটাক পেঁয়াজ নাই, ফোন রাখ গাধার বাচ্চা!’

রিতুর ঝাড়ি খেয়ে ফোন রেখে দিল কাটা দাগওয়ালা লোকটা! তারপর সাগরেদদের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘ওনারে ছাইড়া দে!’

বাসায় চলে এসেছি! বউয়ের অগ্নিদৃষ্টির পুরোটাই এসে পড়ল আমার ওপর! বলল, ‘কোথায় এমন রাজকার্য করা হচ্ছিল শুনি? আর শোন আমি কাল বাবার বাসায় চলে যাচ্ছি!’

বউয়ের কথা শুনে হেসে বললাম, ‘যেতে হবে না, এই যে এনেছি তোমার সাধের পেঁয়াজ! এখন বানিয়ে নাও পেঁয়াজের নেকলেস!’

এরপর পকেট থেকে একটা একটা করে পনেরোটা পেঁয়াজ বের করলাম! বউ আনন্দে আত্মহারা হয়ে সেগুলো নিয়ে বসার ঘরে চলে গেল! কোথা থেকে পেঁয়াজ এনেছি, কেমন করে এনেছি, কিছুই জিজ্ঞেস করল না রিতু! একদিক দিয়ে অবশ্য জানতে না চেয়ে ভালোই করেছে ও, নয়তো ওকে পেঁয়াজ কাহিনি বলতে গিয়ে বেশ লজ্জাতেই পড়তে হতো! আর যাই হোক, ওকে তো আর বলা যেত না, এ পেঁয়াজ এনেছি সেই ষণ্ডাদেরই আস্তানা থেকে! ষণ্ডামার্কা লোকটার সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম, তখনই আমার হাতের বাঁধনটা হালকা হয়ে গেছিল, আর তখনই দেখলাম পাশেই একটা ঠোঙায় কিছু পেঁয়াজ রাখা আছে! সবার অলক্ষ্যে সেগুলোরই কয়েকটা পকেটে ভরে নিয়েছিলাম! যাকগে সে কথা, পিঠের একটা জায়গা মার খাওয়ার চোটে ছিলে গেছে, সেটা হঠাত্ হঠাত্ জ্বলছে! কিন্তু সে জ্বলুনি কমিয়ে দিচ্ছে রিতুর আনন্দময় গান! পাশের ঘর থেকে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি রিতু পেঁয়াজের মালা গাঁথছে আর গুনগুন করে গান গাইছে, ‘তোরা যে যাই বলিস ভাই, আমার সোনার পেঁয়াজ চাই!’

রাজশাহী