ময়লা আছে ময়লা। ডাকের সঙ্গে সঙ্গে বাঁশির আওয়াজ দেয় পরিচ্ছন্নতা কর্মী। সকাল থেকে শুরু বাঁশি, ভ্যানগাড়ি আর কন্টেনার হাতে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ময়লা-আবর্জনা তুলে ভ্যানগাড়িতে করে বড় ডাস্টবিনে রাখা হচ্ছে। পরে তা বড় গাড়িতে করে ডাম্পিংয়ে ফেলানো হয়। নীলফামারি সৈয়দপুর ঘুরে এমটাই দেখা গেছে। দেশের মফস্বল শহরে এমন উদ্যোগ এটিই প্রথম।
সাধারণত দেশের অনেক শহরেই বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা দেখা যায় না। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা পুরো দেশেরই একটি পরিচিত চিত্র। এছাড়া অনেক শহর আছে যেগুলোর নির্দিষ্ট কোনো ময়লার ভাগাড় নেই, ফসলা জমিই ভরসা! এ ক্ষেত্রে সৈয়দপুর এখন অনন্য। ভিন্ন উদ্যোগের কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কয়েকটি শহরের মতো সৈয়দপুরও এখন রোল মডেল।
ময়লা যখন আয়ের উত্স
পৌরসভার নতুন বাবুপাড়ার গৃহিণী আহমেদা ইয়াছমিন ইলা, বাঙালিপুর নিজপাড়ার নূরুন্নাহার বেগম আর সাহেবপাড়ার সোহেলী বেগম বাড়িঘরের ময়লা-আবর্জনা বাইরে ফেলেন না। পৌরসভার সরবরাহকৃত প্লাস্টিক কন্টেনারে রাখছেন। যা পৌরসভার নিয়োজিত কর্মীরা ভ্যানগাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন আর ফেলছেন মানব বর্জ্য শোধনাগারে। এভাবে মানব বর্জ্য শোধনাগারে তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের জৈব সার। এতে শহর পরিচ্ছন্ন থাকার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিও কমছে অবাক করা হারে। তাছাড়া পৌরসভাটির আয়ের নতুন উত্সও সৃষ্টি হয়েছে।
পৌরসভা সূত্র জানায়, পৌরসভার সুড়কি মহল্লা এলাকায় পূর্ণাঙ্গ মানব বর্জ্য শোধনাগার তৈরির কাজ প্রায় শেষের পথে। প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে মানুষের বসতি থেকে একটু দূরে এই শোধনাগারটি নির্মিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ওয়াটার এইড ও এসকেএস বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতায় সংগৃহীত মানব বর্জ্য থেকে ভিন্ন কিছু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরইমধ্যে প্রকল্পের শতকরা ৯০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।
যখন টনক নড়লো...
উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হচ্ছে সৈয়দপুর। যার আয়তন ৪২ বর্গকিলোমিটার। লোকসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। এ শহরের ২৪টি অবাঙালি ক্যাম্প, পৌরসভার ১৫টি ওয়ার্ডের আবাসিক, বাণিজ্যিক এলাকা, নালা-নর্দমা ও সড়কে প্রায় ৫০ টন ময়লা-আবর্জনা প্রতিদিন জমা হয়। এসব ময়লা-আবর্জনা যত্রতত্র ফেলে দেওয়া, ভরাটের কাজে ব্যবহার করায় পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হতো।
প্রতিদিন ভোরে পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা বর্জ্য অপসারণের কাজ করলেও পৌরবাসী কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছিলেন না। শহরে ঘনবসতি ও জনবল সঙ্কটে সেবা দিতে পারছিলেন না পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। এই সমস্যা সমাধানে বর্তমানে মনোযোগী হয়ে ওঠে পৌরসভা। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ও উল্লেখিত সংস্থার সহযোগিতায় প্রতিটি ওয়ার্ড, পাড়া-মহল্লায় পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য ও তা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার জন্য সচেতনামূলক সভা করেন।
বাড়ির ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য প্রতিটি বাড়িতে প্লাস্টিকের কন্টেনার সরবরাহ করে পৌরসভা। প্রতিদিন ঘণ্টা বাজিয়ে সেসব ময়লা-আবর্জনা পৌরসভার কর্মীরা পিকআপ ও ভ্যানগাড়িতে তুলে নিচ্ছেন। আর তা ফেলছেন মানব বর্জ্য শোধনাগারে। এতে করে সৈয়দপুর পৌরসভা জৈব সার বিক্রি করে আয়ের উত্স সৃষ্টি করেছে।
কৃষিতে অবদান রাখবে এই উদ্যোগ
সৈয়দপুর পৌরসভার প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মমিনুল হক বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বিপুল ময়লা পরিষ্কার করছি। এসব ময়লা-আবর্জনা মানব বর্জ্য শোধনাগারে ফেলে উন্নতমানের জৈব সার মিলছে। বর্জ্য অপসারণে পর্যাপ্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব পৌরসভায় রয়েছে। পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলররা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে মনিটরিং করছেন।’ পৌরসভার ১১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এরশাদ হোসেন পাপ্পু বলেন, অতীতের নোংরা শহরের গ্লানি মুছে ফেলে সৈয়দপুর শহরকে পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছি।’
কথা হয় সৈয়দপুর পৌরসভার মেয়র মো. আমজাদ হোসেন সরকারের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রতিনিয়ত কর্মীরা কাজ করছেন। দিনে তিনবেলা ঝাড়ু ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় কাজ করছেন পৌরসভার কর্মীরা। প্রতিটি ওয়ার্ডে সভা-সমাবেশ করে মানুষকে সচেতন করে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি বাড়িতে ময়লা রাখার জন্য প্লাস্টিকের কন্টেইনার প্রদান করা হয়েছে। সেখান থেকে কর্মীরা গাড়িতে ময়লা তুলে নিচ্ছেন। বাড়ি ও আশেপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে সেই গৃহিণীকে পুরস্কার হিসেবে কানের দুল উপহার দেওয়ার হচ্ছে বলে মেয়র উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘মানব বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এটি পুরোপুরি চালু হলে আর সমস্যা থাকবে না।’ শহরটিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছনতার রোল মডেল হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন পৌরসভার মেয়র মো. আমজাদ হোসেন সরকার।