n সালাহউদ্দিন মো. রেজা,
[ চট্টগ্রাম অফিস ]
বান্দরবন জেলা সদর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে রুমা উপজেলার কেওক্রাডং পাহাড়ের কোল ঘেঁষে অবস্থিত বগা লেক। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০০০ ফুট উচ্চতায় ১৫ একর জায়গাজুড়ে এই হ্রদের অবস্থান। যার গভীরতা ১১০ ফুট। দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে বগা লেকে পৌঁছানোর পর ভ্রমণের সকল ক্লান্তি নিমিষেই উবে যায়। প্রথম দর্শনেই যে কারো মনে হয়, এ যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা বর্ণিল এক ক্যানভাস, যেখানে সুনীল জলরাশির সঙ্গে জলকেলিতে মেতেছে আকাশ আর পাহাড়।
বগা লেক নিয়ে নানারকম কল্পকাহিনি প্রচলিত আছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে শোনা একটি কাহিনি এরকম—অনেকদিন আগে ওই এলাকায় একটি সুচালো আকৃতির পাহাড় ছিল। দুর্গম ও ঘন অরণ্যে ঘেরা ওই পাহাড়ের কোলে ম্রো, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরাসহ নানা নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস ছিল। কিন্তু গ্রামের মানুষের মনে সুখ ছিল না। কারণ গ্রামের ছোট ছোট শিশু ও গবাদিপশু প্রায়ই ওই পাহাড়ে গিয়ে হারিয়ে যেত। গ্রামবাসী অতিষ্ঠ হয়ে একদিন ওই পাহাড়ে ছুটে গেল। গিয়ে তারা মুখোমুখি হলো এক ভয়ংকর দর্শন ড্রাগনের। বম ভাষায় ড্রাগনকে বলে ‘বগা’। এরপর গ্রামবাসীরা লড়াই করে বগা বা ড্রাগনটিকে হত্যা করে। বগার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার গুহা থেকে ভয়ংকর গর্জনের সঙ্গে আগুন বেরিয়ে এসে আশপাশ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তারপরই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা। সেই পাহাড়ের চূড়ায় হঠাত্ মনোরম এক হ্রদ সৃষ্টি হয়। সেই থেকেই জন্ম বগা লেকের। তবে বাংলাদেশের ভূ-তত্ত্ববিদগণ মনে করেন, বগালেক কোনো অলৌকিক নিদর্শন নয়। প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রাকৃতিকভাবেই পাহাড়ের চূড়ায় এই লেক তৈরি হয়েছে। এটি মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ কিংবা মহাশূন্য থেকে উল্কাপিণ্ডের পতনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে বলে তারা অভিমত দিয়েছেন।
ঘুরে আসুন বগা লেক
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য সৃষ্টিকর্তার এক অমূল্য উপহার বগা লেক। দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কেওক্রাডং। আর ওই সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ সংলগ্ন পাহাড় চূড়ায় যে জলাশয় থাকতে পারে, তা অবাক হওয়ার মতোই একটি বিষয়। বগা লেক থেকে কেওক্রাডংয়ের দূরত্ব প্রায় ৭ কিলোমিটার। বগা লেকের ধার ঘেঁষে চলে যাওয়া সড়ক ধরেই কেওক্রাডং যেতে হয়। বগা লেক দেখার স্বপ্ন অনেকদিন ধরেই মনের মধ্যে পুষে রেখেছিলাম। কিন্তু সাধ আর সাধ্যের মেলবন্ধন হচ্ছিল না কোনোমতেই। অবশেষে এলো সেই প্রতীক্ষিত দিন। গত ৩১ আগস্ট সকাল পৌনে ৯টায় বান্দরবান শহর থেকে বগা লেকের উদ্দেশে আমাদের পাঁচজনের যাত্রা শুরু হয়। একটি ফোর হুইল হাইলাক্স জিপ নিয়ে আমাদের বগা লেক অভিযানে সঙ্গী হয় ইউনুস নামে এক দুঃসাহসী গাড়িচালক। তাকে ‘দুঃসাহসী’ বলার কারণটা এখানে জানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। যেসব চালক সচরাচর সমতলে গাড়ি চালিয়ে অভ্যস্ত, তাদের পক্ষে দুর্গম পাহাড়ি পথে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরা খুবই চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ। নিয়ন্ত্রিত গতিতে গাড়ি চালাতে না জানলে যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। তবে আমাদের আস্থা ছিল ইউনুসের ওপর। কারণ ওই সড়কে আগেও সে গাড়ি চালিয়েছে। এই সড়কের নাড়িনক্ষত্র সে জানে।
পাহাড়ি চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চলতে চলতে দেখা গেল, এবারকার বর্ষায় বান্দরবান-রুমা-বগালেক সড়কের অনেক এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় সড়ক ধসে গেছে। কোথাও বিশাল পাহাড়ের উপরিভাগ ভেঙে সড়কের ওপর পড়েছে। সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক অনেক এলাকায় সংস্কারের কাজ চলছে। রুমা উপজেলার মূল সড়ক দেখলে মনে হবে বন্যায় বিধ্বস্ত একটি উপজেলা। এরপরও মানুষের জীবনযুদ্ধ থেমে নেই। রাস্তায় যানবাহন চলছে। পার্বত্যবাসীরা দৈনন্দিন কাজ করে যাচ্ছে। ভ্রমণবিলাসী ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের চলাচলও থেমে নেই। বান্দরবান শহরের অনতিদূরে মিলনছড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা হোটেল ও কটেজগুলোতে পর্যটকদের সরব পদচারণা লক্ষ করেছি। অফসিজনের কারণে পর্যটক সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও শীতের সময় অবিশ্বাস্য ভিড় থাকে।
শেষ ১৭ কিলোমিটারের বাঁকে বাঁকে শিহরণ
রুমা থানার সামনে নিরাপত্তা তল্লাশি চৌকিতে আসার পর নাম-পরিচয়, গন্তব্যের স্থান ও উদ্দেশ্য লিপিবদ্ধ করতে হয়। বান্দরবান শহর থেকে রুমা উপজেলায় পৌঁছাতে যতগুলো দুর্গম পাহাড় ডিঙাতে হয়, রুমা থেকে ১৭/১৮ কিলোমিটার পাহাড়ি সড়ক বেয়ে বগা লেকে পৌঁছা তার চেয়ে অনেক দুঃসাহসিক অভিযাত্রা। অসংখ্য পাহাড়ি সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় মেঘের ঘনঘটা কিংবা সৌভাগ্যক্রমে কোথাও আকাশ পরিষ্কার থাকলে চোখের দৃষ্টি অনেক দূরে চলে যায়। সে এক অসাধারণ সৌন্দর্যানুভূতি, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়! থানার নিরাপত্তা চৌকিতে নিজেদের পরিচয় দিয়ে বগালেকের পথে উঁচু-নিচু আঁকা-বাঁকা পথ বেয়ে আমাদের বহনকারী জিপ এগিয়ে চলছে। আমাদের গাড়ি যেন অনেকটা পার্কের রোলার কোস্টারের মতো একবার উপরে উঠছে আবার নিচে নামছে।
পূর্ণিমায় লাবণ্যবতী বগা লেক
বগালেক এলাকায় কাঠের ও বাঁশের মাচায় তৈরি একতলা ও দোতলা বিশিষ্ট কয়েকটি কটেজ রয়েছে। পর্যটকদের রাত্রিযাপনসহ খাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। সৌর বিদ্যুত্ থেকে রাতের অনেকটা সময় আলোকিত থাকে ওই সকল কটেজ ও দোকানঘর। তবে পূর্ণিমার রাতে বগা লেক হয়ে ওঠে আরো লাবণ্যবতী। বগালেকে কোনো বোট চলা ও গোসল করা নিষেধ। গোসল করতে গিয়ে একাধিক লোকের প্রাণহানি হয়েছে বলে এলাকার লোকজন জানান। বিশাল আকারের ওই লেকের পানি শীতকালেও মোটামুটি একই রকম থাকে। প্রকৃতির অপার সৃষ্টি বগা লেকের শান্ত পানিতে কী যেন এক রহস্য লুকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ এক নাগাড়ে তাকিয়ে থাকলে যা আপনার মনের মধ্যে অনুরণিত হবে। তাই সময় পেলেই পরিবার বা বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরে আসুন বগা লেক।