ভূমিকা :ইলাই হ্যালপার্ন
‘দ্য জার্নি অব দ্য বুক-পিপল,’ বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর গত বিশ বছর ধরে ওলগা টোকারচুক সমসাময়িক পোলিশ সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ একজন নারীকণ্ঠ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। এছাড়া পাঠক এবং সমালোচক মহলেও তিনি অকুণ্ঠ প্রশংসা লাভ করেছেন। টোকারচুক একজন বিশ্লেষণধর্মী মনোবিজ্ঞানী এবং তার অনেক রচনায় বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে মানবাত্মার গভীরে ঢুকে অতীন্দ্রিয়বাদের মাধ্যমে কিংবা বলা চলে ইন্দ্রিয়পরায়ণতা এবং মানব দেহকে একটি প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহার করে মানুষের অন্তর্জগতে অন্বেষণ করা হয়।
তবে তার প্রজন্মের অন্যান্য পোলিশ লেখকের মতো টোকারচুক তার দেশের ইতিহাস কিংবা কমিউনিজিয়মের পর যে বাস্তবতা এসেছিল, সেদিকে ঝুঁকে পড়েননি। বরং একজন ‘যাযাবরের’ মতো কাজ করতে পছন্দ করেছেন, যেখানে বিভিন্ন স্থান এবং সময়ের মাঝে দ্রুত এবং সচ্ছন্দে বিচরণ করা যায় এবং বিভিন্ন জাতি, ধর্ম এবং লিঙ্গবোধকে চ্যালেঞ্জ করা যায়। আর এভাবেই ‘অ্যান ইভনিং উইথ দ্য অথার’, কাহিনি বর্ণনা করা উচিত, যা দুই ধরনের সংলাপ নিয়ে গঠিত। প্রথমটি হচ্ছে লিঙ্গভিত্তিক, যাতে লেখক টমাস ম্যানের রচনা বা কর্মের পিতৃতান্ত্রিক জগতের সাদৃশ্যের মাধ্যমে একজন নারীর দৃষ্টিভঙ্গিতে তার চরিত্র তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় সংলাপটি ছিল স্থানীয়, যাতে গদানস্ক (দানজিগ), ব্রেসলো (যে শহরের অতীতের জার্মান রূপটি টোকারচুকের দ্বিতীয় উপন্যাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে) এবং অ্যালেনস্টেইন শহরের জার্মান অতীতকে বিজড়িত করা হয়েছে। যুদ্ধের পর পোলিশ লেখকেরা যেখানে বড়ো হয়েছেন, সেই জায়গার ইতিহাস আবিষ্কারের প্রতি তাদের কৌতূহল ছাড়াও মূলত কল্পনাশক্তি দিয়ে অতীতকে পুনরায় আবিষ্কার করার ক্ষমতা এবং সেইসঙ্গে সমসাময়িক পোলিশ রচনার সঙ্গে অঙ্গীভূত করাটা ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর একটি বিষয়। একইভাবে গদানস্ক শহরের পাওয়েল হুয়েল তার রচিত ‘দ্য ক্যাসটর্প’ বইটিতে তার নিজস্ব ডানজিগ অধ্যায় যুক্ত করেছেন, টমাস ম্যানের ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন’ কিংবা ব্রেসলো থেকে আসা ম্যারেক ক্র্যাজেয়স্কি তার ডিটেকটিভ সিরিজে ২০ শতকের জার্মান শহরগুলোকে অন্ধকার এবং ক্ষয়িষ্ণু স্থান হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন, যা আসলেই কখনো ছিল না। তবে যারা একটু অবাক হচ্ছেন, তাদের জন্য উল্লেখ করাটা গুরুত্বপূর্ণ যে, টমাস ম্যান কখনো অ্যালেনস্টেইনে পা দেননি। যে গল্পটা অনুবাদ করার জন্য আমি বেছে নিয়েছিলাম, সেটা ‘প্লেইং অন মেনি ড্রামস’ নামে কতগুলো সারগ্রাহী ছোটগল্পের সংকলন থেকে নেওয়া হয়েছিল। মনে হচ্ছে এই শিরোনামটিই টোকারচুকের সমগ্র রচনার সঠিক প্রতিনিধিত্ব করছে। আবার মেকি ভবিষ্যত্-বক্তা জ্যাকব ফ্রাংককে ঘিরে রচিত তার নতুন উপন্যাসটিও অতি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।
সেরা আইডিয়াগুলো সবসময় তার মনে রাতেই জেগে ওঠে, যেন দিনের তুলনায় রাতে তিনি একজন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ ছিলেন। তিনি হয়তো বলবেন, এটা গতানুগতিক। তারপর হয়তো বিষয়টা পরিবর্তন করে আমি বলে নতুন একটি বাক্য শুরু করবেন। হয়তো বলবেন, সকালের প্রথম কফিটা খাওয়ার পরপরই সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে পারি, অর্থাত্ দিনের প্রথমার্ধে।
ঘটনাচক্রে যখন সে খবরের কাগজে পড়ল যে, তিনি প্রুশিয়ার অ্যালেনস্টেইন ভ্রমণে চলেছেন, তখন সে ঘুমাতে পারছিল না, তিনি এত কাছে আসছেন। তখন সমস্ত স্মৃতি তার মনে ফিরে এল। কিংবা বলা যায় ফিরে আসেনি, কেননা স্মৃতিগুলো সবসময় মনেই ছিল, কখনো চলে যায়নি। চিত্ হয়ে শুয়ে সবধরনের সম্ভাবনার কথা সে ভাবছিল, যা তার লক্ষ ফলপ্রসূ করবে। অজানা একটি শহরের রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আর উল্টোদিক থেকে সে হেঁটে আসছে, তাকে দেখলেন, চেহারায় একটু অবাকভাব ফুটে উঠল, যেন একটা ধাক্কা খেয়েছেন। থেমে তার দিকে তাকালেন, মেয়েটির হ্যাটের অবগুণ্ঠন ওপরে তোলা ছিল, তার চোখের স্বচ্ছ এবং উজ্জ্বল দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে একসময় সে উত্তেজনায় শিউরে উঠত, দেহ নয় কেবল তার চাউনি দেখে। কিংবা, সে হয়তো রোদের মধ্যে বাজারের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে (অ্যালেনস্টেইনের বাজার দেখতে কী রকম ছিল?) এবং সে আবার বিপরীত দিক থেকে একজন নারী এবং একজন পুরুষকে অনুসরণ করছে। এবং মেয়েটি দেখল যে, ছেলেটি তাকে চিনতে পেরেছে, কেননা তার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল, যখন সে বিব্রত চেহারা নিয়ে অন্যদেরকে বলছিল ‘ক্ষমা করবেন...’। কাঁপা কাঁপা হাতে তিনি তার উজ্জ্বল টুপিটা মাথা থেকে সরালেন (তার চুল কি পাতলা হয়ে এসেছে, না কি সময় হয়ে এসেছে?)।
২১ পৃষ্ঠার পর
মেয়েটি তার দিকে এক হাত বাড়াল, সে বেশ শান্ত ছিল, কেননা তার সঙ্গে দেখা করার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে বাজারের চারদিকে চক্কর দিচ্ছিল। অ্যালেনস্টেইন কি খুব বড়ো শহর? হয়তো খুব বড়ো, হয়তো মে মাসের লোকের ভিড়ে ওরা একে অপরকে পাশ কাটিয়ে গেছে, হয়তো রেল স্টেশন থেকেই একটা ঘোড়ার গাড়িতে করে ওরা তাকে সোজা হোটেলে নিয়ে গেছে। হয়তো এখানে কোনো বাজারই নেই, হয়তো বৃষ্টি পড়ছিল, কিংবা তিনি হয়তো আসবেন না, হয়তো তার স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে শেষ মুহূর্তে যাত্রা বাতিল করেছেন। কিংবা প্রকাশনার কাজে জার্মানিতে আটকা পড়েছেন, কেননা আর যা-ই হোক তিনি এমন একজন বিখ্যাত লেখক যে, শিক্ষিত সব মানুষ হয়তো তাকে চেনে, কিংবা হয়তো চেনে না, হয়তো তিনিই একমাত্র লোক যে, তার সম্পর্কে কিছু বলা হলে, এমনকি সংবাদপত্রে সামান্য কিছু উল্লেখ থাকলেও তা অনুসরণ করেন। কিংবা তিনি হয়তো নিশ্চিত করেন যে, তার দুই খণ্ডের উপন্যাসটি যেন ঐ বইয়ের দোকানে অবশ্যই রাখা হয়। এবং একমাত্র তিনিই হয়তো হাত দিয়ে অদৃশ্যভাবে বইটির কভার ঝাড়েন, অথচ দাস্তানামোড়া দুই হাত নিয়ে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বই বিক্রেতাকে সম্পূর্ণ অন্যকিছু জিজ্ঞেস করেন।
সকালে পুরো ধারণাটা তার কাছে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক মনে হলো। জোহান তার কোমর জড়িয়ে ধরে মুখে চুমু খেল, তারপর সে প্রাতরাশ করতে গেল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বাচ্চাদের মিউজিক টিচার আসবে। এরপর যখন সে তার হালকা সেদ্ধ ডিমের খোসা কাটছিল, তখন নিজের আঙুলের দিকে নজর পড়ল, কেমন যেন পাতলা আর শুকনো, যেন এগুলো কখনো তার আঙুল ছিল না, আর সঙ্গে সঙ্গে হঠাত্ এক মুহূর্তের জন্য তার মনে অনুশোচনার তীক্ষ অনুভূতি জেগে উঠল। তারপর হঠাত্ অপ্রত্যাশিতভাবে সে বলল যে, কয়েকদিনের জন্য সে ডানজিগে তার বাবার কাছে যেতে চাচ্ছে। ওর স্বামী ন্যাপকিনে ঠোঁট মুছছিলেন, তাকে দেখে মনে হলো না যে, তিনি অবাক হয়েছেন। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে তিনি একটা সিগার ধরালেন। চাকরকে বললেন জানালাটা খুলে দিতে। রাস্তা দিয়ে চলা ঘোড়ার গাড়ি আর ঘোড়ায় টানা ট্রামের ঠনঠন শব্দ জানালা দিয়ে হুড়মুড় করে ডাইনিংরুমে ঢুকল। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির সামনের লাইলাক ফুলের হালকা মিষ্টি সুগন্ধ ভেসে এল।
টুপির বাক্সে একটা চওড়া স্ট্রহ্যাট, কালো জর্জেটের স্কার্ট, বুকের ওপর ঝালর বসানো সাদা ব্লাউজ, রোদ ঠেকাবার জন্য একটা লেসের ছাতা। হাতব্যাগ আর বড়ো চামড়ার সুটকেস। বুটজুতার বোতাম লাগানো। সুগন্ধির ছোট একটা শিশি ভেলভেটের অন্তর্বাসের মধ্যে ঢোকানো। কয়েকজোড়া দস্তানা। এই মালপত্র। ডানজিগ স্টেশন থেকে আ্যাালেনস্টেইনের একটা টিকিট কিনে ক্যাফেতে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করল। বাথরুমের আয়নায় নিজের চেহারা দেখে একটা ধাক্কা খেল—কেননা সে ভেবেছিল, তার বয়স আরো কম। ট্রেনের কামরায় বসে হাতব্যাগ থেকে নেউ ডাচ রানডাশ পত্রিকার একটা পুরনো সংখ্যা বের করে পড়ার প্রচেষ্টা চালাল। এই সংখ্যাটিতে তার একটা গল্প ছিল। একসময় প্রায় পুরো গল্পটা মুখস্থ ছিল; আর এখন দেখল প্রায় পুরো কাহিনিটাই ভুলে গেছে।
ছোট্ট একটা অলৌকিক ব্যাপার ঘটল :অ্যালেনস্টেইন আর ভেনিস একটি আরেকটির পরিপূরক হলো। দশ বছর পর এ দুটো হঠাত্ একটানা চলা একই বস্তুর দুই প্রান্ত হয়ে দাঁড়াল, তার জীবনের অনেকখানির মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়াল। উত্তর এবং দক্ষিণ। শুকনো এবং ভেজা। অতীত এবং সময়ের অবর্তমানতা। পেছন ফিরে দেখা এবং সামনে তাকান। বৈষম্যের সমাবেশ।
তার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল সমুদ্রসৈকতে। তিনি উজ্জ্বল পোশাক এবং উজ্জ্বল হ্যাট পরেছিলেন। সে তাকে চিনেছিল, অবশ্য কোনো মানুষকে একবার দেখলে তার ঠিকই মনে থাকে। সৈকতে তাকে বেশ উচ্ছল এবং তারুণ্যে ভরপুর দেখাচ্ছিল। তারপর যখন ওদের পরিচয় হলো, তখন তাকে মনে হলো যেন মুখোশপরা একজন লোক। তিনি বললেন, ‘আমি একজন লেখক’ তবে একথাটা তার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। তিনি একটু হতভম্ব হলেন। তার চোখে চোখে তাকাতে পারছিলেন না। ওদের দুজনের পরিচিত লোকটি চেয়ার থেকে দ্রুত উঠে বলল, সে একটা গাধা। তারপর সবকিছু হওয়ার পর যখন হোটেলে তার বাথরুমটা প্রথম দেখল, তখন তার ধারণা হলো যে, কেবল এখন সে তাকে চিনেছে। অন্তরঙ্গভাবে কাটানো সন্ধ্যাটি নয়, যেখানে তার দেহকে চেনাজানার সঙ্গে সে যে লোকটির ভেতরে ঢুকতে পেরেছিল, যা যন্ত্রবত্ নয় প্রচণ্ড আবেগময় ছিল, সেটা বরং ছিল সেই হোটেলের বাথরুম, যা দেখে সে তাকে চিনতে পেরেছিল। তোয়ালেটা বাথটাবের ওপর পড়ে রয়েছে, শেভিংয়ের জিনিসগুলো, শেভিং ব্রাশ, পানিতে ক্ষয়ে যাওয়া ব্রাশের হাতল, কাঠের সাবানদানি। নিশ্চল কতগুলো প্রাণী, একটি মানবদেহের অস্তিত্বের সাক্ষী। এই জিনিসগুলো সে স্পর্শ করল, এদিকে তিনি তখনো ঘুমিয়ে রয়েছেন। উদ্দাম ভালোবাসার একটি সন্ধ্যা কাটাবার পর সকালের এই নিস্তব্ধতা কেমন যেন একটু অস্বস্তিকর মনে হচ্ছিল। হঠাত্ তার মনে কেমন একটা ভাবাবেগ জেগে উঠল। অনুভব করল যেন সে এখন ঠান্ডা আয়নায় মাথা ঠেকিয়ে একটু কাঁদবে।
সবসময় এই মুহূর্তটা তার মনে পড়ত—এটাই হয়তো ছিল তার ভালোবাসার শুরু। ভালোবাসা মানে কি আসলে একজনকে জানা নয়? এই কারণেই কি মানুষ একে অন্যের দেহকে চায়, তবে সেটা আনন্দের জন্য নয়, বরং যতদূর সম্ভব কাছাকাছি হওয়ার জন্য? সমস্ত সীমান্ত ছাড়িয়ে ভেতরে কী আছে জানার অন্বেষণে একটি দেহের সর্বত্র জোর করে প্রবেশ করা।
অ্যালেনস্টেইন স্টেশনটা যা ভেবেছিল তার চেয়ে ছোট মনে হলো। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে একটা আতঙ্ক জেগে উঠল—তার অজান্তে ট্রেনের সিঁড়ির শীতল হ্যান্ডরেইলটা চেপে ধরল। তবে ভাড়া করা গাড়ির চালক যখন তাকে শহরের সেরা হোটেলে পৌঁছে দিল, তখন হঠাত্ অনুভব করল যেন পুরো পৃথিবীর ওপর সে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ধরে রখেছে। আশপাশের লোকগুলোকে কেমন যেন খাটো হয়ে যাওয়া এবং দ্বিমাত্রিক মনে হচ্ছিল, যারা কিছুই জানে না, কিছুই অনুভব করে না, নরম কতগুলো কলের পুতুল। করুণ চেহারার ছোট ছোট দোকান, তাদের মুখগুলো কোনো বিষয়ে সচেতন নয়, যে মুখ এই মুহূর্তে একটা কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল, তাদের আত্মকেন্দ্রিক দেহ, তাদের অদ্ভুত আচরণ, যেমন হ্যাট মাথায় ইতস্তত ঘুরে বেড়ানো, হাতের বেতের লাঠিটা যত জোরে সম্ভব চেপে ধরা, পুরনো ডিভান দিয়ে সাজানো তাদের সাদামাটা বাড়িঘরের গুরুত্বহীন একঘেয়ে সন্ধ্যা, তাদের সীমিত উপলব্ধিবোধ। সবকিছু পুতুলনাচের ছোট ছোট পুতুলের মতো। তবে এখন পুরুষের মতো পেছনের সিটে পা ছড়িয়ে বসে ঘোড়ারগাড়িতে চড়ে যেতে যেতে, অনুভব করল সে ওদের ভালোবাসে। ওদের প্রতি সহানুভূতিশীল হলো, তবে সেটা করুণা নয়। আসলে এটা ছিল ভালোবাসা, ঠিক ছোট বাচ্চারা যেমন তাদের লক্ষ না জেনেই তাদের বাবা-মায়ের পড়াশোনার পরিকল্পনা মেনে নেয়। আর এখন গাড়িতে সোজা হয়ে বসে, সে আরো কিছু দেখল। কিছু নিয়ম ঠিক করল। ছোট ছোট কতগুলো নিয়ম।
হোটেলে ঢুকে রেজিস্ট্রারে বানানো একটা নাম লিখতে লিখতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে রিসিপশনিস্টকে জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কি সত্যি যে, বিখ্যাত লেখকটি আজ রাতে এই হোটেলে থাকছেন?’
রিসিপশনিস্ট ওর দিকে চোখ তুলে তাকাল, চশমার নোংরা কাচের মধ্য দিয়ে তার চোখদুটো বিকৃত দেখাচ্ছিল। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে, অতিকষ্টে সে তার উত্তেজনা আর গর্ব চেপে রাখছে।
লোকটি বলল, ‘হ্যাঁ, কথাটা সত্য। সংগীত আর সাহিত্য বিষয় সম্পর্কে আগামীকাল তার রচনা থেকে পাঠ করতে চলেছেন। আগামীকাল দুপুরে।’ কথাটা শেষ করেই আবার একটু গম্ভীর হয়ে বলে চলল, ‘দয়া করে কাউকে একথাটা বলবেন না যে, তিনি এই হোটেলে থাকছেন। তবে এখানে তো আসলে আর কোনো হোটেল নেই, এটাই সবচেয়ে ভালো হোটেল। আমরা তার জন্য একটা স্যুট রেখেছি। গত কয়েকদিন থেকেই এটা রেডি করে রাখা হয়েছে।’
তারপর একপাশে রোমান সংখ্যা লেখার নিচে ঝুলে থাকা একটা চাবির দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘আমাদের আশঙ্কা তার পাঠকেরা তাকে মোটেই শান্তিতে থাকতে দেবে না।’
সে জিজ্ঞেস করল, ‘তিনি কী আসলেই তেমন জনপ্রিয়?’
লোকটি উত্তর দিল, ‘আমার স্ত্রী তার সব রচনা পড়েছে।’ যেন এটাই সবকিছু ব্যাখ্যা করবে।
সে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা বার্লিন থেকে ট্রেনটা কখন আসে? আমি একজনের জন্য অপেক্ষা করছি।’
রিসিপশনিস্ট তার দিকে একটু সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেও সময়টা ঠিকই বলল।
কামরাটা মোটেই ভালো নয়। মূল সড়কের দিকে মুখ করা দুটো লম্বা কাচের দরজা রয়েছে। চৌকাঠে কতগুলো পায়রা দেখা যাচ্ছে।
মুখ ধুয়ে রুক্ষ একটা তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছল। তারপর ব্লাউজ বদলাল। চুল আঁচড়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বেশ সাবধানে পিন আটকাল, আয়নাটা বেশ উঁচুতে ঝোলানো; কেবল চোখ আর কপাল দেখা যাচ্ছে। একটু সুগন্ধি গায়ে মাখল। ভাবল হাতে এখনো বেশ কিছু সময় আছে, এই ফাঁকে বাইরে একটু চক্কর দিয়ে আসতে পারে। কিছু কেনাকাটা করতে পারে। দোকানের জানালায় তার প্রতিবিম্ব ছেড়ে আসতে পারে, বাজারের অনিশ্চিত বিশালতা দেখতে পারে। একটা ছাতার নিচে বসে লেমোনেড খেতে পারে। টুপি মাথায় দিল, কিন্তু তারপর হঠাত্ দ্রুত দরজা থেকে ফিরে এসে জামাকাপড়সুদ্ধ, ছাতা হাতে নিয়ে চিত্ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ছাদের সিলিংয়ের সূক্ষ ফাটলগুলো কতগুলো রহস্যময় অক্ষরের মাধ্যমে তাকে কিছু ইঙ্গিত দিল।
ওরা সারাদিন শহরে ঘুরে বেড়ালো। ভেনিসে এখন স্যাঁতসেঁতে গরম। খালগুলো পূতিগন্ধময়। ওরা দ্রুতপায়ে হাঁটছিল—যেন কোথাও যেতে চাচ্ছে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছিল, ‘আচ্ছা, আমরা কেন সবসময় এমন তাড়াহুড়া করছি।’ তারপর হেসে উঠল। আসল উদ্দেশ্য ছিল, হাঁটার সময় বাহুতে বাহুতে যেন ঘষা লাগে, কাঁধে কাঁধ স্পর্শ করে, হাওয়ায় তাদের গায়ের গন্ধ পরস্পরের কাছে ভেসে আসে। কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে হাঁটলেও, কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছিল না, তবে একজন ঠিকই অপর জনের নজরে ছিল। এটা কেমন করে সম্ভব? তিনি অবিরাম তার পরিবারের কথা বলে যাচ্ছিলেন। এটা শুনে সে একটু অবাক হয়েছিল, কেননা এই বিষয়ে তার বলার মতো কিছুই ছিল না। তবে তিনি কথা বলেই চলেছেন, যেন তিনি তাকে তার অস্তিত্ব সম্পর্কে আশ্বস্ত করতে চান, যেন তিনি তার রক্তে হ্যানসেটিক বণিক এবং তাদের সন্তান জন্ম দিতে দিতে ক্লান্ত স্ত্রী, তাদের সন্তান এবং সেই অশুভ গোঁফওয়ালা ওলন্দাজদের বংশধারা বহন করছেন। তিনি এদেরকে সময়ের মানুষ বলেন। হয়তো এ কারণেই একজন মানুষ লেখক হয়। তিনি তাদের নামগুলো মনে রেখেছেন এবং মজা করে নামগুলো বলছিলেন, তাদের হঠকারিতা আর আজব অভ্যাসের কথা বলছিলেন। উদারভাবে প্রত্যেককে এক-একটা বৈশিষ্ট্য দিচ্ছিলেন। তবে সে তার কথা বিশ্বাস করেনি—সবাই ইন্টারেস্টিং হবে এটা অসম্ভব এবং অযৌক্তিক। পৃথিবী একটি বিশৃঙ্খল জনতা এবং অত্যন্ত অল্পসংখ্যক আসাধারণ বা অদ্ভুত মানুষ নিয়ে গঠিত, সে তা-ই মনে করে। তার কাছে জনতা একটি ঢেউয়ের মতো, কোনো পার্থক্য করা যায় না, কেবল যাদেরকে সে ভালোবাসে তারা ছাড়া। সকলকে ভালোবাসা অসম্ভব।
কেবল যখন ওরা কিছু্ক্ষণের জন্য কোথাও বসে, শূন্য সৈকতের একটি ক্যাফের চেয়ারে কিংবা কোনো জেটির বোর্ডের ওপর, কেবল তখন অবশেষে চার চোখের মিলন হয়। কিছুই বলার মতো থাকে না। সে তার গায়ে হেলান দিতে চায়। যখনই তিনি তার দিকে তাকান, তখনই সে এটা তার চামড়ায় অনুভব করে। সেই পরিষ্কার, উজ্জ্বল নীল চোখের চাহনি নির্লজ্জ হয়ে রয়েছে।
সন্ধ্যায় ওরা অন্যান্য মানুষের সঙ্গে ল্যাগুনের বারান্দায় বসে। গাছের পাতাগুলো ল্যাম্পের আলোয় হলুদ হয়ে একটি অপ্রত্যাশিত আঞ্চলিক তেপান্তরের অলিকতা বা বিভ্রম তৈরি করেছে। এই বন্ধু আর দুজনার পরিচিত এই হাসিখুশি গল্পকরা মানুষের ছোট্ট ভিড়, এই বন্ধুরা একটি দ্বীপ, যেখানে ওরা একমুহূর্তের জন্য নোঙর করতে পারে, পায়ের নিচে মাটি অনুভব করতে পারে। যদিও ভেসে যাওয়াটাই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
বাড়িটা একটা ভাঁটুই গাছের আড়ালে ছিল। চারপাশ ঘিরে একটা উঁচু বেড়া। সে চুপি চুপি সেখানে গেল, জানে তিনি ওখানে রয়েছেন। কেবল একবার তাকে দেখবে। হঠাত্ অনুভব করল সে তো উদোম গায়ে রয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা থেকে এক লাফ দিয়ে ভাঁটুই গাছের সারির মধ্যে ঢুকে পড়ল। পেছন দিক থেকে এসে ভাঁটুই গাছগুলোর মধ্য দিয়ে বাগানের দিকে হেঁটে চলল। এখন সে ঘরের আলোকিত জানালা দেখতে পাচ্ছে। মনে হলো কোনো একটা অনুষ্ঠান চলছে। ওয়াইনের গ্লাস হাতে অনেক লোক জানালার শার্সির কাচের পেছনে ঘোরাফেরা করছে। কাচের পেছনে তাদের ঠোঁটের নিঃশব্দ নাড়াচাড়া দেখা যাচ্ছে। নীল পোশাকপরা সুন্দর মহিলাটি তার স্ত্রী। তিনি সবার দিকে তাকিয়ে সমানভাবে হাসছেন। কী চমত্কারভাবে সবকিছু সামলাচ্ছেন! গাছের কাঁটা তার গায়ে বিঁধছিল। এই ঘরে তিনি নেই। তিনি ওখানে নেই।
হঠাত্ সে জেগে উঠল। কাঁধে হ্যাটের খোঁচা লাগছিল। উঠে দাঁড়িয়ে আয়নার দিকে তাকাল—চোখদুটো একটু ফোলা ফোলা আর ভেজা মনে হচ্ছে। এখন সময় হয়েছে।
একটা ক্রুসের মতো অ্যালেনস্টেইনের দুটো রাস্তা রয়েছে এবং এই রাস্তাগুলোতে একটি দুর্গ, একটা টাউন হল এবং বিগত বছরের ফ্যাশন চলছে। এখানে বসবাস করা সম্ভব নয়, কেবল বেড়াতে আসা যায়। প্রুশিয়ান এবং এশিয়াটিক বিষণ্নতা। পানির মৃদু ঘ্রাণ। ঘড়িতে তিনটা বাজার ঘণ্টা দিতেই সে কফির অর্ডার দিল। বাচ্চারা এখন হয়তো ঘুমিয়ে রয়েছে। হঠাত্ তাদের শরীরের ঘ্রাণ পেতে আকুল আকাঙ্ক্ষা জাগল—আচ্ছা বাচ্চাদের চুলে সবসময় কেন বাতাসের গন্ধ পাওয়া যায়? ওয়েটার টাকাটা নিয়ে তার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকাল। তারপর সে ধীরে ধীরে স্টেশনের দিকে এগোল। হূদপিণ্ডের স্পন্দন দ্রুততর হচ্ছে। সেই মুহূর্তে তার নিজেকে দ্বিমাত্রিক মনে হচ্ছিল, যেন সেই মুহূর্তের বাইরে তার অস্তিত্ব নেই, যেন তার কোনো ভবিষ্যত্ কিংবা অতীত নেই। একজন নারী স্টেশনের দিকে হেঁটে চলেছে। আর কিছু নয়।
প্ল্যাটফর্ম প্রায় খালি—ফুলের তোড়া নিয়ে একজন তরুণ, দুই বাচ্চা নিয়ে একজন মহিলা এবং বেঞ্চে বসে রয়েছে একধরনের যাত্রী, যারা সবসময় দেরিতে আসে, যাদের ট্রেন অনেক দূর দিয়ে চলে যায়। তার একটু পর একটি দল এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষ, একজন একটু মোটাসোটা, আরেকজন তারের ফ্রেমের চশমাপরা, আরেকজন সুন্দর কালো স্যুট আর চোখে মনোকল পরা। এই লোকটির দিকে তাকিয়ে ওর মনে হলো, সে মুর্দাফরাশের দফতর থেকে এসেছে। তৃতীয় এবং চতুর্থ লোকগুলো ব্যক্তিত্বহীন মনে হলো। এরাই হবে সেই দল। অ্যালেনস্টেইনের উচ্চ সংস্কৃতি মহলের প্রতিনিধি, একজন লেখকের আগমনের অপেক্ষায় রয়েছে। এরপর ছাত্রছাত্রীদের বেশ বড়ো একটি দল এল। জায়গাটির পরিবেশ হঠাত্ বদলে গেল, বেশ হৈচৈ হট্টগোল নিয়ে একটি চলমান চরিত্র পেল। এটা কি একটা ফিল্ডট্রিপ, একটা পিকনিক, প্রুশিয়ান স্কুলগুলোতে কি আজ ছুটি দেওয়া হয়েছে? বয়স্ক শিক্ষকটি নিয়ম শৃঙ্খলা আনার জন্য ব্যর্থ চেষ্টা করলেন।
কী আশ্চর্য—ভেনিসে যখন ওরা আলাদা হচ্ছিল তখন তিনি কাঁদছিলেন। তিনি তার দুই হাত জাপটে ধরলেন, শীতল, নীল চোখদুটোতে পানি টলটল করছে। তিনি বললেন, ‘দ্যাখো কী বোকার মতো কাঁদছি, আমাদের তো আবার দেখা হবেই।’ সে ভাবছিল, তার ওকে প্রস্তাব করা উচিত; এসব ব্যাপারে তিনি ঐতিহ্য মেনে চলেন। সে ভাবছিল, ‘কী বোকা, প্রস্তাব করা, যেকোনোভাবে আবার আমরা একত্রিত হব’, বাক্যটা তার মাথার মধ্যে ঝমঝম করছিল। আর কোনো সম্ভাবনা এখন সম্পূর্ণ অকল্পনীয়।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)