ভিয়েতনামের সুগন্ধি প্যাগোডা

হ্যানয়ের এম হোটেলের রিসেপশন কাউন্টারের মহিলা কর্মী হোআ শহরের বাইরের দ্রষ্টব্য জায়গাগুলোর মধ্যে ‘পারফিউম প্যাগোডা’র নাম উল্লেখ করেছিল। এমনিতে টেম্পল, প্যাগোডা—এসব দেখার মধ্যে খুব কম ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু এই নামটি আমাকে খুব আকর্ষণ করে। আমি ওকে সেই সুগন্ধি প্যাগোডার গ্রুপ ট্রিপে আমার জন্য একটা বুকিং দিতে বললে ও ভাঙা ইংরেজিতে বলে, পারফিউম প্যাগোডায় গেলে এনজয় করবেন। 

পরদিন সকালে নাস্তার পর মিনি বাস আরো সব ট্যুরিস্ট নিয়ে আমাকে হোটেল থেকে তুলে নেয়। আমাদের বহরে আছে স্কটল্যান্ডের এক প্রৌঢ়া, দুই জার্মান বৃদ্ধা, এক থাই যুবক, উগ্র সুন্দরী স্ত্রী-সহ এক ভিয়েতনামি দম্পতিসহ মোট জনা পনেরো পুরুষ ও মহিলা।

হ্যানয় শহরের এ-রাস্তা-সে-রাস্তা ঘুরে বাস একসময় বড় রাস্তায় উঠে আসে। রাস্তার দুই পাশে সেই চিরপরিচিত ধানগাছের সবুজ চারা লাগানো দিগন্তবিস্তৃত মাঠ। মাঠের কাদা তখনো কাঁচা, বাঁশের টোকা মাথায় শার্ট-প্যান্ট পরিহিতা কিষানী ঝুঁকে পড়ে কাজ করছে জমিতে, আলের ওপর ব্যতিক্রমহীনভাবে কাত করে রাখা সাইকেল। সকালের আকাশ মেঘভারানত, ওপরের গর্ভিনী মেঘ আর নিচে জলমগ্ন জমি মিলে একটা সজল আবহ। ভিয়েতনামের গ্রামাঞ্চলের দিগন্তপ্রসারী শস্যক্ষেতের মাঝখানে কোনো ঘরবাড়ি চোখে পড়ে না। অবশ্য চোখে পড়ার কথাও নয়। প্রায় ৩ লক্ষ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটিতে জনসংখ্যা মাত্র ৮ কোটি ৭০ লক্ষ। অন্যদিকে বাংলাদেশের ১ লক্ষ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের মধ্যে গাদাগাদি করে বাস করে ১৫ কোটির ওপর মানুষ। মাঝে মাঝে বাজার বা লোকালয়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে স্কুলগামী ছেলেমেয়ের দল, সাইকেল আরোহী মানুষের মিছিল। ভিয়েতনামের এসব মানুষজন দেখলেই আমার কেবল মনে পড়ে তাদের অদম্য সাহস এবং কষ্ট সহিষ্ণুতার কথা। একটা দীর্ঘ যুদ্ধের পর ভিয়েতনামের মানুষ চরম ত্যাগ এবং দুর্দশার ভেতর দিয়ে দেশটিকে প্রায় নতুনভাবে গড়ে তুলে আজ যে পর্যায়ে নিয়ে এসেছে, তার জন্য জাতিটির প্রতি নিজের অজান্তেই মাথা হেঁট হয়ে আসে।

একসময় বড়ো রাস্তা ছেড়ে বাস গ্রামের ভেতরের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে। তখন পাল্টে যায় দৃশ্যপট। ছোট ছোট লোকালয়ের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে কাছ থেকে চোখে পড়ে হাঁসের খামার, ছোটখাটো পাড়ার দোকান, কখনো বা খালি অথবা মালভর্তি দুয়েকটা ট্রাক্টর পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ধানের চারা রোপনের প্রস্তুতি হিসেবে কাদাভর্তি মাঠে চাষ দিচ্ছে পাওয়ার টিলার। খুব বেশি মানুষজন দেখা যায় না তেমন। মানুষজন বাদ দিলে অবিকল বাংলাদেশের গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া এলজিইডি-র রাস্তার দু পাশের মতো দৃশ্য।

ভ্যান দিন শহরতলি পেরিয়ে যে বাজার মতো জায়গায় একসময় বাস এসে থামে তার নাম বেন ডাক। গাইড স্যাম বাস থেকে নামার আগে ঘোষণা দেয়, এখানে আমাদের যাত্রার প্রথম পর্ব শেষ, এখান থেকে নৌকায় করে আমাদের দ্বিতীয় পর্বের যাত্রা শুরু। ও আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় বাজারের পাশে একটা অপ্রশস্ত খালের পাড়ে, তার বাঁধানো পাড়ের সাথে সারি দিয়ে বাঁধা রয়েছে একই সাইজের এবং একই রকম শত শত ডিঙি নৌকা। কোনোটিই কাঠের নয়, সবকটিই খয়েরি রঙের স্টিলের, বসার ব্যবস্থা আমাদের ডিঙির মতোই, আড়াআড়ি বসানো অপ্রশস্ত কাঠের তক্তার ওপর বসে খোলের ভেতর পা নামিয়ে দিতে হয়। একেকটা ডিঙিতে আট জনের মতো বসতে পারে। দু খানা ডিঙিতে ভাগ হয়ে আমরা বসি। আমাদের মাঝি এক মাঝবয়সী মহিলা। অভ্যস্ত হাতে বৈঠা বেয়ে ডিঙিখানাকে পাড় বাঁধানো খাল থেকে নদীতে নিয়ে আসে মাঝিনী। নদীর নাম ইয়েন ভি। শান্ত টলটলে জলের নদীটির পাশে কোনো উঁচু পাড় নেই, ফলে দু পাশের দৃশ্যপট ভিন্নমাত্রায় চোখে পড়ে। নদীর একপাশে তাকালে ছড়ানো ছিটানো অনুচ্চ পাহাড়সারি, তার মাঝে কোথাও কোথাও পাথরের স্তরবিন্যাস। কোথাও চোখে পড়ছে ছোটখাটো দুয়েকটা সাধারণ ঘর—স্থানীয় জেলে বা চাষিদের হয়তো। নদীর মাঝখানে নোঙর করে মাছ ধরছে জেলেনী, তবে কায়দাটা অন্যরকম। বোতলের আকৃতির অনেকগুলো বাঁশ বা বেতের ঝুড়ি দড়ির গায়ে পর পর মালার মতো বেঁধে পানিতে নামিয়ে দেওয়া হয়, তারপর নির্দিষ্ট সময় পরে পানি থেকে উঠিয়ে ঝুড়িগুলো থেকে সংগ্রহ করা হয় আটকে পড়া মাছ। যাত্রাপথে দেখা মেলে আমাদেরটির মতো অসংখ্য ডিঙি নৌকার, কোনোটি যাচ্ছে আমাদের সামনে বা পেছনে, কোনোটি ফিরছে। লক্ষ করি সবকয়টি ডিঙির মাঝি মেয়ে। দুয়েকটাতে চোখে পড়ে খুব সুন্দরী বৈঠা বাইছে, মাথায় সেই চিরপরিচিত কৌণিক টোকা, পরিশ্রমে চেহারা বিকৃত, বৈঠার উত্থানপতনের সাথে সাথে উদ্যত আর নমিত হচ্ছে নমনীয় শরীর।

আমার পাশে বসেছিল ছোটখাটো গড়নের এক স্কটিশ প্রৌঢ়া, আলাপে আলাপে জানা গেল হ্যানয়ে ওর বোন শিক্ষকতা করে, সেই বোনের কাছে বেড়াতে এসেছেন মহিলা। ইনি নিজেও পেশায় শিক্ষক, তাই ভিয়েতনাম সম্পর্কে আমাদের আলাপগুলো হয় অনেকটা অ্যাকাডেমিক। আমরা দেশটির কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পর খাদ্যোত্পাদনে অভাবনীয় সাফল্যের ও তার কারণ নিয়ে আলোচনা করি। যাত্রাপথে সবকয়টি নৌকার পাটনি মহিলা হওয়া বিষয়ক আলোচনায় চলে আসে নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং আমরা একমত হই যে মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠী মাতৃতান্ত্রিক ছিল বিধায় এশিয়ার মঙ্গোলীয় জাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে মেয়েরাই অপেক্ষাকৃত বেশি কাজকর্ম করে। ভিয়েতনামের জনসংখ্যা বিষয়ক পরিসংখ্যান সম্পর্কে আমার জ্ঞান সীমিত হলেও ভদ্রমহিলার দেখলাম সড়-গড়। তিনি আমাকে জানান, দেশটির বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যা আশ্চর্যরকম একপেশে, অর্থাত্ ৬৫ বছর বয়স্ক জনসমষ্টি দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র সাড়ে পাঁচ শতাংশ, এই বয়স্ক শ্রেণীর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা মাত্র ৩৭ শতাংশ, বাকি ৬৩ শতাংশ মহিলা। আমি বলি, এর কারণ খুব সোজা, ভিয়েতনাম যুদ্ধে দেশের পুরুষ জনসংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে গিয়েছিল। ভদ্রমহিলা আমাকে তার ক্লাশের পড়া বলতে পারা ছাত্রের মতো গণ্য করে বলেন, ইউ আর একজাক্টলি রাইট। তবে কি জানেন? যুদ্ধপরবর্তী সময় থেকে শুরু করে ভিয়েতনামের পুরুষ জনসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। একসময় পুরুষ-মেয়ে অনুপাত সমান থাকলেও বিগত বছরগুলোতে এই অনুপাত ১০০ আর ১১০ হয়ে গেছে, অর্থাত্ ১০০ জন মেয়ে জন্মালে ছেলে জন্মাচ্ছে ১১০ জন।

আমি ভদ্রমহিলার জ্ঞানে বিমুগ্ধ হয়ে বলি, আপনি কি ডেমোগ্রাফির স্টুডেন্ট নাকি?

তিনি হেসে বলেন, আরে না, একটা দেশ দেখতে এলে সে দেশ সম্পর্কে পড়াশোনা করে আসতে হয়। তো পড়াশোনার মধ্যে ভিয়েতনামের এই বিষয়টি আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছে।

আমাদের কথার ফাঁকে ফাঁকে কানে আসে বৈঠার ছলাত্ ছলাত্ শব্দ, কিংবা পাশ কাটিয়ে যাওয়া নৌকার যাত্রীদের অস্পষ্ট কথাবার্তা—এছাড়া চরাচরে আর কোনো শব্দ নেই যেন। মাঝে মাঝে পাশের জঙ্গল থেকে ভেসে আসে অচেনা পাখির ডাক। নদীটিতে যান্ত্রিক নৌযান নিষিদ্ধ বলে পুরো যাত্রাপথে কোনো মোটর বোট নেই, তাই নেই শব্দদূষণ। কোনো মোটর বোট না থাকায় আমি বিস্ময় প্রকাশ করলে স্কটিশ মহিলাটি আবার তার আহরিত জ্ঞান আমার সাথে শেয়ার করেন, এখানকার গরিব মানুষের কর্মসংস্থানের জন্যই এ নদীতে কোনো মটর বোট চলা নিষিদ্ধ। আমি মনে মনে বলি, সাবাস, এ নাহলে সমাজতান্ত্রিক দেশ! 

তীর্থে যাওয়ার পথ বলেই হয়তো নদীভর্তি এতগুলো নৌকায় এত মানুষ, অথচ কোনো কোলাহল নেই, উচ্চকণ্ঠে কথাবার্তাও নেই কোথাও। আমরা প্রায় পৌনে একঘণ্টা ধরে চলছি, অর্থাত্ আমাদের মাঝি মেয়েটিও একনাগাড়ে এতক্ষণ বৈঠা বাইছে কোনো বিশ্রাম ছাড়া—বিষয়টা অবাক করার মতো। তবে অবাক হই কীভাবে? ভিয়েতনামিরা সারা পৃথিবীর লোককে তো একবার অবাক করেছেই।

ভিয়েতনামি ভাষায় ‘চুআ হুঅং’ অর্থাত্ সুগন্ধি প্যাগোডা নির্দিষ্ট কোনো একটা প্যাগোডার নাম নয়, বেশকিছু মন্দির মিলে এই বিশাল কমপ্লেক্স, যার কেন্দ্রে রয়েছে ‘হুঅং ট্রিক’ গুহা আর মন্দির। এখানকার পাহাড়, নদী আর অরণ্য দেশটির উত্তরাংশের সমতল ভূপ্রকৃতিতে বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারকদের জন্য ছিল যেন এক মরুদ্যান। ভিয়েতনামের শিল্পে সাহিত্যেও সুগন্ধি প্যাগোডার প্রভাব ব্যাপক। প্রাচ্যের দর্শন আর শিল্পের যাবতীয় উপাদান সবই এখানে উপস্থিত বলে বহু ভিয়েতনামি গান, কবিতা আর পেইন্টিং-এ ঘুরে ফিরে এসেছে এই তীর্থস্থানের নাম। ফেব্রুয়ারি আর মার্চ মাসের বিভিন্ন দিনে চান্দ্র মাসের নির্দিষ্ট তারিখে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ এখানে তীর্থে আসে।

দূর থেকে নদীর পাড়ে বেশকিছু দোকানপাট আর তার সামনে তীরঘেঁষে এরকম ডিঙি নৌকার সারি দেখে বুঝতে পারলাম আমাদের গন্তব্য ওটাই। আমরা যেখানে নামি সেখানে খোলামেলা রেস্তোরাঁর সারি। ভেতরে উনুনে রান্না হচ্ছে রকমারি খাবার। প্রত্যেক রেস্তোরাঁর সামনে দড়িতে বেঁধে ঝোলানো রয়েছে কয়েক রকম পশুর মৃতদেহ। কাছ থেকে ওগুলোকে চেনার চেষ্টা করলাম, চেনা মনে হলো না—হরিণ, কুকুর, এমনকি বনবিড়ালের মতো দেখতে ঈষত্ ডোরাকাটাও ছিল একটা। কোনো কোনোটার কিছু অংশ কেটে নেওয়া হয়েছে খদ্দেরের চাহিদামতো রান্না করার জন্য। আমাদের দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা এগুলোর কোনো একটাতে করা হয়েছে কি না ভেবে ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে যাই। তবে স্যাম আমাদের পথ দেখিয়ে সামনের দিকে নিয়ে যায়। নদীর কিনারা থেকে কাঁচা এবং খোয়া বিছানো পথে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠতে থাকি আমরা। পথের দুই ধারে দোকানপাটে সাজানো রয়েছে হস্তশিল্প, সাধারণ মনিহারী জিনিসপত্র, ফুল। এসবের পরে আছে চোখ ধাঁধানো সোনালি রঙের রকমারি থালা, বুদ্ধমূর্তি, লম্বা ডাঁটিতে লাল রিবন জড়ানো সোনালি রঙের কৃত্রিম ফুলের গুচ্ছ, সস্তা প্লাস্টিকের ফুল, তার সাথেই রয়েছে কাঁচকলার কাঁদি। বোঝা যায় এগুলো সবই পূজার উপকরণ। সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনামে ধর্মাচারের প্রবণতা বেড়েছে নিশ্চয়ই। তা না হলে এই সুগন্ধি প্যাগোডায় এত পূজারীর সমাগম হয় কীভাবে? স্যাম বিভিন্ন দোকানের সামনে থেকে সবাইকে বহু কষ্টে জড়ো করে বলে, এখন আমরা নামবো হুঅং ট্রিক গুহায়। তারপর ড্রাগনের মুখের মতো গুহামুখের গেটের কাছে এসে বলে, নিচ থেকে উঠে এসে আমরা আবার এখানে জড়ো হবো, কেউ হারিয়ে যাবেন না যেন।

গুহাটির সদর দরজা থেকে পাথরের চওড়া সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে একসময় চোখে পড়ে নিচের অপরিচ্ছন্ন গহ্বরে মানুষের ভিড় থিকথিক করছে। গুহার হাঁ-মুখের মাঝ বরাবর ওপর থেকে নেমে এসেছে চুনাপাথরের এবড়ো-থেবড়ো স্তম্ভ, শরীর থেকে ঝুলে আছে বটের ঝুড়ির মতো পাথর হয়ে যাওয়া চুনাপাথরের কাই। এগুলোর আবার আলাদা আলাদা নাম আছে, যেমন—অন্ন দণ্ড, সোনালি দণ্ড, রেশম গুটি, বালক-বালিকার মস্তকসদৃশ যে ঝুলন্ত পাথর, নাম আছে সেগুলোরও। কোনো প্রাকৃতিক বিস্ময়কে এভাবে উপাসনালয়ে পরিণত করার প্রবণতাও প্রাচ্যদেশীয় রীতি। স্তম্ভটির চারপাশে ঢাকার ফার্মগেটের মতো মানুষের এলোমেলো ভিড়, ভিড়ের পেছনের অংশ ঢেকে আছে মলিন আলোর অন্ধকারে। লোকগাথা অনুসারে গুহাটি আবিষ্কৃত হয়েছিল প্রায় দুই হাজার বছর আগে। তবে স্থানীয় লোকজন এখানে মন্দির বানিয়ে উপাসনা শুরু করে ১৫৭৫ সালের দিকে। পরে তৈরি করা হয় বড় মন্দির। আর এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে এটিকে ঘিরে তৈরি হয় অন্যসব উপাসনাগৃহ।

নিচে নেমে আসার পর স্পষ্ট হয় ভিড়ের চরিত্র। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশি, আর আছে আমাদের মতো ট্যুরিস্ট। গুহার মেঝেতে কাগজ, গাছের পাতা—এসব ছড়ানো ছিটানো। বয়স্ক নারী-পুরুষ সেই অপরিচ্ছন্ন মেঝেতে বসে বিশ্রামে রত। স্যাম এদিক ওদিক ঘুরে আমাদের দলের লোকজনকে চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু এরকম বিশৃঙ্খল ভিড়ের ভেতর কাজটা মোটেই সহজ নয় ভেবে হাল ছেড়ে দিয়ে আমাকে আর থাই যুবকটিকে পাকড়াও করে। থাই যুবকের সাথে ততক্ষণে আমার আলাপ পরিচয় হয়ে গেছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা বড়োসড়ো খাতায় ওকে কিছু লিখতে দেখে আমি এগিয়ে গিয়ে বলি, কী, নোট নিচ্ছেন বুঝি? 

ওর পরনে ঢোলা পাজামা আর তেমনি ঢোলা শার্ট। ও খাতাটা মুড়ে রেখে বলে, আসলে আমি একজন লেখক, ফিরে গিয়ে ভিয়েতনামের ওপর লিখব বলে সবকিছু টুকে রাখছি।

আমি ভেতরে ভেতরে হতাশ হয়ে পড়ি—এই না হলে লেখক! আমিও লিখব, আমার সাথে হোটেলের রুম থেকে নিয়ে আসা ছোট নোট শিটের প্যাড ছাড়া আর কিছু নেই, তবে তাতে এক বর্ণও লিখিনি। ছাত্রাবস্থায় পড়ুয়া ভালো ছাত্রদের সামনে আমাকে যে রকম অনুজ্জল মনে হতো, ওর সামনেও সেরকম লাগে। স্যাম আমাদের কাছে এসে বলে, সবকিছু দেখলেন? আমি এখনো দেখিনি জানালে ও আমাকে আর থাই লেখককে চুনাপাথরের বিশাল চওড়া থামের ওপাশে নিয়ে গিয়ে বলে, এই গুহার এপাশ দিয়ে পার্থিব জগতের পথ আর ওপাশ হচ্ছে স্বর্গের পথ, মানুষকে বেছে নিতে হয় কোন পথে সে যাবে। স্যামের অস্পষ্ট পথনির্দেশে কোনটা পৃথিবী আর কোনটা স্বর্গের পথ ঠিক বোঝা যায় না বলে আমি কিংবা শ্যামদেশীয় সেই লেখক সঠিক গন্তব্য নির্ধারণ করতে না পেরে অগত্যা গুহার অন্ধকার জঠরের গভীরে যাত্রা করি। হুঅং ট্রিক গুহায় বিভিন্ন দেব-দেবীর বিগ্রহ থাকলেও পুণ্যার্থীদের অনেকেই এখানে আসে বিভিন্ন আকৃতির প্রস্তরীভূত চুনাপাথরের আশীর্বাদ নিতে। স্তম্ভের শরীর থেকে স্তনের আকৃতির একটা স্ফীত পাথর থেকে দীর্ঘ বিরতিতে ফোঁটায় ফোঁটায় চুইয়ে পড়ে জলের বিন্দু। সেই জলবিন্দুকে স্বাস্থ্যপ্রদ দুধের ধারা মনে করে পূণ্যার্থী লোকজন একটা ফোঁটা ধরার জন্য ভিখিরির মতো হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে অসীম ধৈর্য নিয়ে। স্যাম বলেছিল সন্তান কামনায় দম্পতিরা আর সফল বিয়ের আকাঙ্ক্ষায় যুগলরা এখানে আসে পবিত্র জলবিন্দু সংগ্রহ করে হাত পেতে। স্তম্ভটির গোড়ায় জলবিন্দু ধরার আশায় দু-একজন বৃদ্ধাকে কাঁপা হাত বাড়িয়ে থাকতে দেখে ভাবি, এদের তো সন্তান কিংবা বিয়ের সম্ভাবনা নেই, তাহলে আরো কিছু মাহাত্ম্য নিশ্চয়ই এ জলের রয়েছে। থাই লেখকেরও বোধহয় একটা ফোঁটা গ্রহণ করার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সে ইচ্ছে গোপন করে লেখকসুলভ ঔদাসিন্য দেখিয়ে সে আমার সাথে পা বাড়ায়।

পেছন দিকে ‘তে সন’ রাজত্বের সময় তৈরি সবুজ পাথরের বুদ্ধমূর্তি ঘিরে জমাট চুনাপাথরের ওপর বৃক্ষ, পাহাড়, ড্রাগন এসবের উত্কীর্ণ প্রতিকৃতি আধো অন্ধকার গুহাভ্যন্তরে কিছুটা আলো ছড়ায়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দর্শনার্থীরা তার সামনে গিয়ে প্রণামের ভঙ্গিতে জোড় হাত ওপর নিচ সঞ্চালন করে প্রার্থনায় নিমগ্ন হয়। জানতাম সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনামের বেশিরভাগ মানুষ ধর্মবিশ্বাসী নয়, তবে মন্দিরে এলে চরম নিরীশ্বর মানুষের মনও বোধ হয় কিছুটা আর্দ্র হয়। আমি থাই লেখককে চুইয়ে পড়া জলের ফোঁটা ধরার সুযোগ দিয়ে শতাধিক ধাপের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসি।