লোককবি বিপিন সরকার

ছোট্ট শহর নড়াইল, তবু শিল্প ও শিল্পীর এক পুণ্যভূমি চিত্রাবিধৌত নড়াইল জেলা। বিজয় সরকার নড়াইলের সংগীতপিপাসু মানুষের কাছে এক নিকট আদর্শ ও প্রেরণার নাম। সেই বিজয় সরকারেরই এক ভাবশিষ্য ছিলেন স্বভাব কবি বিপিন সরকার। খুব বেশিদিন যে বিপিন সরকার বিজয় সরকারের সঙ্গ পেয়েছিলেন তা নয়। মাত্র বছর চারেক সব মিলিয়ে। একদিন একটি ধর্মসভায় রামকৃষ্ণবিষয়ক কবিতা পাঠ করেন বিপিন সরকার। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিজয় সরকার, তিনি কবিতায় মুগ্ধ হয়ে বিপিন সরকারকে কাছে ডেকে পরিচিত হন এবং বলেন, নড়াইলে এমন ফুল ফুটেছে, আমি কেন সংবাদ পাইনি। একেবারেই নিরেট পল্লিজনের কবি ছিলেন তিনি। জল বেষ্ঠিত বাহিরডাঙা গ্রামে বাংলা ১৩৩০ সনের ৫ পৌষ জন্মগ্রহণ করেন এই কবি। থাকতেন অনেকটাই নিভৃতে। তবে কবিতা তিনি লিখেছেন সবার মাঝে, কখনো হাট-বাজারে আড্ডায় বসে, কখনো গানের দল নিয়ে অন্য গ্রামের পথে চলতে চলতে।

জানা যায়, বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান ছিলেন তার বাল্যবন্ধু। নড়াইলের তত্কালীন জিটি স্কুলে পড়তেন দুজন। টিফিন পিরিয়ডে অন্য সহপাঠীরা যখন খেলাধুলায় মগ্ন থাকতেন, তখন বিপিন সরকারের খাতায় ছবি এঁকে দিতেন লাল মিয়া আর সেই ছবির বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে ছড়া লিখতেন বিপিন সরকার। কবি আর শিল্পীর এই বন্ধুত্ব টিকে ছিল সুলতানের মৃত্যু অবধি। সুলতানের মতো বিপিন সরকারও মানবধর্মের পূজারী ছিলেন। ঈশ্বরে বিশ্বাসী হলেও পূজা নিয়ে স্বভাব কবি লিখেছিলেন—

যে পূজায় নেই ভক্তি বিশ্বাস

জীবপ্রেম জীবে দয়া

জেনে রেখো সেই মায়াহীন পূজা

চায় নাকো মহামায়া।

বিখ্যাত আমেরিকান কবি হেনরি ওয়েডসওরর্থ লংফেলো বলেছিলেন, Simplicity in character, in manners, in style; in all things the supreme excellence is simplicity. বিপিন সরকারের বেলাতে স্বইচ্ছায় সেই সহজ সরলতাকে বেছে নেয়ার ব্যাপারটি লক্ষ করা যায়। তিনি নিজেই লিখেছেন—

লিখিব না আর ফুল পাখি নদী রূপসীর রূপের ছবি

জীবন সুন্দর ভালোবাসি কাব্যে, আমি বাস্তবের কবি।

কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের প্রচলিত প্রথায় তার মনোকষ্ট ছিল। কিন্তু সমাজের কর্তৃত্বের স্থান তার নাগালের বহুদূর; তবু নীরব বসে থাকেননি স্বভাব কবি। আপন স্বভাবে ছন্দে বিপক্ষে দাঁড়িয়ে তার সরল উক্তি—

মন মন্দির পবিত্র কর মুছে হিংসা ঘৃণা

তা না হলে ঐ মন্দিরে নারায়ণ পাবি না।

গ্রামীণ খেটে খাওয়া মানুষের কবি বিপিন সরকার। তিনি তার কবিতার ভাষায় কখনোই সাধারণের অজ্ঞাত শব্দকে আশ্রয় করেননি। তবে কবি দৃঢ়ভাবে ছিলেন সমাজের নানা সংস্কারের পক্ষে। তাই তো নারী জাগরণ নিয়েও তিনি লিখেছেন—

যুগ যুগ ধরে ধর্মের নামে নারীকে রাখিয়া নিচে

ভ্রান্ত পুরুষ জীবনযাত্রায় নিজেরা পড়েছে পিছে।

নারীকে করিয়া ভোগের সামগ্রী পুরুষের সেবাদাসী

আধার খাঁচায় বদ্ধ রাখিয়া নারীত্ব দিয়াছে নাশি।

ধুতি পাঞ্জাবি পরা মাথা ভর্তি লম্বা চুলে কবি নিজ শহরময় হেঁটে বেড়াতেন। অপলকে দেখতেন মানুষ, মানুষের মাঝেই তো তার কবিতা লুকানো। মুচিরপোল বাজারের চায়ের দোকানে কখনো কখনো বসে তরুণ কবিদের সঙ্গে আলাপ করতেন তিনি। অনেকেই তাকে কবিতা লিখে এনে পাঠ করে শোনাতেন, তিনি মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে শুনতেন সেসব কবির কবিতা। এমন হয়েছে তরুণ কবিরা কোনো প্রশ্ন করলে তিনি তার উত্তর দিচ্ছেন কবিতার ছন্দে। বই পড়া নিয়ে এমনই এক প্রশ্নে কবির উত্তর—

গ্রন্থ সমুদ্র মন্থন করিয়া জ্ঞান সুধা করি পান।

বই লেখো বই কেনো আর বই পড়া করো নেশা

জীবন হইবে সমৃদ্ধ সুন্দর মিটিবে প্রাণের তৃষা।

একদিকে বই পড়ে জ্ঞান আহরণের কথা যেমন দৃপ্তভাবে উচ্চারণ করেছেন, তেমনিভাবে জ্ঞানীদের প্রতি তার যে একটা প্রবল ক্ষোভের জায়গাও ছিল সেটা আমরা দেখতে পাই তার ক্ষুদ্র কবিতা ‘অকর্মা জ্ঞানী’তে। কবি সেখানে জ্ঞানীদের উদ্দেশ্যে বলেন—

দেহে যার শক্তি আছে, আছে বুদ্ধি জ্ঞান

কিন্তু কোনো ভালো কাজে করে না যোগদান।

চুপচাপ ঘরে বসে থাকা স্বভাব

এহেন জ্ঞানীর দ্বারা দেশের কী লাভ?

জ্ঞান ও জ্ঞানীকে তিনি একটা নির্দিষ্ট গন্ডি বা গোষ্ঠীর মধ্যে আবদ্ধ করে রাখার পক্ষে ছিলেন না। তিনি দেশ নিয়ে ভাবতেন। গভীর চিন্তা ছিল তার দেশের সমাজ ও রাষ্ট্রনীতি নিয়ে। নড়াইল জেলায় স্বভাব কবি বিপিন সরকার ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় এক মানুষ। জীবিতাবস্থায়ই তার জন্মদিন পালন হতো সাড়ম্বরে, সেখানে জেলা প্রশাসনসহ সকল রাজনৈতিক দলের কর্তা ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকতেন। জেলার সকল দলমতের মানুষের সঙ্গে কবির নানা বিষয়ে আলাপ হতো। সেই আলাপচারিতায় হয়তো একটা বড় অংশের মাঝে শক্তি, অর্থ, পারসপরিক হিংসার এক রূঢ় অহমিকা দেখতে পেয়েছিলেন কবি। সেটা তাকে আহত করেছিল, তাই একদিন তিনি সেইসব গণ্যমান্য কর্তা ব্যক্তির উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন—

যত করো হিংসাদ্বেষ পাবে না শান্তির লেশ

শক্তি অর্থে শান্তি কেনা দায়

সত্জ্ঞান সুবুদ্ধি ন্যায়নীতি চিত্তশুদ্ধি

একমাত্র শান্তির উপায়।

ভাষা, ছন্দ বা বিষয়বস্তুগত কাঠামোর আলোকে বিপিন সরকারের কবিতায় ত্রুটি বা অশুদ্ধতা থাকতে পারে। তবে সেটাকে খুব বড়ো করে দেখবার সুযোগ খুব একটা নেই। কবির নিজ বয়ানে, ‘আমি নিজে উচ্চশিক্ষিত নই, নিজেও ঐ উচ্চশিক্ষিত জনের জন্যেও নই। আমি যাদের কথা ভাবি, যাদের জন্য লিখি তাদের বেশিরভাগই ঠিকঠাক পড়তে পারে না, অক্ষর চেনে না। আমার কবিতার শ্রোতা ওরা, সেই সংখ্যাটা একেবারে কম নয়, তবে পাঠক নিতান্তই কম।’ কবির এই বয়ানে এটা সুস্পষ্ট যে তিনি গ্রামের সাধারণ নিরক্ষর মানুষের জন্য লিখেছেন, সেটা শব্দ-ছন্দের আভিধানিক কাঠামোতে হয়তো নগণ্য হতে পারে, তবে যে উদ্দেশ্য সেটা মোটেই সামান্য নয়। আর এই লেখার মাঝে যে কবি নিজের আত্মতুষ্টি ছিল তা তিনি তার কবিতায়ই বলেছেন—

যে কর্মে দশজনে করে আশীর্বাদ

সেই ধর্ম কাজ, তাতে পূর্ণ হয় সাধ।

স্বভাব কবি বিপিন সরকারের সাধ পূর্ণ হয়েছে সাধারণ মানুষের মাঝে তার কবিতার প্রশংসায়। যখন তিনি কোনো গ্রামীণ আড্ডায় কৃষক, কুলি, কামার-কুমোরের মাঝে বসে তার কবিতা বলতেন, তারা যে সহজেই বুঝে যেত এ কবিতা তাদের কথা বলছে এবং সেটা তাদের স্বরেই বলছে। এটাই ছিল কবি মনে প্রশান্তি।

খ্যাতিমান ইংরেজ গীতিকার ও সংগীতশিল্পী জন লাইডন বলেন, I mean, the genuine roots of culture is folk music. বিপিন সরকার যে আপদমস্তক দেশীয় সংস্কৃতির শিকড় আঁকড়ে থাকা একজন ছিলেন তা শুধু তার কবিতা নয়, আঞ্চলিক নানা ধরেনর সংগীত রচনার মধ্যেও প্রমাণিত হয়। গানের দল ছিল তার। সেই দলে ছিলেন নিজ পুত্র, ভাগ্নে-ভাগ্নিরা। বর্ষাকালে জল ছুঁইছুঁই করত তার বাড়ির উঠানে। ভরা চাঁদের আলোতে সেই উঠানে বসত গানের আসর। বর্ষার গান, কীর্তন, শিবের গাজন তিনি নিজেই লিখে সুর করতেন। এছাড়াও অষ্টক, হালই এবং কিছু যাত্রাপালাও লিখেছিলেন কবি বিপিন সরকার। অষ্টকগান একেবারেই হিন্দুরীতির এক ধরনের বিশেষ গান। শাস্ত্রীয় সংগীত কিংবা নাগরিক সংগীতে তার কোনো ঠাঁই না হলেও আজো ভারত এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ গানের প্রচলন আছে। নড়াইলে পূর্বকাল থেকেই অষ্টক গানের প্রচলন ছিল। অষ্টকগান রচনায় বিপিন সরকার মুন্সীয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। বিপ্লবী ক্ষুদিরামকে নিয়ে তার অষ্টকগান—

প্রহরী তোর পায়ে পড়ি, খুলে দে মোর হাতের বেড়ি

জানবো দিদির কোলে জনমের মতন।

আমি আজ কতকাল দেখিনি তোর বদনখানি

কেঁদে কেঁদে  অন্ধ আঁখি, কেমনে ভাই তোমায় দেখি

একবার কোলে আয় মোর নয়নের মনি

তুমি একপুতো শোকে দিদি কাঁদিও না আর

কোটি পুত্রের মর্মব্যথা সহিছে মোর ভারত মাতা

বলো কে করিবে ইহার প্রতিকার।

বিপিন সরকার ছিলেন একবারেই খেটে খাওয়া, জলমাটির নিবিড় বন্ধনের এক গ্রামীণ কবি। যিনি সারাটা জীবন বাস করেছেন চারপাশ জলে ঘেরা এক গ্রাম বাহিরাডাঙায়। জল-ঢেউয়ের সুর, ভেজা মাটির গন্ধ তিনি পেতেন তার বিছানায় শুয়ে। বাঙালি কবি মাত্রই দরিদ্র, বিপিন সরকার তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দুঃখ-কষ্টের সংসার তাকে তার শিল্পসাধনা, কবিতা, গান থেকে দূরে সরাতে পারেনি আমৃত্যু। তিনি লিখে গেছেন কৃষক-কামার-কুমোর শ্রুত কবিতা, লোকগান, সাধারণের যাত্রা। এই কবির শিল্পযাত্রা থামে ২৭ নভেম্বর ২০১৫ তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। আমরা আজ বড়ো শহরমুখী। সবাই, সবকিছুই যেন খোলস পালটে শহুরে হতে চায়। তাই হয়তো গ্রামীণ এসব কবি ও তাদের কবিতা অনাদরে পড়ে থাকে মুখোশ পরা শহুরে সভ্যতার বুকে।                                                                                                                         

লেখক : কবি বিপিন সরকারের নাতনি