আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে এই আসনে বিএনপির দুই কাণ্ডারি দুই ভাইয়ের মধ্যে এক যুগের বৈরি সম্পর্ক কেটে যাওয়ায় আশার আলো দেখছেন দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে বর্তমান সংসদ সদস্য মো. ইসরাফিল আলম তৃতীয়বারের মতো নৌকার মাঝি হয়েছেন। দীর্ঘসময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকায় কিছু বাধাধরা ভোটের মালিক হয়েছেন এই আওয়ামী লীগ নেতা। সবমিলিয়ে এই আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলেই আশাবাদী সাধারণ ভোটাররা।
এবার বিএনপি থেকে এখানে প্রার্থী হয়েছেন তিনবারের সংসদ সদস্য ও জোট সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মো. আলমগীর কবির। অন্যদিকে ছিলেন তারই আপন ছোট ভাই বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. আনোয়ার হোসেন বুলু।
জানা গেছে, ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত বিভাগের সাবেক প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা আলমগীর কবীর। ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শেষের দিকে আলমগীর কবীর এলডিপিতে যোগ দেন। একই বছরে এলডিপি থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর তার ছোট ভাই বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আনোয়ার হোসেন বুলু এই দুই উপজেলার বিএনপির হাল ধরেন। নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রাণীনগর) আসনে বিএনপির সংকটময় ক্রান্তিকালে নেতাকর্মীদের পাশে অভিভাবক হিসেবে দাঁড়ান আনোয়ার হোসেন বুলু। ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীও হন তিনি। আনোয়ার হোসেন বুলু এই আসনে ধানের শীষের হাল ধরে রেখেছেন প্রায় ১ যুগ ধরে। তাকেই মনোনয়ন দেয়ার দাবি ছিলো এই আসনের বিএনপির নেতা-কর্মীদের। কিন্তু হঠাত্ করেই নাটকীয়ভাবে তার বড়ভাই আলমগীর কবীর দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর পর পুনরায় বিএনপিতে ফিরে আসেন। এত বছর পর রাজনীতিতে আলমগীর কবিরের ফিরে আসা নিয়ে বিএনপি নেতা ও এলাকাবাসীদের মাঝে শুরু হয় নতুন হিসেব-নিকাশের। অবশেষে দল থেকে তাকেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি থেকে ধানের শীষের মনোনিত প্রার্থী করে প্রতীক দেয়া হয়। এতে দুই উপজেলার বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, হতাশা, চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষের দেখা দিয়েছিলো। অনেকে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কেউ রাজনীতি করবে না, এমনকি ধানের শীষে ভোটও দিবে না বলেও বলতে শোনা গেছে। অপরদিকে গত ২২ নভেম্বরে নওগাঁ-৬ আসনের বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতারা আলমগীর কবীরকে অবাঞ্ছিতও ঘোষণা করে। কিন্তু রাজনীতি দুই ভাইয়ের মধ্যকার দা-কুড়াল সম্পর্ককে আর দীর্ঘ করে রাখলো না। বর্তমানে দুই ভাই এক হয়ে নওগাঁ-৬ আসনে ধানের শীষকে বিজয়ী করার লক্ষে একই মঞ্চে ধানের শীষের জন্য ভোট প্রার্থনা করছেন। দুই ভাই এক সঙ্গে নির্বাচনী গনসংযোগ, উঠান বৈঠন, মতবিনিময় সভাসহ সকল কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এলাকাবাসী দুই ভাইয়ের পুনরায় এই মিলনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। শুধু তাই নয় দুই ভাইয়ের মিলন এই আসনে বিভক্ত হওয়া বিএনপিকে জোড়া লাগিয়ে দেওয়ার কারণে বিএনপি দলের নেতাকর্মীদের মাঝে এখন চাঙ্গাভাব বিরাজ করছে। নতুন করে চাঙ্গা হওয়া বিএনপি নেতারা আবারো এই আসনে ধানের শীষকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করতে সফল হবেন বলে আশা করছেন অনেক বিএনপিনেতারা।
রাণীনগর থানা বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এসএস আল ফারুক জেমস বলেন, নওগাঁ-৬ আসনে বিএনপি বলতে এই দুই ভাইকে বোঝায়। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই দুই ভাইয়ের সঙ্গে বিএনপির রাজনীতি করে আসছি। দুই ভাই এক হওয়ার কারণে আমরাও নতুন করে রাজনীতি করার অনুপ্রেরনা পেলাম যা কিছুদিন আগেও ছিল না। দুই ভাইয়ের মিলন অবশ্যই আমাদের জন্য ইতিবাচক। কারণ দুই মেরুর মানুষ এখন একত্রিত। আগামী নির্বাচন যদি সুষ্ঠু, সুন্দর, অবাদ ও নিরপেক্ষ হয় তাহলে আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। কারণ আমাদের মাঝে আর কোন দলীয় কোন্দল নেই। এখন আমরা সবাই হাতে হাত রেখে এক সঙ্গে কাজ করবো।
আনোয়ার হোসেন বুলু বলেন নানা কারণে দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর আমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিলো না। কিন্তু রাজনীতি আবার আমাদের দুই ভাইকে একত্রিত করে দিয়েছে। এখন আমরা সকল বিভেদ ভুলে গিয়ে দুই ভাই এক হয়েছি। নওগাঁ-৬ আসনে এখন আমরা দুই ভাই ধানের শীষের এক রক্ষক। আসন্ন নির্বাচন যদি সুষ্ঠু, সুন্দর, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ন পরিবেশে হয় এবং সাধারন ভোটারা যদি ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায় তাহলে ধানের শীষ প্রতিক অবশ্যই বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির বলেন, এলাকার মানুষের চাওয়া ভিত্তিতেই রাজনীতিতে আবার আমার ফিরে আসা। এই আসনের মানুষ এখন অত্যাচারের কষাঘাতে জর্জড়িত। তাদেরকে অত্যাচারিত শাসকের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা দুই ভাই আবার মিলিত হয়েছি। আমাদের একত্রিত শক্তিকে আর কেউ পরাজিত করতে পারবে না। কারণ আমরা সব সময় জনগনের জন্য রাজনীতি করে এসেছি। আশা রাখি আসন্ন নির্বাচনে কোনো পরাশক্তিই আমাদের বিজয়কে আটকাতে পারবে না।