আমার দেখা ঈশ্বরদীর সৌন্দর্য

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

 

অনেকটা হুট করেই ছুটে গিয়েছিলাম ঐতিহাসিক জেলা পাবনার ঈশ্বরদী। সকাল ৬টায় ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে সকাল ১৫টার মধ্যেই পৌঁছে যাই। ফোন পেয়ে আগেই আলহাজ্ব মোড়ে অপেক্ষায় ছিলেন ফেসবুক বন্ধু বাবু ভাই। সরাসরি এই প্রথম তার সঙ্গে সাক্ষাত্। পরিচয় পর্ব শেষে গরুর দুধের চা দিয়ে আপ্যায়ন শুরু। এরপর বাসায় নিয়ে চলে আরেক দফা। আর দেরি নয়, এবার বিশাল আয়তনের ঈশ্বরদী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের কম্পাউন্ডে থাকা দুর্লভ প্রজাতির গাছগুলো দেখতে বের হই।

বেশ সাজানো গোছানো পরিবেশ। এত এত গাছ, কিন্তু আবর্জনাপূর্ণ ঝরাপাতার স্তুপ নেই। ৬০.৪০ হেক্টর আয়তনের কেন্দ্রটির পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারটা বেশ ভালোই লাগলো। হাঁটতে হাঁটতে দেশীয় বিলুপ্ত প্রজাতির বৃক্ষ বাগানে ঢুকি। থোকায় থোকায় নানারঙের জামরুল, করমজা, চেরি, কলা, এই জনমে না দেখা সুগন্ধিযুক্ত ছোট্ট দানা সাইজের লেবুসহ আরো কত ফল গাছে গাছে ঝুলে রয়েছে। অসম্ভব সুন্দর দুর্লভ বৃক্ষ সংরক্ষণের সব আয়োজন। আশ্চর্য হই গাছের মধ্যেই ঝুলতে থাকা হলদে রঙা পাকা কলার ছড়ি দেখে। দেশে কার্বাইড আর ফরমালিনের অপব্যবহারের সময়েও এ রকম দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। যাই এবার আম, জাম, জাম্বুরা, কাঁঠাল আর ড্রাগন ফলের পাশে। সব গাছ ছাড়িয়ে তত্কালীন জমিদার আমলের কিছু আম গাছ এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। রয়েছে নারকেল, সুপারি গাছের সারি। আরো রয়েছে নিশ্চিন্ত মনে বসে থাকা ঝাঁকেঝাঁকে সারস প্রজাতির শামুকখোল পাখি। পাখিগুলোর অবাধ বিচরণ সত্যিই ভালোলাগার। নানা ফুল আর ফলের মৌ মৌ ঘ্রাণে বিমোহিত হয়ে আমরা গাছতলা দিয়ে হেঁটে বেড়াই। প্রহরীরা ঝরেপড়া টসটসে পাকা আম কুড়িয়ে এনে দেয়। মধুর ঘ্রাণ সহ্য করতে না পেরে ভরা পেটেও উদরপুর্তি চলে। আসর নামাজ শেষে ছুটি পদ্মার পাড়। মাঝখানে কিছুটা সময়ের জন্য লক্ষীকুণ্ডা গ্রামে গাড়ি ব্রেক দিয়ে, চিতল মাছের অভয়াশ্রম দেখি। পড়ন্ত বিকেলে পাকশী গিয়ে পৌঁছাই। ব্রিটিশ আমলে তৈরি হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর দিয়ে এখনো হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন চলাচল করে। এখন পর্যন্ত এটিই বাংলাদেশের একমাত্র দীর্ঘ রেল সেতু। ব্রিজটির নির্মাণকাল ১৯০৯ থেকে ১৯১৫ সাল। সেতুটি দেখতেও বেশ চমত্কার। পাশেই ২০০৪ সালে উদ্বোধন হওয়া লালন শাহ সেতু। পদ্মার বুকে পাশাপাশি দুটো সেতু যেন মানিকজোড়। বঙ্গবন্ধু সেতুর পর এটিই দীর্ঘতম সড়ক সেতু। বর্তমানে পদ্মা নদীর তীরে, সেতু দুটোর সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য দূর-দূরান্ত হতে আসা পর্যটকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। সেই সুযোগে বিনোদনের নামে জুয়ার আসরও মিলেছে বেশ জমজমাট। যা সাধারণ দর্শনার্থীদের বেশ অস্বস্তিতে ফেলে। মাগরিবের আজানের সঙ্গে সঙ্গে ছুটি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে। রাতে সেখানকার অতিথি ভবনেই আমাদের আবাসন মেলে। কেন্দ্রের ভেতর সন্ধ্যাবাতি জ্বেলে দেওয়ার পর যেন এক অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য ভর করলো। চারপাশ সুনসান নিরিবিলি। মাঝেমধ্যে নিশাচর প্রাণীর হাকডাক নিস্তব্দতা ভাঙে। রাত ১০টায় খাবার খেতে গিয়ে চোখ চড়কগাছ। নাসরিন সুলতানা পদে পদে খাবার পরিবেশন করে পুরো ডাইনিং টেবিলে জট বাঁধিয়ে দিয়েছেন। তারপরও তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পারছেন না। আন্তরিকতার সঙ্গে পরিবেশন খাবারের স্বাদও বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। ভোজন শেষে তথাকথিত ধন্যবাদ জ্ঞাপন না করে মিষ্টি হাসি বিনিময়ের মধ্যেই বিদায় নিলাম।

রুমে এসে সবাই চটজলদি ঘুমানোর প্রচেষ্টা। খুব সকালেই যেতে হবে দাশুরিয়া গ্রামে। ভোর ৫টার মধ্যেই সবার ঘুম ভাঙে। সোলায়মান ভাইয়ের কল পেয়ে রুম ছাড়ি। গাড়ি স্টার্ট, যাচ্ছি দেখতে সাইফুল ভাইয়ের পুকুরে থাকা মাছের লম্পঝম্প আর কলাবাগান। উপঢৌকন হিসেবে মিললো সদ্য গাছ থেকে পাড়া একছড়ি সবরি কলা। আহ কী মজা! তবে তার চাইতেও ভালোলাগা কলা বাগানের ঝিরঝির বাতাসে, সোনামাখা রোদ সঙ্গী করে হেঁটে চলা।

 

 

যাবেন যেভাবে

বাস ও ট্রেন উভয় যানবাহনেই ঈশ্বরদী যাওয়া যায়। গাবতলী থেকে ঈশ্বরদী নন এসি বাস  ৩৫০ টাকা ও ট্রেনে কমলাপুর থেকে ঈশ্বরদী ৩০০ টাকা ভাড়া পড়বে। চাইলে এসি বাস অথবা ট্রেনের বগিতেও যেতে পারেন।

 

থাকা-খাওয়া

ঈশ্বরদী শহরে বেশকিছু ভালোমানের আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। পছন্দনীয় খাবারের হোটেলও রয়েছে অনেক। পূর্ব পরিচিত কেউ থাকলে নাম মাত্র ভাড়ায় গবেষণা কেন্দ্রের অতিথি ভবনেও থাকা যাবে।