জোবায়ের আহমেদ
রূপালি পর্দার সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার হচ্ছে অস্কার। চলচ্চিত্রের অসাধারণ কাজকে সম্মানে ভূষিত করার লক্ষ্যে প্রতিবছরই প্রদান করা হয় এই পুরস্কার। বাংলাদেশে শুটিং করা ‘প্রথম’ হলিউড সিনেমাই পেয়েছে এই পুরস্কার। সিনেমার নাম ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড এইট্টি ডেজ’।
এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন সেসময়ের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় অভিনেতা ডেভিড নিভান, ক্যান্টিনফ্লাস প্রমুখ। চলচ্চিত্রের কাহিনি হলো—একজন কাঠখোট্টা ব্রিটিশ তার একমাত্র ভৃত্য পার্সপাতকে সঙ্গে নিয়ে বাজি ধরে ৮০ দিনে বিশ্বভ্রমণ করে আসে। চলচ্চিত্রের বিশ্বভ্রমণের মধ্যে ট্রেনে করে ভারত ভ্রমণের সময় প্রায় পুরো অংশটুকুই শুটিং করা হয় সিলেট অঞ্চলে। যার মধ্যে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনও রয়েছে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে শুটিংয়ের আগে সিলেচের চা বাগান, কুশিয়ারা ব্রিজ, গ্রামাঞ্চলের চিরাচরিত দৃশ্যধারণ করা হয়েছিল। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের অভ্যন্তরে হাতির দৃশ্যও ধারণ করা হয়।
ছবিটির দৃশ্যে দেখানো হয় ট্রেন চলছে। হঠাত্ রেললাইনে দেখা যায় একপাল হাতি আপনমনে হাঁটছে। চালক ট্রেন থামিয়ে দেন। বগি থেকে নেমে দৃশ্যটি দেখতে আসেন নায়ক ডেভিড নিভান। সামনের গ্রামে গিয়ে দেখেন সতীদাহ। নায়ক ছুটে গিয়ে মেয়েটিকে বাঁচান। মেয়েটি হলো শার্লি ম্যাক্লেইন। ছবির এই অংশটুকুর শুটিং হয়েছিল লাউয়াছড়ার রেললাইন এলাকায়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শুটিং হয়েছিল এই বিখ্যাত সিনেমাটির। তার মধ্যে সিলেটের লাউয়াছড়া উদ্যানের এই অংশটুকু বিশেষভাবে জায়গা করে নেয়। এছাড়া সতীদাহ প্রথার মতো একটি সামাজিক কুপ্রথাকেও তুলে আনা হয়েছিল এই দৃশ্যে।
চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশে শুটিংয়ের সময় সহযোগিতা করেছিলেন তত্কালীন বিখ্যাত শিকারি, ফটোগ্রাফার ও ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র পরিচালক জিএমএম ইহসানুল করিম। সেই সময়ের অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন সমস্যার মধ্যেও ইহসানুল করিমের একক প্রচেষ্টায় চলচ্চিত্রটির শুটিং নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হয়েছিল। চলচ্চিত্রটি ১৯৫৬ সালে নিউইয়র্ক শহরে প্রথমবারের মতো মুক্তি পায়। এছাড়া ১৯৬২ সালে ঢাকার গুলিস্তানেও চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হয়েছিল।
১৯৫৬ সালে চিত্রায়িত একাডেমি অফ মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস বা অস্কার জয়ী হলিউডের অ্যাডভেঞ্চার চলচ্চিত্র ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড এইট্টি ডেজ’ চলচ্চিত্রটির পরিচালনায় ছিলেন মাইকেল অ্যান্ডারসন। ১৮৩ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটি ২৯তম অস্কারে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতে নেয়। আইএমডিবিতে ৬.৮ রেটিং পাওয়া ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড এইট্টি ডেজ’ চলচ্চিত্রটি ৮টি ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরিতে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়। যার মধ্যে ৫টি অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়। এই চলচ্চিত্রটিকে এখনো হলিউডের নেওয়া সবচেয়ে বড় ফিল্ম প্রজেক্ট।
বাংলাদেশে শুটিং হওয়া প্রথম হলিউড চলচ্চিত্র হচ্ছে এটি। বাংলাদেশ ছাড়াও চলচ্চিত্রটির শুটিং হয়েছে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, ভারত, থাইল্যান্ড, জাপান, আমেরিকা প্রভৃতি দেশে। অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড এইট্টি ডেজ’ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের যেখানে শুটিং হয়েছিল সেখানে একটি বিলবোর্ড টানানো রয়েছে। প্রতিদিনই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ভ্রমণে আসা হাজার হাজার পর্যটকদের অধিকাংশই এ বিলবোর্ডের পাশে বা সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে নেন।