বিছানাকান্দির পথে পথে

 সুমন্ত গুপ্ত

 

ঘড়ির কাঁটা সকাল দশটা ছুঁই ছুঁই করছে। সেই কখন থেকে তৈরি হয়ে বসে আছি, নতুন গন্তব্যে যাব বলে। আকাশের মন খারাপ খুব, তাই মুষল ধারায় বর্ষণ হয়েই চলছে। এদিকে বৃষ্টির ফলে রাস্তায় হাঁটু পানি। তবে শেষ পর্যন্ত আমরা বের হলাম সবার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য বিছানাকান্দির উদ্দেশে।

আমরা এগিয়ে চলছি চৌহাট্টা, আম্বরখানা, চকিদিঘি পেরিয়ে। সিলেট শহরের বিমানবন্দর রোড ধরে বিছানাকান্দির পথ। দু পাশের সবুজ চা বাগান পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি। এই পথ ধরে গেলে মনে হবে, পুরো পৃথিবীটাই যেন সবুজের রাজ্য। আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথটাকে কেউ বড় অজগর বলেও ভুল করতে পারেন। এদিকে আবার মুষল ধারায় বৃষ্টি শুরু হলো। ঝুম বৃষ্টির মাঝে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলছে। এয়ারপোর্ট রোডে ছাড়িয়ে আসার পর ভাঙাচোরা রাস্তায় এসে পড়লাম। কিছুদূর পর পর রাস্তা ভাঙা। মেরামতের কাজ চলছে প্রায় সব জায়গাতেই। বেরসিক রাস্তার জন্য সবার অবস্থা কাহিল। এদিকে বৃষ্টির জন্য রাস্তার অবস্থা আরো বেগতিক হয়েছে। বেসামাল রাস্তা পেরিয়ে ঘণ্টা দুয়েকে পৌঁছে গেলাম হাদারপার বাজারে। সেখানে গিয়ে গাড়ি আর এগোতেই চায় না। নিরুপায় হয়ে গাড়ি থেকে নামতে হলো। পদব্রজে এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। আমাদের যেতে হবে ট্রলার ঘাটে। সেখান থেকে নৌকায় করে যেতে হবে। নদীর ঘাট কোথায় জানতে চাইলে সবাই বলে ‘সামনে’, কিন্তু ‘সামনে’ তো আর শেষ হয় না। এদিকে আকাশের ভেঙে পড়ার অবস্থা। সবার সঙ্গে আমরাও হাঁটছি। দূর থেকে দেখতে পেলাম সাত পাহাড়ের চূড়া। দূর আকাশে মেঘে ঢাকা পাহাড়ের ছড়াছড়ি। শেষ পর্যন্ত আমরা ট্রলার ঘাট এলাকায় এসে পৌঁছালাম। দরদাম করে উঠে পড়লাম ট্রলারে। বলে রাখা ভালো, এ পথে কোনো নিয়মিত প্যাসেঞ্জার ট্রলার নেই। আপনাকে হয় একটি ট্রলার পুরোটাই ভাড়া করতে হবে, নয়তো অন্য কোনো টিমের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে হবে। যদিও এতে সময় অপচয় এবং অন্য টিম না মেলার ঝক্কিটা থেকেই যায়। তাই বিছানাকান্দি যেতে চাইলে টিম নিয়ে যাওয়াই ভালো।

ট্রলার ছুটল বিছানাকান্দির উদ্দেশে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, আকাশ আর মেঘের সঙ্গে পাহাড়ের দলগুলো মিশে আছে। যতই কাছে যাই, পাহাড়গুলো ততই যেন আকাশ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। আমরা চলেছি ঢেউয়ের তালে তালে। যখন দুটো ট্রলার একে অন্যকে অতিক্রম করে, তখন যেন আরো ঢেউ আছড়ে পড়ে। আধা ঘণ্টার মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অজস্র পাথর, দেখে যেন মনে হয় পুরো এলাকাটাই পাথরের বিছানা। পিয়াইন নদীর অগণিত পাথরের মাঝে আপনাকে হাঁটতে হবে সাবধানে পা ফেলে। একটু অসাবধানতার অভাবে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। পানির গভীরতা কম হলেও অজস্র পাথরের উপস্থিতি আপনার ভ্রমণকে করবে আরো রোমাঞ্চিত। একটু পরপর বিজিবি সদস্যদের সতর্কবাণী আপনাকে এনে দেবে আরো থ্রিল। জলপাথরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছবি আমি একের পর এক তুলতে লাগলাম। ওপরে নীল আকাশ যেন ভেঙে পড়েছে জলে। জল হয়েছে নীলাভ। ডানে-বাঁয়ে-সামনে মেঘালয়ের উঁচু পাহাড়। পাহাড়ে হেলান দিয়ে সাদা মেঘ। মাঝে ঝরনার মতো বৃষ্টিধারা। দৃষ্টির শেষ সীমানা পর্যন্ত শুধু পাথর আর পাহাড়। এ দৃশ্য দেখে নিজেকে সামলানো বড় কঠিন! বিছানাকান্দির জলধারায় স্নাত হয়ে আমরা গেলাম পাশের ছোট্ট বাজারে। ছোট্ট বাজার বললে ভুল হবে, কী নেই সেই বাজারে। তবে বিশেষত্ব হলো, সেখানে সব ভারতীয় পণ্য অনেক কম দামে কিনতে পারবেন। চকলেট, সাবান, শ্যাম্পু, ছোটদের খেলনা, কসমেটিক, আচারসহ আরো অনেক কিছু আছে এখানে, নাম বলে শেষ করা যাবে না। আমরা ঘুরে বেড়ালাম ছোট্ট বাজারে। আমাদের ছোট্ট ভ্রমণসঙ্গী সপ্তক তার দিদির কাছে বায়না ধরল, খেলনা কিনে দিতে হবে। নিরুপায় হয়ে দিদা তাকে খেলনা কিনে দিলেন। সবাই বাজার থেকে কিছু না কিছু কিনল। বাজার সদাই করে সবাই ক্লান্ত। খুব ক্ষুধাও লেগেছে সবার। ছোট মাসি বলে উঠলেন, পেটে কিছু না দিলে আর সামনে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। আমরা বাজারের পাশে গড়ে ওঠা খাবারের দোকানে গেলাম। সবাই কোনো কথা না বলেই বসে পড়ল টেবিল ঘিরে। এক ভদ্রমহিলা এসে বললেন, কী লাগবে আপনাদের? দেশি মুরগির মাংস, রুই মাছ, বোয়াল মাছ, ছোট মাছ, চিংড়ি মাছ, বেগুন ভাজা—কী চাই?। সবাই চিন্তায় পড়ে গেল, কে কোন আইটেম খাবেন। আমি নিলাম দেশি মুরগির মাংস আর বোয়াল মাছ। রান্নায় বাটা মসলার স্বাদ, অসাধারণ লাগছিল খেতে। অনেকদিন পর বাটা মসলার স্বাদ পেলাম। শহুরে জীবনে বাটা মসলার ব্যবহার এখন কেউ আর করে না। আমাদের সঙ্গীদের কেউ ছোট মাছ, আবার কেউ রুইমাছ নিলেন। সবাই আহার পর্ব শেষ করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেন। এবার বিদায় নেওয়ার পালা। সবাই চাইছিল আরো কিছু সময় থাকার জন্য, কিন্তু সূর্যদেবের বিদায়ের পালা চলে এসেছে। আমরা ফিরে চললাম ঘাটের দিকে। পেছন থেকে সীমান্তের দিগন্ত ছোঁয়া মেঘালয় পাহাড় হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের। সময় পেলে ঘুরে আসতে পারেন এই পর্যটন স্পট থেকে। এখানকার নয়নাভিরাম প্রকৃতি আপনাকে নিরাশ করবে না।

 

 

যাবেন কিভাবে

সিলেট শহর থেকে ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর ইউনিয়নে বিছানাকান্দি গ্রাম। সিলেট থেকে ভোলাগঞ্জ মহাসড়ক ধরে সালুটিকর বাজারের ডান দিকে গাড়ি নিয়ে গোয়াইনঘাট লিঙ্ক রোডে হয়ে দেড় ঘণ্টা গেলেই আপনি পৌঁছে যাবেন বিছানাকান্দি। এক্ষেত্রে শহরের আম্বরখানা থেকে সিএনজি নিলে সহজে এবং কম খরচে বিছানাকান্দি যাওয়া যায়। হাদারপাড় বাজার পর্যন্ত জনপ্রতি ভাড়া ১০০ টাকা। সেখানে পৌঁছাতে লাগবে কমবেশি দেড় ঘণ্টা। বাজারের পাশেই খেয়াঘাট। ঘাট থেকে নৌকা রিজার্ভ করে যাওয়া যায় বিছানাকান্দি। দর কষাকষি করে ১০০০ টাকার মধ্যে নৌকা রিজার্ভ করা যায়। যদিও পর্যটকদের কাছে অতিরিক্ত ভাড়া হাঁকানোর নজির এখানকার মাঝিদের আছে। তাই আগে থেকে ভাড়া ঠিক করে নেওয়া ভলো। নৌকায় যেতে যেতে দেখতে পাবেন দু পাশে সবুজ গ্রামীণ দৃশ্য।