মুনিয়া

মুনি মুনি মুনিয়া। মুনি মুনি মুনিয়া। আমি মা যাব। আমি মা যাব। সকাল থেকে ডেকেই চলে সে। কথা শেখার পর থেকে মুনিয়া কাউকে দেখলেই এই কথাগুলো বলে। মুনিয়া যখন খুব ছোট মানে উড়তে শেখেনি, তখন কড়ইগাছের কোটর থেকে তাকে পেড়ে আনা হয়। মুনিয়ার মা খাবারের খোঁজে বাইরে কোথাও গিয়েছিল। ফিরে এসে আর ছানা দুটিকে দেখেনি। মুনিয়ারা দু বোন ছিল। এক বোন আনার ক’দিন বাদেই মারা যায়। মুনিয়া এখন অন্যদের নামও বলতে পারে। ভেজানো ছোলাদানা খেতে সে খুব পছন্দ করে। কিন্তু ক’দিন ধরে মুনিয়া কিছু খেতে চায় না। মনমরা হয়ে বসে থাকে। আর ডেকে চলে, মা যাব। মিমি মা’র কাছে জানতে চায়—কেন মুনিয়ার মন খারাপ। মা বলে, মায়ের জন্য মন খারাপ হয়েছে মুনিয়ার। তবে ওকে আমরা মায়ের কাছে দিয়ে আসি। মুনিয়ার মা কোথায় সেটা তো আমরা জানি না মিমি। কেন ওকে যে কড়ইগাছ থেকে পেরে আনা হয়েছিল, সেখানে দিয়ে আসি। মিমি মুনিয়ার কাছে গিয়ে বলে, মুনিয়া, মা’র কাছে যাবে? মুনিয়া বলে, মা যাব, মা যাব। মিমি বলে, ছোলা খাবে? মুনিয়া মাথা নেড়ে জানায়, খাবে না। মুনিয়ার মন খারাপ দেখে মিমিরও খুব মন খারাপ হয়। ময়না পাখিটা তাদের বাড়িতে বছরখানেক ধরে রয়েছে। বাড়ির সকলের মায়া পড়ে গেছে ওর ওপর। এখন যদি সে না খেয়ে থাকে, তাহলে কার ভালো লাগে। শেষমেশ মুনিয়াকে পশু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার কোনো রোগ খুঁজে পায় না। এমনকি মুনিয়া কেন খেতে চায় না সেটাও বুঝতে পারে না। মুনিয়াকে আবার সেই বারান্দার গ্রিলে খাঁচার মধ্যে ভরে রাখা হয়। এবার মুনিয়া সকাল থেকে দানাপানি খাওয়া শুরু করে। তার ডাকাডাকিও শুরু হয়। এবার মুনিয়ার মন ভালো হলেও মিমির মন খারাপ হয়। সে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করে না। স্কুলে যায় না। তাকে শেষমেশ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ক’দিন মিমিকে না দেখে মুনিয়া খাঁচার এদিক-ওদিক ছুটে বলে, মিমি মিমি, মা যাব, মা যাব। মিমির এখন অসুখ নেই। সে মুনিয়ার কাছে এসে বলে, তোমাকে তো কথা দিয়েছিলাম আর খাঁচায় ভরে রাখব না, তোমার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেবো। তুমি চলে গেলে তো আমার মন কেমন করবে। সেটা ভেবেই আমার অসুখ করেছে। তুমি আবার আমার কাছে আসবে তো। মুনিয়া কী বুঝে মাথা নাড়ে, বলে, আমার নাম মুনি মুনি মুনিয়া। আমি মা যাব। মিমি বলে, যাবে তো। আজই আমি তোমার খাঁচার দুয়ার খুলে দেবো। তারপর তুমি ওই কড়ইগাছটায় উড়ে যাবে। ওখানেই তোমার মা থাকে। মিমি স্কুল থেকে ফিরে মুনিয়ার কাছে যায়। ওকে দেখে মুনিয়া খাঁচার দেয়ালে ঠোকর দিয়ে বলে, মিমি মিমি মিমি। মা যাব। মা যাব। মিমি হেসে বলে, এই তো যাবে। তারপর খাঁচাটিকে নিয়ে ছাদে যায়। মিমিদের ছাদ থেকে কড়ই গাছটা দেখা যায়। খাঁচার দুয়ার খুলে মুনিয়াকে হাতের ওপর বসিয়ে বলে, মুনিয়া, ওই যে গাছটা দেখছ ওইখানে তোমার মা থাকে। তুমি এবার উড়ে মায়ের কাছে যেতে পার। মুনিয়া মিমির হাত থেকে উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে বলে, মা যাব, মা যাব। মিমি বলে, যাও মুনিয়া মায়ের কাছে যাও। মুনিয়া মিমির কাঁধের ওপর বসে। তারপর ঠোঁট ঘষে দেয় মিমির চুলে। বলে, মিমি মিমি মিমি। ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি। মিমির চোখে জল চলে আসে। মিমি বলে, ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি মুনিয়া! মুনিয়া মিমির কাঁধ থেকে উড়ে চলে যায়। মিমি সেদিকে তাকিয়ে হাত নাড়ে।

অলঙ্করণ : নুসরাত জাহান হিরা

ষষ্ঠ শ্রেণি, তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, ঢাকা