অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কৌতূহলের একটি নাম। শিক্ষকতার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিমুক্ত রাখতে রেখেছেন দারুণ ভূমিকা। তিনি বর্তমান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিকাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যাপক এবং সিন্ডিকেট সদস্য ও প্রগতিশীল শিক্ষক সংগঠন শাপলা ফোরামের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান বিভিন্ন ইস্যুতে সাক্ষাত্কার নিয়েছেন কে এম মাহ্ফুজুর রহমান মিশু।
দৈনিক ইত্তেফাক: অধ্যাপক রহমান, আপনি এমন একজন মানুষ যাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শ্রেণির মানুষই চেনেন। আপনি টানা দু’বার প্রক্টর, ছাত্র-উপদেষ্টা এবং বঙ্গবন্ধু হল প্রভোস্টসহ নানামুখী প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ব্যাপারে অনেকেই আপনাকে ফাটাকেস্ট আবার কেউবা পরিশ্রমী সাহসী ডিসিশন মেকার আবার কেউ ধূর্ত মনে করেন। এতে আপনার মতামত কি?
অধ্যাপক মাহবুব: শুধু আমি নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে সকলেই সবার নিকট পরিচিত। তবে হয়তবা বিভিন্নমুখী কর্মকাণ্ডের কারণে আমার পরিচিতিটা বেশি প্রকাশ পেয়েছে। আমি ফাটাকেস্ট বা ডিসিশন মেকার নই। কারণ প্রশাসনিক বিভিন্ন দায়িত্ব পালনকালে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব আমি সততা, স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করেছি মাত্র। এমনকি এসব দায়িত্ব পালনকালে আমার পরিবারকে যতটুকু সময় দেয়ার প্রয়োজন ছিল, তাও দিতে পারিনি। কার্যক্ষেত্রে প্রশাসনের অনেক দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোন বেগ পেতে হয়নি তখন রসিকতা করে আমাকে অনেকেই ফাটাকেস্ট বলে থাকেন। আর যারা অবৈধ সুবিধা নিতে গিয়ে হোঁচট খায় তাঁরা ধূর্ত বলেন।
দৈনিক ইত্তেফাক: বিভিন্ন দায়িত্ব পালনকালে কি কি পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন। দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা কি?
অধ্যাপক মাহবুব: মাননীয় উপাচার্য, মাননীয় উপ-উপাচার্য, মাননীয় ট্রেজারার, আমার প্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোপরি ইবি পরিবারের সার্বিক সহযোগিতায় ক্যাম্পাসকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। সেই সাথে ক্যাম্পাসকে গ্রগতিশীলতার চর্চার উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়াও যেকোনো শুভ এবং অশুভ তথ্য প্রাপ্তির একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছি, এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে আমি মনে করি। এছাড়া গত ৪টি ভর্তি পরীক্ষা সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলায়ের মধ্যে অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতেও আমি সক্ষম হয়েছি। ক্যাম্পাসের নিজস্ব সম্পদের যথাযথ ব্যবহার ও যেকোনো ধরনের দুর্নীতি সনাক্ত করতে প্রশাসনকে সক্রিয় সহযোগিতা করেছি, যা পূর্বে হয়নি বললেই চলে।
দৈনিক ইত্তেফাক: অধ্যাপক রহমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাবেক প্রক্টর ও ছাত্র-উপদেষ্টা হিসেবে কোন শিক্ষার্থী যদি আপনাকে প্রশ্ন করেন বর্তমানে সন্ধ্যার পর আবাসিক হলে প্রবেশের ক্ষেত্রে ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহনে একসাথে যাতায়াতে যে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছেন এটি কি ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণে নাকি অন্য কোন বিষয় নিহিত আছে? এ ব্যাপারে আপনি কি অভিমত ব্যক্ত করবেন?
অধ্যাপক মাহবুব: ইবির অবস্থানগত বিষয়টি প্রথম বিবেচনায় নিতে হবে। সন্ধ্যার পর শিক্ষার্থীরা যেন কোন অনিরাপদ জায়গায় আড্ডা না দেয় সেটি খেয়াল রেখে বর্তমান প্রশাসন যথার্থই কাজই করছেন। এখানে ধর্ম বিবেচনায় নয় বরং আমাদের সামর্থ্য অনুসারে যাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারে সেজন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
দৈনিক ইত্তেফাক: প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রবল বাধার মুখেও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বঙ্গবন্ধুর মূরাল তৈরি করার পিছনে কি অনুভূতি কাজ করেছিল?
অধ্যাপক মাহবুব: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীলদের দীর্ঘদিনের দাবী ছিল ক্যাম্পাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল স্থাপনের, যা প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিরোধে সম্ভব হয়নি। আমি হল প্রভোস্টের দায়িত্ব নিয়ে ২০০৯ সালে চেতনা থেকে প্রবল বাধার মুখে হল সম্মুখে “বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল এবং বাংলাদেশের ম্যাপ” স্থাপন করেছি। পরবর্তীতে বর্তমান প্রশাসন ২০১৮ সালে দেশের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক সবচেয়ে বড় বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল “মুত্যুঞ্জয়ী মুজিব” স্থাপন করেছেন। কারণ বর্তমান প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটি তারই বহিঃপ্রকাশ। এই ম্যুরাল তৈরী করায় আমি বর্তমান প্রশাসনকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।
দৈনিক ইত্তেফাক: ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশের ব্যাপারে যে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছিলেন ওই সময় বহিরাগতদের আবাসিক হলে থাকা ও মাদকের ঘটনা নিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর হয়েছিল সেই সম্পর্কে পাঠকের জানার বেশ আগ্রহ আছে।
অধ্যাপক মাহবুব: প্রথমেই বলেছি ক্যাম্পাসের অবস্থানগত কারণে প্রায় অসম্ভবকে ঝুঁকি নিয়ে সম্ভব করতে পেরেছিলাম। প্রয়োজনে ব্যতিরেকে ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ এবং অবস্থান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিলাম। আর মাদক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। সে ক্ষেত্রে আমাদের বসে থাকার কোন সুযোগ নেই। আমি দাবী করে বলতে পারি আমার সময় ইবি প্রশাসনের সদিচ্ছায় ক্যাম্পাসে মাদক বিরোধী প্রতিটি অভিযান সফল হয়েছে এবং তা মুক্ত করেছি। হ্যাঁ প্রতিটি অভিযান শেষে মুখোশ-ধারী সুবিধাভোগী একটি কুচক্রী মহল প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিল কিন্তু তারা সততা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার কাছে পরাজিত হতে বাধ্য হয়েছে।
দৈনিক ইত্তেফাক: প্রতিক্রিয়াশীলদের আঁতুড়ঘর খ্যাত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও আবাসিক হল থেকে নীরবেই বিতাড়িত হওয়ার পিছনে যৌক্তিকতা কি?
অধ্যাপক মাহবুব: কাজটি অত সহজ ছিল না। দীর্ঘদিন হলগুলোতে কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্ব ছিলনা। কোন রুমে কে থাকবে কি কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে? তা হলবডির নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, এটা প্রক্টর হিসেবে মেনে নিতে কষ্ট হতো। হলবডির কেউ কেউ আপত্তি তুললেও কিছু কৌশল অবলম্বন করে প্রক্টরিয়ালবডিও পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে সরাসরি শিবিরের দুর্গে আঘাত হানি এবং বিনা রক্তপাতে সকল হল শিবিরমুক্ত করতে সমর্থ হই। যদিও কালের পরিক্রমায় অনেকেই এ সফলতার অংশীদারিত্ব দাবি করেছে! কোন অপশক্তি বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না, তা প্রমাণিত। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগতিশীল চর্চা, প্রতিটি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শতভাগ আজ বাস্তবায়ন হচ্ছে।
ইত্তেফাক/এএম