জীবনানন্দের অবচেতনার রূপ, রস ও গন্ধ

পৃথিবীর রূপ, রস ও গন্ধ ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশের কবিসত্তার উন্মোচন ঘটে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে। তার স্বপ্নলোক পূর্বতন কবিদের থেকেই শুধু নয়, দার্শনিক-বিজ্ঞানীদের থেকেও পৃথক। কবিতা যে এক অধরা বাস্তবতার প্রতিরূপ, জীবনানন্দ দাশ তা বার বার আমাদের মনে করিয়ে দেন। কিন্তু এই অধরা বাস্তবতা বস্তুসত্যের অন্যসব ব্যাকরণ অতিক্রম করে একাই পরাক্রমশালী হয়ে ওঠে শেষ পর্যন্ত। আমরা জানি, একজন মানুষের বাইরের জীবন কতকগুলো জাগতিক নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বাইরের নিয়মবদ্ধ অথচ মাত্রাবহুল জীবনের অন্তরালে যে মনোময় জীবন প্রবহমান, তার গতি ও বৈচিত্র্য মুহুর্মুহু আলো-অন্ধকারের এক ব্যাখ্যাতীত অবভাস তৈরি করে। মানুষের জীবনে এমন পরিস্থিতি বার বার আসে, তখন সৌন্দর্য ও নৈতিকতার প্রথাগত ধারণা তাত্পর্যহীন মনে হয়। প্রতিষ্ঠিত যৌক্তিক কাঠামোগুলোকে অযৌক্তিক মনে হতে থাকে—বিকল হয়ে যায় চিন্তাশক্তি, বোধাতীত বিস্ময়ের মধ্যেই জাগরণ ঘটে অবচেতনের। এই অবচেতনের গতি বিচিত্র। আর সেইসব বিচিত্র রূপের সন্ধান দেয় স্বপ্ন।

জীবনানন্দ দাশের ক্রমায়াত কাব্যযাত্রায় ব্যক্তিগত অবচেতনের সমান্তরালে যৌথ অবচেতন (collective unconscious) তথা ঘুম, স্বপ্ন ও অনন্ত সময়গ্রন্থির ব্যবহার লক্ষ করা যায়। অভিজ্ঞতা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তার এই অবচেতনলোকও গতি ও বৈচিত্র্যে অসাধারণ হয়ে উঠেছে। উল্লেখ্য যে, মনঃসমীক্ষণ-তত্ত্বে অবচেতনের মতোই স্বপ্ন একটি অনিবার্য প্রসঙ্গ। অবচেতন ধারণার আলোকে পর্যবেক্ষণের জন্য যতগুলো উপাদান প্রয়োজন, একজন কবির মধ্যে তার প্রায় সবগুলো উপাদানই বিদ্যমান। নাটক কিংবা উপন্যাস বিশ্লেষণের সুবিধা এই যে, সেখানে চরিত্র থাকে, তার বস্তুভিত্তি এবং মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানো একজন মনোবিজ্ঞানীর জন্য অনেকটা সহজ হয়ে ওঠে। কিন্তু কবিতা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, তা হলো কবি নিজেই চরিত্র। তার  ইগো, সুপার-ইগো, চেতন-অবচেতন এমনকি libido বা রতিচেতনার বহুকৌণিক ব্যাখ্যাও কবির মনোজগেক কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। মনস্তত্ত্বচর্চার দীর্ঘ ইতিহাসপরম্পরায় বিতর্কিত বিষয়গুলোর  বৈজ্ঞানিক ভিত্তিলাভের এটা একটা প্রধান কারণ। ফ্রয়েড তার দিবাস্বপ্নের আলোচনায় শিশুর আচরণ ও অনুভূতি প্রাধান্য দিলেও কবিতার প্রসঙ্গ উপস্থাপন করতে গিয়ে এর সৌন্দর্যতত্ত্ব পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছেন। তিনি কল্পনাশক্তিপ্রবণ লেখক এবং day-dreamer-দের মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে বলেছেন :In our comparison of the imaginative writer with the day-dreamer and of poetical creation with the day-dream, is to be of any value, it must above all, show itself in some way or other fruitful. মনোচিকিত্সার পরীক্ষাণাগারের পূর্বধারণা ফ্রয়েড প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করতে চেয়েছেন, কবি নামক চরিত্রের অধরা অস্তিত্ব তার মধ্যে ফ্যান্টসিবোধের জন্ম দিয়েছে। স্বভাবজাত প্রায়োগিক দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি সৌন্দর্যবোধের একটি ব্যাখ্যা উদ্ভাবন করেছেন : The writer softens the character of his egoistic day-dreams by altering and disguising it, and he bribes us by the purely formal -- that is, aesthetic yield of pleasure which he offers us in the presentations of his fantasies. তিনি যখন ইডিপাস-গুঢ়ৈষা ব্যাখ্যা করেছেন, তখনো তার সাহিত্য-শিল্পতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য অপেক্ষা অবচেতনার অনুদ্ঘাটিত রহস্যের প্রতিই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। অবশ্য তিনি এর মধ্য দিয়ে লব্ধ তত্ত্বকেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। এটা প্রায় স্বতঃসিদ্ধ যে, পৃথিবীর সকল শিশুরই আকাঙ্ক্ষা ও কল্পনার চারিত্র্য মৌলিক। আর শিশুদের বাস্তব জীবনাভিজ্ঞতার ক্ষেত্র থাকে সীমাবদ্ধ। ফ্রয়েড শিশুদের স্বপ্ন ব্যাখ্যায় যৌনতার মানদণ্ড বেশি মাত্রায় ব্যবহার করেছেন সম্ভবত তার পরীক্ষাগারের অভিজ্ঞতা থেকে। সৃজনশীল লেখকদের সম্পর্কে তার মূল্যায়ন হলো : সৃজনশীল লেখক অনেকটা শিশুর মতোই। তিনি এক উদ্ভট কল্পনার (fantasy) জগত্ তৈরি করে তা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি প্রচুর পরিমাণে আবেগের সমাবেশ ঘটান, যা বাস্তবতা থেকে স্পষ্টতই পৃথক। এই স্বপ্নকে বলা হয় অবচেতনে প্রবেশের মূল রাস্তা। বিষয়টিকে টেরি ইগলটন ব্যাখ্যা করেন এভাবে : ‘অবচেতনে যাওয়ার রাজপথ হলো স্বপ্ন। স্বপ্ন আমাদেরকে ক্ষণিক সুযোগ দেয় অবচেতনের কাজ প্রত্যক্ষ করার। ইচ্ছাগুলো প্রতীকী রূপ ধারণ করে একারণে যে, সরাসরি প্রকাশিত হলে তার অভিঘাতে আমাদের ঘুম ভেঙে যেত। যাতে আমাদের ঘুম না ভেঙে যায়, সেজন্য অবচেতন মন দয়া করে এর আসল অর্থ গোপন, নরম কিংবা বিকৃত করে উপস্থাপন করে। ফলে আমাদের স্বপ্ন হয়ে পড়ে প্রতীকী টেক্সট, চেষ্টা করে যার অর্থ উদ্ধার করতে হয়। এমনকি স্বপ্ন দেখার সময়টাতেও চেতন মন বা অহং পাহারায় থাকে, এবং একটা-দুটো চিত্রকল্প সেন্সর করা, দু-একটা সংকেত মুছে দেওয়ার কাজ চালিয়ে যেতে থাকে।’ (Literary Theory: An Introduction—অনু. খোন্দকার আশরাফ হোসেন) অবচেতনের অদ্ভুত কার্যক্রম একধরনের দুর্বোধ্যতার জন্ম দেয়। কার্ল গুস্তাভ ইয়ুঙ অবচেতন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে  ফ্রয়েডের ধারণা ও পরিকল্পন (Paradigm) থেকে এগিয়ে গেছেন অনেকখানি—শিল্পের স্বরূপ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যা পালন করে থাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ইয়ুঙ তার পূর্বপ্রস্তুতির সূত্র নির্দেশ করেন এভাবে : The unconscious plays causal part in the neurosis, and since dreams are the direct expression of psychic activity, the attempt to analyze and interpret dreams is entirely justified from a scientific Sandpoint. (Modern Man: In Search of a Soul) ইয়ুঙ পুরাণ-প্রতিমা বা archetype-এর যে ব্যাখ্যা দেন সেখানে স্বপ্ন বহুমুখী তাত্পর্য নিয়ে প্রকাশ পায়। মানুষের স্বপ্নের আর্কেটাইপগুলো কিছু প্রতীকের মাধ্যমে রচনা করে দৃশ্য, চিত্র বা কাহিনি—ব্যবহার করে কবিতা, পুরাণ বা রূপকথার গঠন-কাঠামো। ফ্রয়েড যে অবচেতন ব্যাখ্যা করেন, সেখানে তার কোনো ইতিবাচক দিক নেই। কিন্তু ইয়ুঙের ইতিবাচক অবচেতন-ব্যাখ্যা অতিক্রম করে যায় ফ্রয়েডের অবচেতন ধারণা। তিনি স্পষ্টতই লক্ষ করেন যে, স্বপ্নের ক্ষেত্রে যৌথ অবচেতনের একটা ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও মানসগঠন-প্রক্রিয়াকে যথার্থ দিকনির্দেশনা দানের জন্য যৌথ অবচেতন স্বপ্নে প্রতীকী চিত্রমালার সহায়তায় ইতিবাচক নির্দেশ বা সতর্কবাণী প্রেরণ করে। কবিতার মধ্যে আরো প্রবলভাবে সক্রিয় থাকে ব্যক্তির মানস-রূপায়ণ-প্রক্রিয়া—যা প্রতীক, চিত্রকল্প কিংবা সংকেতের মধ্য দিয়ে অবচেতনের অভিপ্রায়কে এগিয়ে নিয়ে যায়। ইয়ুঙ তার Psychology and Literature (১৯৩০) শীর্ষক রচনায় মহত্ সৃষ্টির গঠন-কাঠামোকে স্বপ্নের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কবির সৃষ্টি-বেদনা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেন মাতৃ-আর্কেটাইপ :It makes no difference whether the poet knows that his work is begotten, grows, and matures with him, or whether he supposes that by taking thought he produces it out of the void. His opinion of the matter does not change the fact that his own work outgrows him as a child its mother. The creative process has feminine quality, and creative work arises from unconscious depths— we might say, from the realm of the mothers. অবচেতনের এই গভীর তল জীবনানন্দের কবিতা অনুধাবনে আমাদের সহায়ক হতে পারে। জীবনানন্দ দাশের অনেক কবিতাই মানুষের কাছে দুর্বোধ্য। কারণ, তার কবিতার সৃজন-প্রক্রিয়া ও স্বপ্ন-উত্স আমাদের অজ্ঞাত। তবে স্বপ্ন, পুরাণ বা প্রত্নলোকের ধারণাসূত্রে আমরা জীবনানন্দ দাশের কবিতার একটা নিজের মতো ব্যাখ্যা নির্মাণ করতে পারি।

জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ব্যক্তি-অবচেতনের বহুমুখী বিন্যাস লক্ষ করা যায়; সেই সঙ্গে সঙ্গে যৌথ অবচেতনেরও। তার কবিতা মূলত পুঞ্জীভূত স্বপ্নের ডাল-পালা। এইসব স্বপ্ন পুরাণ-কথা ও যৌথ অবচেতনের মাত্রাবহুল ক্রিয়শীলতায় শব্দরূপ পেয়েছে কবিতায়। তিনি নিজেই সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য শব্দ-পুরাণ—যেগুলো দ্বারা নির্মিত হয়েছে তার কবিতালোক। প্রত্যেক মহত্ কবিরই চৈতন্যের একটা সামগ্রিক চরিত্র থাকে। সেই চৈতন্যময় জীবনের গভীরেই থাকে তার বহুস্তরময় অবচেতনলোক। জগেক কবি কীভাবে প্রত্যক্ষ করেন, তার মধ্যেই নিহিত থাকে কবির শিল্পস্বভাবের মূলসূত্র। এভাবেই অবচেতনের ব্যাখ্যাসূত্রে স্বপ্নকে, স্বপ্নের ব্যাখ্যাসূত্রে অন্য এক বিস্ময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাই আমরা।

 

২.

জীবনানন্দ দাশের সঞ্চিত স্মৃতির কতটা ব্যক্তিগত অথবা জাতিগত—তার অনুসন্ধানসূত্রেই আমরা স্পর্শ করতে পারি কবির স্বপ্নলোক। ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র ‘জীবন’ কবিতা থেকেই আমরা উপলব্ধি করতে শুরু করি কবির ‘বোধ’-এর ব্যাপকতা:

চারিদিকে বেজে ওঠে অন্ধকার সমুদ্রের স্বর,—

নতুন রাত্রির সাথে পৃথিবীর বিবাহের গান!

ফসল উঠিছে ফ’লে,—রসে রসে ভরিছে শিকড়;     

লক্ষ নক্ষত্রের সাথে কথা কয় পৃথিবীর প্রাণ!

সে কোন্ প্রথম ভোরে পৃথিবীতে ছিল যে সন্তান

অঙ্কুরের মতো আজ জেগেছে সে জীবনের বেগে!

আমার দেহের গন্ধে পাই তার শরীরের ঘ্রাণ,—

সিন্ধুর ফেনার গন্ধ আমার শরীরে আছে লেগে!

কবি যে শিল্পযজ্ঞের ঋত্বিক, সেই যজ্ঞশালায় নিজের অবচেতন-কাঠামোকেও নির্মাণ করতে হয় তাঁকে : ‘আমি সেই পুরোহিত—সেই পুরোহিত!—/ যে নক্ষত্র মরে যায়, তাহার বুকের শীত/ লাগিতেছে আমার শরীরে,—’ (নির্জন স্বাক্ষর)। কবির ব্যক্তিগত স্মৃতিলোকের সঙ্গে যুক্ত হয় আরো ব্যাপক ও গভীর জাতি, সভ্যতা ও সৃষ্টিগত স্মৃতিভাণ্ডার। প্রত্যেক কবিরই স্বপ্ন-ব্যাকরণ স্বতন্ত্র। এই স্বাতন্ত্র্যের উত্স কবির বাস্তবকে দেখা এবং উপলব্ধি করার পদ্ধতির মধ্যে নিহিত। ইয়ুঙ তার Man and His Symbol গ্রন্থে বাস্তবের অবচেতন মাত্রা সম্পর্কে যে ব্যাখ্যা দেন, তা জীবনানন্দের কবিতা অনুভবের জন্য সহায়ক হয়ে উঠতে পারে :‘বাস্তবকে অবলোকন করার (বা অনুভব করার)  রয়েছে কিছু অবচেতন (Unconscious) মাত্রা। বাস্তব কিছু ঘটনায়—যেমন, চিত্র বা ধ্বনিতে, আমাদের ইন্দ্রিয় যখন সাড়া দেয়, তখন ওই সব ঘটনা বাস্তবের জগত্ থেকে কোনোভাবে অনূদিত (বা ভাষান্তরিত) হয়ে মনের এলাকায় এসে পৌঁছায়। যেগুলো মনের জগতে মানস-ঘটনায় পরিণত হয়, যার চূড়ান্ত প্রকৃতি অজ্ঞেয় থেকে যায় (কেননা, মানস বা psyche কখনো জানতে পারে না তার নিজের মানস সারাত্সার)। এইভাবে প্রতিটি অভিজ্ঞতার অন্তর্গত হয় কিছু সংখ্যক অনিশ্চিত অজ্ঞাত উপাদান।... বাস্তব বা মূর্ত বস্তু সব সময়ই কোনো-না কোনো দিক থেকে অজ্ঞাত থাকে—কারণ, বস্তুর চূড়ান্ত প্রকৃতি কী তা আমরা কখনোই জানতে পারব না।’ আমাদের সচেতন জ্ঞানের বাইরেও রয়ে গেছে এক অধরা জগত্, ইয়ুঙ যাকে বলেছেন ‘অবচেতনের অন্ধকার’। ওই জগত্ সম্পর্কে আমরা সচেতন হতে পারি কেবল সজ্ঞা বা পরাদৃষ্টির (intuition) সহায়তায়। অবচেতনের অন্ধকার থেকে উত্সারিত ঘটনাগুলোই স্বপ্নের অবয়ব নিয়ে ধরা পড়ে, কবি তাকেই কবিতায় রূপ দেন। জীবনানন্দের ‘অনেক আকাশ’ কবিতার পরাজগত্ তার প্রিয় চিত্রকল্প পাখি-প্রতীকের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে।

 পৃথিবীর আকাশে পুরনো ‘আত্মার মতন’ জেগে থেকে চলমানতা ও একাকীত্বের মধ্যেও তার পরা-অভিজ্ঞতার জগত্ নবজন্ম ঘটে। ‘বাতাসের সাথে সাথে’ তার একাকী মনের চলাও ‘পাহাড়ে হাওয়ার মতো, কিংবা ‘সিন্ধুর ঢেউয়ের মতো’। অজ্ঞেয় জগেক কীভাবে ব্যক্ত করা যায় স্বপ্নের হাত ধরে, তারও দেখা পাওয়া যায় কবিতায় :

—কোন্ দূর দেশ— কোন্ নিরুদ্দেশে

জন্ম তার হয়েছিল,— সেইখানে উঠেছে সে বেড়ে;

দেহের ছায়ার মতো আমার মনের সাথে মেশে

 কোন স্বপ্ন!— এ আকাশ ছেড়ে দিয়ে কোন আকাশেরে

                            খুঁজে ফিরি!—

জীবনানন্দের কবিতায় স্বপ্ন প্রধানত দুইভাবে প্রকাশ পেয়েছে : এক. পুরাণ-পদ্ধতি (Mythical way) দুই. অবচেতনের (Unconscious) পদ্ধতি। এবং আর্কেটাইপের বিচিত্র ব্যবহারেও স্বপ্নের জন্ম এবং জন্মান্তর সাধিত হয়েছে।

 

৩.

সভ্যতা ও শিল্পের ইতিহাসের সঙ্গেও স্বপ্নযাত্রার নিগূঢ় সম্পর্ক রয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই স্বপ্ন দেখছে মানুষ। মানুষের মনোগঠনের প্রকৃতির রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নের প্রকৃতিও যে পাল্টে গেছে বহুগুণে, শিল্পের ইতিহাসে তার দৃষ্টান্তও প্রচুর। স্বপ্ন দেখা এবং তা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে অবচেতনের সত্য ও সামাজিক বিধিনিষেধের দ্বন্দ্ব সবকালেই ছিল। সভ্যতা বিজ্ঞাননির্ভর হয়ে উঠতে থাকায় উনিশ শতক থেকেই শিল্পকলার চরিত্রে ঘটতে থাকে ব্যাপকতর পালাবদল। ডারউইন থেকে ফ্রয়েড পর্যন্ত অধিকাংশ চিন্তন ও আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে মানুষের মনোগঠন ও স্বপ্নের ক্ষেত্রে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন ঘটে যায়। মানুষের আত্মসন্ধান ও আত্মআবিষ্কারকে সবচেয়ে বড়ো নাড়া দিয়েছিল ডারউইনের তত্ত্ব। সেখানে প্রাণের উদ্ভব ও বিবর্তনের ধারায় মানুষের অবস্থান যে একান্তভাবেই প্রাকৃতিক, আধ্যাত্মিক  নয়—এই উপলব্ধি লক্ষ কোটি বছরের জৈব-সংস্কারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছিল। অন্যদিকে ফ্রয়েডের স্বপ্ন-ব্যাখ্যা কিংবা পুরাণকথার মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ মানুষের সকল কৃত্রিম আবরণকে ছুড়ে বাইরে ফেলে দিল। আধ্যাত্মিকতাবিমুখ এইসব মানুষ কি তাহলে একটা জৈবসংস্কারের রক্ত-মাংসপিণ্ড মাত্র! এই প্রশ্নের মীমাংসা কিংবা নিরন্তর মীমাংসাহীনতার সূত্র সন্ধানেই আমরা স্বপ্নের কাছে যেতে চাই। সভ্যতার একেকটি স্তর যেন হয়ে ওঠে বহুবিধ স্বপ্নেরই পুঞ্জীভবন। জীবনান্দ দাশের ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র শেষ কবিতায় এই স্বপ্নকেই দেখা যায় প্রশ্নবিদ্ধ কিংবা প্রশ্নাতীত রূপে:

আলো আর অন্ধকারে মুছে যায় সে সব ব্যর্থতা!...

পৃথিবীর এই অধীরতা

থেমে যায়, — আমাদের হূদয়ের ব্যথা

দূরের ধুলো পথ চেয়ে

স্বপ্নেরে-ধ্যানেরে

কাছে ডেকে লয়! —

উজ্জল আলোর দিন নিভে যায়,

মানুষেরো আয়ু শেষ হয়!

পৃথিবীর পুরানো সে-পথ

মুছে ফেলে রেখা তার, —

কিন্তু এই স্বপ্নের জগত্

চিরদিন রয়!

সময়ের হাত এসে মুছে ফেলে আর সব,—

নক্ষত্রেরো আয়ু শেষ হয়। (স্বপ্নের হাতে)

এভাবেই শুরু হয়ে যায় স্বপ্নের ভেতর দিয়ে অবচেতনার অনুসন্ধান। স্বপ্ন অতিক্রম করে যায় হূদয়কে :

পৃথিবীর যত ব্যথা,— বিরোধ,— বাস্তব

হূদয় ভুলিয়া যায় সব।

চাহিয়াছে অন্তর যে ভাষা,

যেই ইচ্ছা যেই ভালবাসা

খুঁজিয়াছে পৃথিবীর পারে পারে গিয়া, —

স্বপ্নে তাহা সত্য হয়ে উঠেছে ফলিয়া!

স্বপ্নের স্থানিক রূপটি তখনই তাত্পর্যময় হয়ে ওঠে, যখন তার একটি সর্বজনীন চরিত্র নির্মাণ করা যায়। বাঙালি কবির স্বপ্ন বিশ্ব-কবিতার স্বপ্নের সমান্তরাল হয়ে উঠেছে এ অনুভূতি যে কতটা আত্মশক্তি ও প্রেরণার—জীবনানন্দের কবিতায় তার দৃষ্টান্ত প্রচুর। ‘রূপসী বাংলা’র একটি কবিতায় আমরা দেখি :

দূর পৃথিবীর গন্ধে ভরে উঠে আমার এ বাঙালির মন

আজ রাতে; একদিন মৃত্যু এসে যদি দূর নক্ষত্রের তলে

 অচেনাঘাসের বুকে আমারে ঘুমায়ে যেতে বলে

তবুও সে ঘাস এই বাংলার অবিরলঘাসের মতন

মউরির মৃদু গন্ধে ভ’রে র’বে; — কিশোরীর স্তন

প্রথম জননী হয়ে যেমন ননীর ঢেউয়ে গলে

পৃথিবীর সব দেশে ——

‘দূর পৃথিবী’, ‘দূর নক্ষত্র’, ‘কিশোরী স্তন’, কিংবা ‘প্রথম জননী’র মতো প্রতীকগুলো যেমন স্বপ্নসঞ্চারী তেমনি সর্বকালের—সর্বদেশের। কবিরাও সামাজিক প্রাণী—সামাজিক সংস্কারের মতো শব্দব্যবহারের ক্ষেত্রে তার ওপর অনেক বিধি-নিষেধের ট্যাবু (taboo) সক্রিয় থাকে। স্বপ্ন-প্রতীকের মধ্য দিয়ে কবিকে অতিক্রম করতে হয়—এইসব বিধিনিষেধ। প্রাণিজ অনুষঙ্গের মধ্যদিয়ে কবিকে উর্বরতা ও মৌলিকতার উত্স সন্ধান করতে  হয়। জীবনানন্দ দাশ এ কাজটি করেছেন দক্ষতার সঙ্গে : ‘স্তন তার/ করুণ শঙ্খের মতো দুধে আর্দ্র কবেকার শঙ্খিনী মালার।’ —বাঙালি নারী রূপায়ণে প্রত্নস্মৃতি ও প্রত্নবেদনার সমীকরণ মানুষের সামূহিক স্বপ্নলোককে অন্য অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যেন। জন্মান্তরের স্বপ্ন কীভাবে আবার স্বপ্নের মধ্যে নতুন করে জন্ম নেয়, কীভাবে মিলে যায় স্ববিরোধী — দ্বৈরথ তার একটি দৃষ্টান্ত :

তবু এই পৃথিবীর সব আলো একদিন নিভে গেলে পরে,

পৃথিবীর সব গল্প একদিন ফুরাবে যখন,

মানুষ রবে না আর রবে শুধু মানুষের স্বপ্ন তখন;

সেই সুখ আর আমি বসে সেই স্বপ্নের ভিতরে। (‘স্বপ্ন’, মহাপৃথিবী)

একমাত্র কবিরাই পারে স্বপ্ন দেখতে। এই স্বপ্ন জীবন অথবা মৃত্যুর হতে পারে। আবার হতে পারে পুনর্জন্মেরও। পৃথিবীর সবকালে মিথ-আশ্রয়ী কবিতার চিত্রকল্পে ডানামেলা স্বপ্নের দেখা পাওয়া যায়। কবিতার স্বপ্ন একটা শরীরী রূপ পরিগ্রহণ করে। জীবনানন্দের জন্মান্তরের স্বপ্ন তখনই সত্য হয়ে ওঠে আমাদের কাছে, যখন দেখি তার ভবিষতের স্বপ্নরূপ গভীরতর অর্থে অভিন্নতা-দ্যোতক। তার অবয়বগত রূপান্তর সত্যেও বর্তমানের স্মৃতিপুঞ্জই সেখানে অন্য রূপে প্রকাশ পায়। একটি বহুলপঠিত কবিতাসূত্রে বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে। ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতাটির সবকিছুর মধ্যে রয়েছে নবজম্মের আকাঙ্ক্ষা। শব্দ, বর্ণ, চিত্র ও ধ্বনি—সবকিছুর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে মৃত্তিকালগ্ন প্রেমিক কবির জন্মান্তরের স্বপ্নলোক। শঙ্খচিল, শালিক কিংবা হাঁসের অবয়ব নিয়ে কে আসবে পৃথিবীতে? তা নিঃসন্দেহে কবির স্বপ্ন। তার ইন্দ্রিয়ময় জগিট এই বাস্তবেরই প্রতিরূপ :

আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে

জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙায়;

কবিতা যে স্বপ্নবাস্তবতার প্রতিরূপ, এভাবেই জীবনানন্দ দাশ বারবার মনে করিয়ে দেন আমাদের। তার এই বাস্তবতা  জগত্ ও জীবনের অন্যসব ব্যাকরণ অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত একাই পরাক্রমশালী হয়ে ওঠে। এবং তা সঞ্চারিত হতে থাকে জীবনপরম্পরাব্যাপী মানবহূদয়ে।