একদিন একটা সকাল ছিনতাই হয়েছিল। আমি কিছু বলিনি। আশ্বিনের বাড়াবাড়িতে কিছুই বলা হয়নি। আকাশের আকাশচুম্বী দাপাদাপির কোনো সীমা পরিসীমা ছিল না। বাতাসও নেংটি খুলে ইঁদুরদৌড় দিল। চেনা পথঘাটগুলো সব অচেনা হলো। হাঁটুজল আর কাদামাটির সেকি সরস সুখের দিন! এমনি দিনে নীলুর বিয়ে। আড়ম্বরের কোথাও কোনো কমতি নেই। হলুদ বাটা, মেহেদি বাটা, পটকা ফোটা সবকিছু...। প্রেমহীন বিয়ে। শরীরের না মনের তা ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ জানে না!
আমার ধারণা, সেইদিন যতগুলো গরু-খাসি কোরবানি হয়েছিল এরচেয়ে দুইটা বেশি ছিল। একটা নীলু। একটা সকাল। নীলু সবেমাত্র ক্লাস এইটের চৌকাঠ পেরিয়েছে। নাইনের তাজা বাতাস এখনো তার গায়ে লাগেনি। বিয়ে কি জিনিস ভালো বোঝেও না। এই বয়সে বোঝার কথাও নয়। ফুটন্ত গোলাপের পাঁপড়ির মতো গায়ের রং। শরীরের ভাঁজে সবে যৌবন দানা বাধতে শুরু করেছে। যে বয়সে সবার মাঝে ঈশ্বর স্বয়ং প্রতিভাত হন; নীলুর এখন সেই বয়স। ওর সমস্ত শরীরে যেন অঙ্কিত আছে একটা মোহময় মায়া কানন।
সেই মায়ামৃগের সন্ধান যে পেয়েছিল; সে-ই আমাদের সকাল। ভোরের শুভ্রতার মতোই শান্তশিষ্ট, মিষ্টি অবয়ব।
তুখোড় মেধাবী মুখ। পরিচ্ছন্ন আচরণে দশ গেরামে তার জুড়ি মেলা দুষ্কর। কিছুটা মেয়েলি স্বভাবের অন্তর। বুক আর মুখ একসঙ্গে চালাতে পারে না। বুক থেকে গলা অবধি এসেই কাঁটার মতো আটকে যায়। মুখ পর্যন্ত পৌঁছায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রৌদ্রকরোজ্জ্বল উঠোন মাড়ানো পাঁচ গাঁয়ের প্রথম পথিকৃত্। অযত্নে লালিত সফেদা গাছের প্রথম ফলের মতো আলোকময়। সকালের আরো একটি পরিচয় আছে। সে কবিতা লেখে।
২.
আমিও একজন অদ্ভুত টাইপের মানুষ। কিছুটা হিমালয় হিমালয় গন্ধ করে। তবে আমি হিমালয়ের মতো বরফের পাঞ্জাবি পরি না। লুঙ্গি পরতে খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। রাত-বিরাতে ঘুরে বেড়ানোও আমার পছন্দের তালিকায় নেই। বড়োজোর জামতলা থেকে তিনকোনা পুকুরপাড়। তাও আবার বিষণ্ন বিকেলবেলা। এখন বাইরে বের হলেই একটা প্রচ্ছন্ন ভয় এসে গলা টিপে ধরে। দিনকাল আর আগের মতো নেই। অনেকাংশে বদলে গেছে। প্রাগৈতিহাসিক নাট্যকলা ফিরে আসতে শুরু করেছে। তবে এরচেয়ে বড়ো কথা কালের চেয়ে মানুষগুলো বদলে গেছে অনেক অনেক বেশি। অবশ্য একথাও সত্যি যে, যে ভয় পায় না; সে মানুষই নয়। জিন-পরি টাইপ কিছু একটা হবে। কেউ তাকে দেখে না, সে সবাইকে দেখে। তবুও কেউ কেউ আমাকে দরবেশ দরবেশ ঠাওরায়। আবার কারো কারো মতে, আমি একজন নিরেট ভণ্ড। তবে গাছ থেকে তাল পড়ার মতো দুই-একটা কথা হঠাত্ জায়গামতো লেগে যায়।
যাক এসব পচাবাসি কথা। সেদিন নীলুর বিয়েতে আমিও ছিলাম। কথা বাড়িয়ে বলা অথবা আগবাড়িয়ে বলা মানুষের একপ্রকার স্বভাব। আমি নিজেও সেসব দোষে কিছুটা হলেও দুষ্ট। সত্যি কথা বলতে কি, প্রকৃতির সেই রুদ্র রূপ আমি আজো ভুলতে পারিনি। একেবারে বদ্ধ পাগলের মতো অবস্থা। জ্ঞানহীন বৃষ্টি আর অবুঝ বাতাসের সেকি ভুতুড়ে সেক্স। এরচেয়ে অদ্ভুত কথা, এত যে বৈরী আবহাওয়া, প্রতিকূল পরিবেশ, মান্দারের কাঁটার মতো প্রতিবেশ—তবুও নীলুর বিয়ের কোনো আয়োজন আটকাতে পারেনি। সকাল আর নীলুর ভয়াবহ মুখদর্শন শেষে আমিও চেয়েছিলাম রোজ কিয়ামতের মতো কিছু একটা হোক। অন্তত আজকের মতো নীলুর বিয়েটা বন্ধ হোক। আমার দরবেশির নিকুচি করি। হিমালয়কে পাগলা কুত্তা একশো একবার কামড় দিক। আকাশ থেকে বড়ো বড়ো বরফ পাহাড় পড়ে বিয়ে বাড়ি তামাদি হোক...তবুও আমি নিষ্প্রাণ দুইটি দেহে প্রাণের সঞ্চার করার শেষ প্রচেষ্টা করে দেখতে চাই। বিধাতাকে বলি, আমাকে শুধু একটা সুযোগ দাও। মাত্র একটা।
জীবনে কত পাপ করেছি মাছির চোখের মতো তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আজ না হয় আরো একটি নতুন পাপের পালক পুরাতনের সাথে যুক্ত হবে। হোক। এ বিষয়ে আমার কোনো তদবির নেই। তুমি শুধু এই আশ্বিনা মহাপ্রলয়কে আরো একটু তাতিয়ে দাও। ওর জোড়া ডানায় আগুন জ্বালিয়ে দাও। সেই আগুনে এই বিয়ের সকল অনুষঙ্গ খড়কুটোর মতো ভেসে যাক।
৩.
অতঃপর আমার সমস্ত দরবেশি মাটি হলো। হিমালয় নাম চুলোয় গেল। ওরা কেউ থামল না। না আশ্বিনা ঝড়। না বর পক্ষের আগমন। আর না কনে পক্ষের জোয়ার জল। তুমুল বৃষ্টি আর দমকা হাওয়া যেন লাঠালাঠির উষ্ণতা আরো বহুরূপী মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছে। বাতাসের সাঁ সাঁ শব্দ গাছেদের পাতায় লেগে নতুন সুরের মূর্চ্ছনা সৃষ্টি করেছে। সুরের এই ইন্দ্রজালের সঙ্গে কাদাজলে লুটোপুটি খেয়ে লাটি খেলতে পারা এবং খেলা দেখতে পারা সবার ললাটে জোটে না। এখানে যেমন থ্রিল আছে, তেমনি আছে রোমাঞ্চ। বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে আকাশ-বাতাস ওরাও চেটেপুটে খেয়ে নিচ্ছে স্বাদ। ভোগ আর উপভোগের এমন সুবর্ণসুযোগ হাতছাড়া করে কোন হতচ্ছাড়া?
এই খেলায় আমরা তিনজন মাত্র পরাজিত। সকাল, নীলু আর আমি অধম। একটা আধাচালা ঘরের নিচে আধাআধি করে দাঁড়িয়ে আছি। আমার অদূরেই সকাল। তার মাথার ওপরে আকাশই একমাত্র ছাদ। ভেন্না পাতাও নেই। এই আক্রোশমূলক বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ছেলেটা সাংঘাতিক রকম ঘামছে। সকল মানুষের সহ্যের একটা সীমা আছে। আমারও। চোখের ইশারায় সকালকে কাছে ডাকলাম। ও কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। তবে থতমত খায়নি। আমি কোনো ভনিতা না করেই জিজ্ঞেস করলাম—
তুমি কি নীলুকে... এই পর্যন্ত বলতেই সে উত্তর দিল, জি আমি নীলুকে ভালোবাসি।
মনে মনে আমি সকালের আইকিউর প্রশংসা না করে পারলাম না। আবার বললাম, নীলু কি সেটা
জানে?
জি না। আমি ওকে সরাসরি কোনোদিন বলিনি।
এ আবার কেমন ভালোবাসা?
কেন, কবিতার মতো। আমি তো কবিতাকেও কোনোদিন বলিনি তোমাকে ভালোবাসি। তবুও তো আমি তাকে ভালোবাসি। সব ভালোবাসা বলতে হয় না। হূদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। হূদয়ে ধারণ করতে হয়।
আমি আরেকবার সকালকে মনে মনে সালাম দিলাম। পরিষ্কার আকাশের মতো তার স্পষ্টভাষিতা আমাকে বিমুগ্ধ করল। তবুও আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, নীলু কি তোমাকে...?
জি আমার ধারণা নীলুও আমাকে ভালোবাসে। যে মাটিতে আমাদের শরীর তৈরি সেই মাটির মতোই ভালোবাসে। সেকথা ও আমাকে কয়েকদিন বলতে চেয়েছে। কিন্তু বুক ভেঙে মুখে আনতে পারেনি। তবে আমি ঠিকই বুঝে নিয়েছি। যেমনি করে বাতাসকে আমরা না দেখে বিশ্বাস করি, তেমনি।
আমি কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমার মাথায় সমস্ত আকাশ। তবুও ভালো পায়ের তলার মাটি সরে যায়নি দেখে নিজের কাছেই খুব অবাক লাগছে। আসলে অন্ধকার দিয়ে অন্ধকার চেনা যায় না। অন্ধকার চিনতে হয় আলো দিয়ে। সকাল তেমনি এক আলোর নাম। রাত্রির নপুংসক অন্ধকারকে আলোকিত করার জন্যই সকালদের জন্ম।
আমার ভাবান্তর টের পেলাম। সকালকে আর কিছু না বলে দস্যু বৃষ্টির দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলাম।
৪.
হয়তো মহাবিশ্বের সীমানা আছে, কিন্তু মুর্খামির কোনো সীমানা নেই। এই কথাটি আমার না। কে বলেছে তাও এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। তবে যেই বলুক না কেন, কথাটা কিন্তু মন্দ না। আরো একটি বিষয় আছে, আমি খালি চোখে ঝাপসা দেখি না, চশমা পড়লেই ঝাপসা দেখি। আমি জানি, মুর্খদের এই দলে কে কে আছে, ইতিহাস সেকথা কোনোদিন ঘাঁটতে যাবে না। তবুও আমি নীলুর সঙ্গে এক চিমটি কথা না বলে থাকতে পারছি না। এখানেও সমস্যা কম না। পাড়ার মেয়েরা জোঁকের মতো ওর পেছনে লেগে আছে। তারা কেউ কোনোদিন নতুন বউ দেখেনি।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পরিকল্পনা ঠিক করতে চাইলাম। মাথায় কিছু কাজ করছে না। কিন্তু অনবরত সংকেত পাঠাচ্ছে। বুঝতে পারলাম মাথা কাজ না করার মানে দুইটি। এক সুযোগের অপেক্ষা করা। দুই রিস্ক নেওয়া। নেকড়ের মতো শিকার ধরার জন্য ওত পেতে বসে থাকার মতো সময় আমার হাতে নেই। সুইয়ের মতো চিকন ছিদ্র দিয়েই আমাকে ঢুকতে হবে। অতঃপর সুযোগ পেলে ফাল হয়ে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্ধকারেরও আলাদা একটি রূপ আছে। সেই রূপ কয়জন দেখতে পারে?
হঠাত্ শিয়াল দৌড়ের কথা মনে পড়ল। মানুষ দেখলেই সে লেজ গুটিয়ে ভোঁ দৌড় দেয়। সামনে পেছনে তাকায় না। আমিও এমনি একটা দৌড় দিয়ে যে ঘরের মাঝখানে নীলু স্থানুর মতো বসে আছে, সেখানে গিয়ে পৌঁছালাম। আমাকে দেখেই মুখরা রমণীদল সমানে শব্দ ও বাক্যবাণ ছুড়তে লাগল। আমি একটাও ফেরানোর চিন্তা মাথায় ঠাঁই দিলাম না। বীরের মতো সদর্পে বললাম, নীলু, তোর সাথে আমার কিছু কথা আছে। পেছন থেকে কে জানি বলল, কী কথা?
আমি মুখ না ঘুরিয়েই বললাম, যে কথার কোনো আগামাথা নেই সেই কথা। নীলু পাথরের মূর্তির মতো আমাকে অনুসরণ করল।
কিছুক্ষণ শামুক নীরবতা। কেউ কথা বলছি না। না আমি। না নীলু। নীলু পাখির ছানার মতো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর আমি একবার আকাশে যাই। আরেকবার যাই পাতালে। যেন পৃথিবীতে আমি নেই। কথা বলি আর না বলি, আমি জানি দুজনের হূদয়েই অশান্ত সাগরের ঢেউ। আমি স্বীকার করছি, এ আমার দুর্বলতা বই কিছু নয়। অবশেষে নীলুই প্রথম মুখের তালা খুলল। যেন মাটির কাছে জানতে চাইল, কিছু বলবেন ভাইয়া? আমিও চোখের পলক ফেলার আগেই পৃথিবীতে ফিরে এলাম। গলার স্বর খাদের কিনারে নামিয়ে এনে বললাম, তুমি সকালকে চেনো?
জি ভাইয়া চিনি।
কতটা চেনো?
কেজিতে বলব নাকি সের দরে বলব?
তোমার যা মর্জি হয়।
এরপর নীলু আর নিজেকে আটকে রাখতে পারেনি। কেটে দেওয়া বাধের জলের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। এরপরের ঘটনাটি আরো আশ্চর্য, ধনুকে তীর দিতে যতক্ষণ, ঠিক ততক্ষণ সময়ে সে নিজেকে ফিরে পেল। কে বলবে এক বিজলি সময় আগেই এই মেয়ের চোখে জলপ্রপাত ছিল। অতঃপর কোনো রাখঢাক না করেই সে বলল, আপনি যা জানতে চেয়েছেন, আমি তা বুঝতে পেরেছি ভাইয়া। শুধু শুধু আপনাকে কষ্ট করে প্রশ্ন করতে হবে না। আমিই বলছি।
শুনুন ভাইয়া, রাত যেমন সত্য, দিন যেমন সত্য; তেমনি সকাল আর আমার ভালোবাসাও সত্য। তবে সকাল আমাকে এ বিষয়ে কিছু বলেনি অথবা আমিও সকালকে কিছু বলিনি। তবে আমাদের কোনো কথা হয়নি, দেখা হয়নি বিষয়টি এমনও নয়। নানাবাড়িতে অসংখ্যবার দেখা হয়েছে। কথাও হয়েছে। আমাদের প্রতিটি সাক্ষাত্ কবিতার চেয়ে কম লাবণ্যময় নয়।
এতটুকু বলেই নীলু থামল। তার চোখে এক বিন্দু অশ্রু নেই। কেবল ভালোবাসা নিয়ে গৌরব আছে। হিমালয়ের মতো অহংকার আছে। ওদের কাছে হয়তো আমার ভালোবাসা শেখার আছে। মন তো সবারই আছে। কিন্তু এমন ভালোবাসার মন কয়জনের আছে? কেন জানি আমার মনের ভেতরে খচখচ করছে। এ কেমন কথা, জমিতে ধান বপন করা হয়েছে। আগাছা পরিষ্কার করা হয়েছে। অতিশয় খাতির-যত্ন করে এদের বড়ো করা হয়েছে; অথচ ফসল ঘরে তুলবে না? নবান্নের পিঠার স্বাদ আস্বাদন করবে না? এসব প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে এখনো অধরা। তবে আশার কথা, আমার আগ্রহে এখনো ভাটা পড়েনি। নীলুকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি বললে না কেন?
ভাইয়া, আপনি বুঝতে পারছেন না কেন... বলার তো কিছু নেই। সকাল সব জানে। আমিও সব জানি। হূদয়ের চেয়ে কি মুখ কোনোদিন বড়ো হয়?
মাত্র আটটি ক্লাস পাড়ি দেওয়া একটি পুঁচকে মেয়ের মুখে এসব কথা আমার বেমানান লাগছে। তাও হজম করা ছাড়া আমার অন্য উপায় কি? স্বেচ্ছায় যে কাঁটা গিলেছি; সেই কাঁটার বিষ আমাকেই সইতে হবে। আবার বললাম, এখন তাহলে কী হবে?
আমার প্রশ্ন শুনে নীলু যেন সাত সমুদ্রের অতল থেকে ফিরে এল। অতঃপর জলদ গম্ভীর স্বরে বলল, এই বিয়ে আমি করব না ভাইয়া। কিছুতেই করব না।
নীলুর কথা শুনে আমি আমার প্রিয় উচ্চাঙ্গসংগীতের সুর ভুলে গেলাম। তবে প্রায় নিবু নিবু আমার আশার প্রদীপটি যেন হঠাত্ করে জ্বলে উঠল।
৫.
যার মন নেই; তার আবার কী মনে হবে? তবুও মাঝে মাঝে অনুভবের শিকল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। পাড়ভাঙা নদীর মতো সেও টাচলাইন ছুঁয়ে দিতে চায়। কবিতার মতো কাউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে চায়। চরম পুলক সুখানুভূতি অনুভব করতে চায়। কিন্তু চীনের মহাপ্রাচীরের মতো বাধার পাহাড় ডিঙাতে পারে না। তবুও মাকড়শার মতো স্বপ্নের জাল বুনতেই থাকে। শেষ হয় না। সকালদের কথা বলছিলাম। ঝড়-বৃষ্টির মাতম একটুও থামেনি। অবশ্য এতে কারো আসা আটকে থাকেনি। শুভ কাজের গন্ধ পেয়ে কাজি সাহেব আগেই এসে হাজির হয়েছেন। তার হাতে মোটা পলিথিনে মোড়ানো বিশাল সাইজের রেজেস্ট্রি খাতা। হয়তো এতে নীলুর মতো এমনই কত কিশোরীর অব্যক্ত কান্নার ছবি আঁকা। নীলুর হবু বরকে দেখলাম। মেঘে ঢাকা মধ্যাহ্নের সূর্য। তেজ নেই। প্রায় চল্লিশ ছুঁই ছুঁই লিকলিকে যুবক। শরীরের তুলনায় মোটা উদর। হাতির মতো ছোট ছোট একজোড়া কোটরাগত চোখ। তবে পাত্র হিসেবে সোনার টুকরা। কোনো যৌতুক নেয়নি। হাড়কিপ্টে বাবার একমাত্র সন্তান। তবুও।
নীলুর কথাটি এখনো আমার কানে আসা-যাওয়া করছে। মেয়েটি হয়তো জানে না সে কতটা শক্ত কথা বলেছে। তবুও এই কথার রশি ধরেই আমি এখনো তেলাপোকার মতো টিকে আছি। বলা যায়, অথই সাগরের মাঝখানেও উদ্ধারকারী জাহাজের মাস্তুল দেখতে পাচ্ছি। সকাল কী ভাবছে বুঝতে পারছি না। আমার কাছে মনে হয়, সে ভাবছে রাত আগে না দিন আগে। আমার অভিজ্ঞতা বলে—সমস্যা যত জটিল এর সমাধান ততটা জটিল না-ও হতে পারে। অনেক দামি জিনিসও অনেক সময় জলের দামে পাওয়া যায়। সকাল আবার আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তার মুখ দেখে কিছুতেই বোঝার উপায় নেই যে, কিছুক্ষণ পরেই কোরবানি পর্ব আরম্ভ হবে।
একটা বিষয়ে আমার শঙ্কা আছে। অন্ধকার কতটা দ্রবীভূত হয়। আমি চাইছিলাম যে করেই হোক আজকের এই অন্ধকারটা যতটা সম্ভব কাব্যিক হোক। চনমনে হোক। ভালোবাসার মহাকাব্য নিয়ে আমার নিজস্ব কোনো হাইপোথিসিস নেই। কেবল সরল-গরলের কিছু লেনাদেনা আছে।
এইটুকু সম্বল নিয়েই সকালকে জিজ্ঞেস করলাম, কিছু বলবে সকাল?
আমার তেমন কিছু বলার নেই। শুধু আপনার পরিচয়...
আমার বলার মতো বড়ো কোনো পরিচয় নেই। ভবঘুরে টাইপ একজন মানুষ। অমানুষও বলতে পারো।
আমি আসলে ওসব জানতে চাইনি। আপনি কোন পক্ষের মেহমান?
ও আচ্ছা। আমি নীলুর দূরসম্পর্কের ভাই। দুই গ্রাম পরে আমাদের বাড়ি। লোকে বলে, আমাদের গ্রামে কোনো আলো নেই। ভালোবাসার আলো। এইদিক থেকে অবশ্য তুমি খুব সৌভাগ্যবান। অন্তত একজনের ভালোবাসা পেয়েছ। একজীবনে তেমনটা কয়জনে পায় সকাল?
অন্য কোনোদিন হলে আমি আপনার এই কথার জবাব দিতাম। কেন জানি আজ দিতে পারছি না। মন থেকে সাড়া পাচ্ছি না।
ঠিক আছে। বাদ দাও ওসব। পানি একদিকে না একদিকে গড়াবেই। নীলু কি তোমার আত্মীয়?
জি। ও আমার আপন খালাত বোন। নীলুর জন্মের সময় খালা আর আমার মা আমাদের দুজনের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলেছিলেন। আমি যেমন সেটা জানি তেমনি নীলুও সেটা জানে।
আমি আবারও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কয়েকটা হোঁচট খেলাম। হঠাত্ আমার হিমালয় হিমালয় ভাবটা জাগ্রত হয়ে উঠল। আমি ঠাস করে বলে ফেললাম, সকাল, আজ নীলুর বিয়েটা হবে না। এমন অসম্ভব একটা কথা বলার পরও সকাল এতটুকু চমকে উঠল না। সন্ধ্যাতারার মতো মিটিমিটি হাসতে লাগল। বিয়ে হোক আর না হোক সকালের মুখের এই একচিলতে হাসি আমার কাছে এই মুহূর্তে ত্রিভুবনের চেয়েও অনেক অনেক বেশি দামি।
এরপর নীলু আর নিজেকে আটকে রাখতে পারেনি। কেটে দেওয়া বাধের জলের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। এরপরের ঘটনাটি আরো আশ্চর্য, ধনুকে তীর দিতে যতক্ষণ, ঠিক ততক্ষণ সময়ে সে নিজেকে ফিরে পেল। কে বলবে এক বিজলি সময় আগেই এই মেয়ের চোখে জলপ্রপাত ছিল। অতঃপর কোনো রাখঢাক না করেই সে বলল, আপনি যা জানতে চেয়েছেন, আমি তা বুঝতে পেরেছি ভাইয়া
অলঙ্করণ :ফারজানা রহমান ববি